মেক্সিকো থেকে মাদ্রিদ মুখশে মৃত্যুর উৎসব

৩৬৫ দিন। মৃত্যুর ওপারে স্মৃতির উৎসব মাদ্রিদ থেকে মেক্সিকো; বিশ্বজুড়ে সর্বাত্মা দিবসের আচার, শিল্প, মুখোশ ও লোকঐতিহ্যের বর্ণময় কাহিনি মৃত্যু মানুষের জীবনের শেষ অধ্যায়;কিন্তু স্মৃতির শেষ নয়। পৃথিবীর নানা প্রান্তে নভেম্বরের শুরুতে সেই স্মৃতিকেই উৎসবে পরিণত করেন মানুষ। কোথাও কবরের পাশে জ্বলে মোমবাতি, কোথাও সাজানো হয় ফুলে ঢাকা বেদি, কোথাও রাস্তায় নামে কঙ্কাল-মুখোশের শোভাযাত্রা। ইউরোপের গির্জা থেকে লাতিন আমেরিকার রঙিন রাজপথ;মৃতদের স্মরণ ঘিরে তৈরি হয়েছে বিচিত্র , শিল্প ও লোকবিশ্বাসের এক আশ্চর্য জগৎ। নভেম্বরের ১ তারিখ খ্রিস্টীয় পরম্পরায় সকল সাধুসন্তের দিবস, পরদিন ২ নভেম্বর সর্বাত্মা দিবস। প্রথম দিন স্মরণ করা হয় সাধু ও পুণ্যবানদের, দ্বিতীয় দিন প্রয়াত আত্মীয়স্বজন ও সাধারণ মৃতদের। তবে দেশভেদে আচার, নাম ও উদ্পনের ধরন বদলে যায়। এই স্মরণোৎসবের শিকড় মধ্যযুগীয় খ্রিস্টীয়  গভীরভাবে প্রোথিত; আবার বহু দেশে তার সঙ্গে মিশেছে প্রাচীন স্থানীয় বিশ্বাস ও লোকাচার। মাদ্রিদের কবরস্থানে ফুলের ঢেউ স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে নভেম্বরের প্রথম দু’দিনে কবরস্থানগুলিতে দেখা যায় অন্য রকম ব্যস্ততা। পরিবারের সদস্যরা সমাধিতে ফুল দেন, মোমবাতি জ্বালান, পরিষ্কার করেন প্রিয়জনের শেষ আশ্রয়। ফুলের দোকানে বিশেষ চাহিদা থাকে ক্রিস্যান্থিমাম বা চন্দ্রমল্লিকার। সাদা, হলুদ, বেগুনি ফুলে ঢেকে যায় সমাধিফলক। স্পেনের এই সময়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নাট্যঐতিহ্যও। জোসে সোরিয়ার বিখ্যাত নাটক ‘দন হুয়ান তেনোরিও’ মঞ্চস্থ করার রীতিবহুদিনের।
মৃত্যু, অনুতাপ, আত্মা ও পরিত্রাণের প্রশ্ন নাটকটির কেন্দ্রে। উৎসবের আবহে মঞ্চে ফিরে আসে সেই চিরন্তন প্রশ্ন;মৃত্যুর পর মানুষের কী থাকে? মাদ্রিদের মিষ্টির দোকানেও এই সময় বিশেষ জনপ্রিয় ‘হুয়েসোস দে সান্তো’;সাধুসন্তের অস্থি নামে পরিচিত মারজিপান-নির্মিত মিষ্টি।
মেক্সিকো মৃত্যু যখন রঙিন প্রত্যাবর্তন বিশ্বের সবচেয়ে দৃশ্যমান মৃতস্মরণ উৎসবগুলির একটি মেক্সিকোর ‘দিয়া দে লস মুয়ের্তোস’। নামের
অর্থ;মৃতদের দিবস। ১ ও ২ নভেম্বর ঘিরে পরিবারগুলি বিশ্বাস করে, প্রয়াত স্বজনেরা স্মৃতির পথে ঘরে ফিরে আসেন। তাঁদের স্বাগত জানাতে সাজানো হয় ‘ওফ্রেন্দা’;ফুল, খাবার, পানীয়, ছবি ও স্মৃতিচিহ্নে সাজানো পারিবারিক বেদি। কমলা রঙের গাঁদা ফুলের পাপড়ি দিয়ে তৈরি হয় পথ। জ্বলে মোমবাতি, রাখা হয় মৃতের প্রিয় খাবার, জল, রুটি এবং ব্যক্তিগত স্মারক। শিশুমৃতদের স্মরণে অনেক পরিবার ১ নভেম্বর এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ২ নভেম্বর বিশেষ আয়োজন করে। এই উৎসবের মধ্যে রয়েছে প্রাক্-স্পেনীয় আদিবাসী বিশ্বাসের উত্তরাধিকার, আবার রয়েছে ক্যাথলিক ধর্মীয় পরম্পরার প্রভাব। দুই ধারার মিলনেই তৈরি হয়েছে মেক্সিকোর নিজস্ব পরিচয়। মুখোশে মৃত্যুর মুখ, শিল্পীর হাতে নতুন জীবন
