অভিজিৎ অধিকারী
৩৬৫ দিন। তখন ক্লাস ফাইভে, পাঠভবন স্কুলে পড়ি। ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন ‘ সিনেমা রিলিজ করার একদিন কী দুদিন আগে (মনে নেই) স্কুলের সমস্ত ছাত্র-ছাত্রীকে বিজলীতে নিয়ে গিয়ে দেখানো হয়েছিল সিনেমাটা। সেটা প্রিমিয়ার ছিল কিনা বোঝার মতো বয়স ছিল না, হয়ত সে প্রসঙ্গ অপ্রাসঙ্গিকও এখন। শুনেছিলাম, সত্যজিৎ রায় আমাদের স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য, নিশ্চয়ই সে কারণেই আমাদের সামনে এমন এক অভাবনীয় সুযোগ এসেছিল। ক্লাসের বন্ধুদের সঙ্গে সিনেমা দেখতে যাওয়ার উত্তেজনা এবং সিনেমা দেখে ফেরার পর অবিস্মরণীয় বিহ্বলতা আজও আমার স্মৃতিতে স্পষ্ট। সেসময় গুপী বাঘার গানবাজনার থেকেও মনে আছে যুদ্ধবাজ হল্লার রাজার ধারালো বর্শা হাতে গান, তার হাড়হিম করা আস্ফালন, কুচক্রী মন্ত্রীর প্রতিবেশী দেশকে ধ্বংস করার পরিকল্পনা, নিজের অভুক্ত প্রজার সামনে দেখিয়ে দেখিয়ে মুরগির ঠ্যাং খাওয়া, যুদ্ধে নারাজ সৈন্যদের বৈজ্ঞানিকের টোটকা দিয়ে সচল করা এবং সব শেষে মিষ্টির বৃষ্টিতে যুদ্ধ ভেস্তে যাওয়া আমায় কেমন নাড়িয়ে দিয়েছিল। আজ বুঝি, সেটাই ছিল আমার সমাজ চিত্রের প্রথম অবলোকন, রাজনীতির প্রথম পাঠ। তাই রূপম ইসলামের লেখা, গুপী বাঘার মতো যদি পাওয়া যেত ৩ বর/ যুদ্ধ বিবাদ থাকত না আর পৃথিবীতে উঠত না
ঝড়…, ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কণ্ঠে শুনে আমার বাল্যের স্মৃতি সতেজ হয়ে উঠল। আজ এই ৫০ বছর পর দুনিয়া পাল্টে গেছে আমূল। প্রগতি, প্রযুক্তি, উন্নয়নের পাশেই আড়ে-বহরে বৃদ্ধি পেয়েছে সমাজের সেই চিরন্তন শুভ অশুভের দ্বন্দ্ব। শাসক হয়েছে আরও ক্রুর, স্বৈরাচারী , ক্ষমতালোভী, প্রযুক্তি যুদ্ধকে করেছে প্রাণঘাতী। ‘ বোরোলিন আজ এবং আগামী ‘ প্রকল্পে রূপম ইসলাম সহ অন্যান্য কুশীলবদের ধন্যবাদ তারা ভবিষ্যতের নাগরিকদের সচেতন করছেন। গিরিশৃঙ্গে আবর্জনার স্তূপ জমছে, হিমবাহ গলছে, জলস্তর ক্রমশ স্ফীত হচ্ছে, কারখানার বিষ গ্যাসে সুজলা-সুফলা ধরিত্রী হচ্ছে আশঙ্কাজনক ভাবে উষ্ণ — জীবন আর সুচিক্কন নয়। সমাজকে চিনতে হবে, নিতে হবে রাজনীতির পাঠ। উপেন্দ্রকিশোরের গুপী বাঘা আর সত্যজিতের হীরক রাজা ছাড়া জলবৎ তরলং করে কেই বা পারবে বোঝাতে তাদের!