মেক্সিকোর উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ক্যালাভেরা;হাসিমুখের খুলি। চিনি, মাটি, কাগজের মণ্ড, কাঠ ও রঙিন কাপড় দিয়ে তৈরি হয় খুলি, কঙ্কাল ও বিচিত্র মুখোশ। শিল্পীরা কখনও খুলির চোখে বসান ঝলমলে পাথর, কখনও ফুলের নকশায় ঢেকে দেন কঙ্কালের মুখ। মুখে সাদা রং, চোখের চারপাশে কালো বৃত্ত, কপালে ফুল ও গালে সূক্ষ্ম অলংকরণ;এই সাজে সাধারণ মানুষও হয়ে ওঠেন উৎসবের জীবন্ত শিল্পকর্ম। এই ঐতিহ্যের জনপ্রিয় প্রতীক ‘লা কাত্রিনা’। মেক্সিকান চিত্রশিল্পী হোসে গুয়াদালুপে পোসাদার আঁকা অভিজাত পোশাকের কঙ্কালচিত্র থেকেই তার পরিচিতি। পরে শিল্পী দিয়েগো রিভেরা সেই প্রতীককে আরও জনপ্রিয় করেন।
আজ কাত্রিনা কখনও বিশাল পুতুল, কখনও মুখোশ, কখনও শোভাযাত্রার প্রধান চরিত্র। তবে এই সাজ কেবল ভয়ের নয়;মৃত্যুর সামনে সামাজিক ভেদাভেদ, সম্পদ ও অহংকারের অসারতারও এক ব্যঙ্গাত্মক শিল্পভাষা।
মাদ্রিদে মেক্সিকোর রং, ঐতিহ্যের সেতুবন্ধ ২০২৬ সালে মাদ্রিদে স্পেনীয় স্মরণাচারের পাশাপাশি মেক্সিকোর মৃতস্মরণ উৎসবও বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। শহরের রেতিরো উদ্যান, ক্রিস্তাল প্রাসাদ, সেন্ট্রোসেন্ট্রো-সহ একাধিক স্থানে তৈরি হয়েছিল ফুল, মাটি, কাগজ ও স্মৃতিচিহ্নে সাজানো বেদি। কোথাও প্রকৃতি ও মহাবিশ্ব, কোথাও স্পেনের শিল্প-সাহিত্যের প্রজন্মকে উৎসর্গ করা হয়েছিল সেই নির্মাণ। ১ নভেম্বর মেক্সিকান দূতাবাস থেকে প্লাজা মেয়র পর্যন্ত কাত্রিনা, সংগীত ও রঙিন পোশাকের শোভাযাত্রাও হয়। মাদ্রিদ যেন কয়েক দিনের জন্য মেক্সিকোর স্মৃতি-উৎসবকে নিজের শহুরে অংশ করে নিয়েছিল। সমাধির পাশে পরিবার, প্রার্থনা ও খাবার ফিলিপাইনে এই সময়ের পরিচিত নাম ‘উন্দাস’। ১ ও ২ নভেম্বর
পরিবারগুলি কবরস্থানে যান, সমাধি পরিষ্কার করেন, ফুল ও মোমবাতি রাখেন, প্রার্থনা করেন। অনেক পরিবার কবরের পাশেই বসে খাবার ভাগ করে নেন, মৃত স্বজনের গল্প বলেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই রীতি কেবল ধর্মীয় কর্তব্য নয়, পরিবারের পুনর্মিলনেরও উপলক্ষ। স্পেনীয় ঔপনিবেশিক ইতিহাসের সঙ্গে স্থানীয় পূর্বপুরুষ-পূজার বিশ্বাস মিশে এই প্রথাকে দিয়েছে নিজস্ব চরিত্র। লাতিন আমেরিকায় ঘুড়ি, গান ও আত্মার আহ্বান গুয়াতেমালায় মৃতদের স্মরণে বিশাল ঘুড়ি ওড়ানোর ঐতিহ্য বিশেষভাবে পরিচিত। রঙিন কাগজের বিশাল ঘুড়িতে আঁকা হয় জটিল নকশা; কোথাও সেগুলি প্রায় শিল্পকর্মের মতো। পরিবারগুলি কবরস্থানে যান, ফুল দেন, খাবার ভাগ করেন। হাইতিতে ‘ফেৎ গেদে’
উৎসবে পূর্বপুরুষ ও মৃত আত্মাদের স্মরণ করা হয় ঢাকের তালে, গান, নৃত্য এবং শোভাযাত্রায়।
আফ্রিকীয় আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার ও স্থানীয় ধর্মবিশ্বাস সেখানে এক বিশেষ  আবহ তৈরি করেছে। ইউরোপে আলো, প্রার্থনা ও নীরবতা পোল্যান্ডে নভেম্বরের প্রথম দিন সন্ধ্যা নামতেই কবরস্থানগুলি হাজার হাজার মোমবাতির আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সমাধির পাশে ফুল, প্রদীপ ও প্রার্থনা; এই দৃশ্যের মধ্যে নেই মেক্সিকোর মতো উৎসবের উচ্ছ্বাস; রয়েছে গভীর পারিবারিক আবেগ। ইতালি, পর্তুগাল ও ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশে মৃত স্বজনদের স্মরণে বিশেষ প্রার্থনা, সমাধিতে ফুল দেওয়া এবং পারিবারিক সমাবেশের রীতি রয়েছে। দেশ আলাদা, ভাষা আলাদা, কিন্তু প্রিয়জনকে মনে রাখার আকুলতা একই।
ইতিহাসের শিকড়, নতুন ভাষা সর্বাত্মা দিবসের প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস মধ্যযুগীয় ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত। দশম শতকে ফরাসি বেনেডিক্টাইন সন্ন্যাসী ওডিলো ২ নভেম্বর মৃতদের জন্য বিশেষ প্রার্থনার প্রচলন করেন। পরে এই রীতি ক্যাথলিক জগতে ছড়িয়ে পড়ে। মেক্সিকোতে স্পেনীয় ঔপনিবেশিক যুগে এই ধর্মীয় দিনগুলির সঙ্গে স্থানীয় আদিবাসী সমাজের পূর্বপুরুষ-স্মরণ ও মৃত্যুচিন্তার নানা উপাদান মিশে নতুন উৎসবের রূপ পায়। এই মেলবন্ধনকে একটিমাত্র উৎস থেকে ব্যাখ্যা করা যায় না; শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নানা বিশ্বাস ও শিল্পরীতির বিনিময়ে তৈরি হয়েছে আজকের ঐতিহ্য। শিল্পীদের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। মুখোশ নির্মাতা, কাগজের মণ্ডের কারিগর, চিত্রকর, ফুলশিল্পী, ভাস্কর, পোশাকশিল্পী;সকলেই মৃতস্মরণকে দৃশ্যমান শিল্পে পরিণত করেন। মেক্সিকোর কাত্রিনা থেকে গুয়াতেমালার বিশাল ঘুড়ি, স্পেনের সমাধিফলকের ফুলের সাজ থেকে ফিলিপাইনের হাতে তৈরি স্মারক;প্রতিটি শিল্পকর্মের মধ্যে রয়েছে মানুষের নিজস্ব ইতিহাস। তবে উৎসবের বাণিজ্যিক জনপ্রিয়তার সঙ্গে উদ্বেগও বাড়ছে। মেক্সিকোর কিছু অঞ্চলে পর্যটকদের ভিড় স্থানীয় পরিবারের ধর্মীয় আচার ও কবরস্থানের পরিবেশে চাপ তৈরি করছে। ২০২৬ সালে
মিচোয়াকানের জানিৎসিও দ্বীপে অতিরিক্ত পর্যটক-চাপের কারণে কবরস্থানে প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। স্মৃতির উৎসবকে পর্যটনের প্রদর্শনীতে পরিণত না করে স্থানীয় মানুষের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করাই এখন বড় প্রশ্ন। মৃত্যুকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা নয়, বরং তাকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য সত্য হিসেবে মেনে নেওয়া; এই উৎসবগুলির মূল দর্শন। কোথাও মোমবাতির আলো, কোথাও মুখোশের হাসি, কোথাও ঢাকের শব্দ, কোথাও ফুলের গন্ধ। মৃতেরা ফিরে আসেন কি না, তা বিশ্বাসের বিষয়; কিন্তু তাঁদের স্মৃতি যে জীবিতদের , শিল্প ও পারিবারিক বন্ধনকে বাঁচিয়ে রাখে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। পৃথিবীর নানা প্রান্তে সর্বাত্মা দিবস তাই শোকের দিন হয়েও শেষ পর্যন্ত জীবনেরই উৎসব।

Scroll to Top