রিমেক নয়, ওরিজিনাল
রিমেক অপত্তিকর। স্রেফ ব্যবসায়িক কারণে একজন স্রষ্টার সৃষ্টির ওপর কেরামতি করার অধিকার নেই কারুর। আইনের কথা বলতে পারব না অন্তত নীতিগত ভাবে তা বাঞ্ছনীয় নয়। হিন্দিতে একসময় এই রিমেকের রমরমা ছিল। বহু প্রথিতযশা সুরকরের সৃষ্টি নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়েছে। বাংলায় হয়েছে সিনেমায়। সেখানে সত্যজিৎ, উত্তম নিয়েও টানাটানি করেছেন পরিচালকরা। গুপী বাঘার গাম শুনে তাই এই ভিডিও অ্যালবামটি শোনার আগে যথেষ্ট আশঙ্কা হয়েছিল। কিন্তু না, রিমেক নয়, রূপম ও সংশ্লিষ্ট শিল্পীদের এন্ড প্রোডাক্টটি ওরিজিনাল। তাঁরা উপেন্দ্র কিশোরের দুই কালজয়ী চরিত্র গুপী বাঘা ও সত্যজিতের হীরক রাজার দেশের চারটি লাইন, পোশাকের ডিজাইন ও উদয়ন পণ্ডিতকে ধার করেছেন। বাকি কথা, সুর ও তার প্রয়োগ সম্পূর্ণ মৌলিক, রিমেক-ছায়া পড়েনি কোথাও। সাদৃশ্য আরও এক আছে তা সারল্যে। তবে দুই ক্ষেত্রে এসেছে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। গুপী বাঘা বাংলার গ্রামের প্রতিনিধি। তাদের বক্তব্য সহজ সরল, মারপ্যাঁচ নেই। তাদের গানের কথা ও সুরে রয়েছে তাই তারই প্রতিফলন। আর এই ভিডিওর গান ছোটদের, যাদের অভিব্যক্তিতে জটিলতা থাবা বসায়নি এখনো। উদয়ন পণ্ডিত হিসেবে রূপম যথাযথ। তিনি তো সত্যিই শিক্ষক। মিলেনিয়াল বা জেনারেশন ওয়াইয়ের পর আজকের জেন জি তাকে আগেই গুরু মেনেছে।
তার রোমান্টিকতায় জারিত হয়েছে, আবেগের স্রোতে ভেসে গেছে, বিদ্রোহের আগুনে হয়েছে হিরণ্ময়। এবার যদি সেই পণ্ডিতের কাছে শিক্ষালাভের সুযোগ পায় জেন আলফারা, যদি শিখতে পারে ভালো মন্দের ফারাক, চিনতে পারে সমাজের প্রকৃত শত্রুকে তাহলে সুস্থ-সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন দেখা যায় আবার। তুষার দেবনাথ যে অ্যারেঞ্জমেন্ট করেছেন তার সঙ্গে গুপী বাঘা সিক্যুয়েলের একটি গানেরও মিল নেই।
সত্যজিৎ যে গানগুলি বানিয়েছিলেন তার সুর ও ছন্দে ছিল বাংলার সোঁদা মাটির গন্ধ। কারণ, গুপী বাঘা দুজনেই গ্রাম বাংলার মানুষ। তাই ফিউশন হলেও প্রায় সব গানে আড় বাঁশির ব্যবহার ছিল প্রায় অবধারিত এবং সেই সঙ্গে বাংলা ঢোল। এছাড়াও সেতার সরোদ থেকে পাখোয়াজ, ঘট্টম, মুড়শৃঙ্গর মতো বহু ভারতীয় বাদ্য যন্ত্র ব্যবহার করেছিলেন তিনি। এর সঙ্গে তিনি মিশিয়েছিলেন পশ্চিমী ধ্রুপদী সঙ্গীতের ট্র্যাডিশনাল ফার্স্ট ভায়োলিন, সেকেন্ড ভায়োলিন, থার্ড ভায়োলিন, ভিওলা, চেলো, ডবল বেসের মত অর্কেস্ট্রায় সাধারণ ভাবে নির্ধারিত বাদ্য যন্ত্রগুলি। এছাড়াও কখনও ব্যবহার করেছেন উইন্ড কিম্বা রিদ সেকশন। সব মিলিয়ে তিনি তৈরি করেছিলেন অনবদ্য এক হারমনিক সাউন্ডস্কোপ। রূপমের এই গানের অ্যারেঞ্জমেন্ট পরিবর্ত পৃথিবীর কথা ভেবে, আগামীরা যে সাউন্ড-এ অভ্যস্ত তাদের কথা ভেবে এবং এখানেই তারা ওরিজিনাল, রিমেকের বাইরে। গানের অ্যারেঞ্জমেন্ট, গিটার ও কণ্ঠে তুষার স্মার্ট। ছোটদের গানে ও অভিনয়ে ব্যবহার করার কন্সেপ্ট ও পরিচালনায় অভিষেক চক্রবর্তী চমৎকার।






