৩৬৫ দিন। তপন বকসি. মুম্বাই। মুম্বাইয়ের ভিলে পারলের পশ্চিম দিকে জুহু অঞ্চলে যমনাবাঈ নারসি স্কুলের পাশে পুষ্পা পার্কে প্রত্যেক রবিবার ফুটবল খেলতে আসেন টাইগার শ্রফ। ১৮ অক্টোবর রবিবার, তেমনভাবেই সেখানে ফুটবল খেলতে এসেছিলেন টাইগার। খেলা শেষের পর তিনি যখন ওই পার্ক থেকে নিজের গাড়িতে উঠে বাড়ির দিকে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন, সেই সময় টাইগার শ্রফের গাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে।
এই ঘটনায় মুম্বাই পুলিশ ক্রাইম ব্রাঞ্চ এবং রাজস্থান পুলিশের যৌথ অভিযানে সোমবার তিন অভিযুক্তকে রাজস্থানের কোটা রেল স্টেশন থেকে গ্রেফতার করেছে। এবং এই হাই-প্রোফাইল মামলাটি জুহু থানা থেকে তদন্তের জন্য ইতিমধ্যেই মুম্বাই ক্রাইম ব্রাঞ্চের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। রবিবার ওই ঘটনা ঘটার পরেই লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের অনিল পন্ডিত এবং হরমন সন্ধুর বিবৃতির একটি অডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়। সেই অডিও ক্লিপে অনিল পণ্ডিতকে বলতে শোনা যায়, “সালমান খানের সঙ্গে যারা কাজ করবেন, তাদের এমনই পরিস্থিতি হবে। আমরা টাইগারকে এর আগে বুঝিয়ে বলতে গিয়েছি। কিন্তু তিনি আমাদের কথা শোনেননি। বলিউডে যারাই আমাদের কথা এভাবে অমান্য করবেন তাদেরকে এইভাবেই আমরা শিক্ষা দেব।” সোমবার রাজস্থানের কোটা থেকে ধৃত তিনজনের মধ্যে রয়েছে রেহান ওরফে সুক্কা (১৮, হরিয়ানা), হৃতিক কুর্মি ওরফে রওশন ফাইটার (২২, বিহারের বাসিন্দা ও মুম্বাইয়ের আন্ধেরি ওয়েস্টের র্যাপিডো বাইক চালক) এবং ১৭ বছর বয়সি এক নাবালক (হরিয়ানা)। বিশ্বস্ত সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে, রবিবার সন্ধ্যায় জুহুতে গুলি চালানোর পর অভিযুক্তরা এস.ভি.রোড হয়ে ভিলে পার্লে হয়ে আন্ধেরির দিকে পালায়। আন্ধেরি ওয়েস্ট রেল স্টেশনের কাছে তারা ব্যবহৃত পালসার মোটরসাইকেলটি ফেলে রেখে ট্রেনে চড়ে বসে। মুম্বাই পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তরা পুনে-জয়পুর এক্সপ্রেসে চড়ে দিল্লি হয়ে নেপালে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু গোপন সূত্রে খবর পেয়ে রাজস্থানের অ্যান্টি-গ্যাংস্টার টাস্ক ফোর্স ও কোটা সিটি পুলিশ তাদের ট্রেন থেকে ধরে ফেলে। এখন ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মুম্বাইতে আনা হচ্ছে।

ঘটনার কিছু পরেই সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্টের মাধ্যমে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং এই হামলার দায় স্বীকার করে। পোস্টে অনিল পণ্ডিত ও হরমন সান্ধু নামের দুই গ্যাংস্টারের নাম উঠে এসেছে। মুম্বাইয়ের ক্রাইম ব্রাঞ্চ খতিয়ে দেখছে যে, সালমান খানের সঙ্গে কাজ করা বা ঘনিষ্ঠতার কারণেই কি টাইগার শ্রফকে লক্ষ্য করা হয়েছিল কিনা। কারণ ওই সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে স্পষ্ট হুমকি দেওয়া হয়েছিল— যারা সালমান খানের সঙ্গে কাজ করবেন, তাদের কাউকেই ছাড়া হবে না। তবে পুলিশ এখনও এই পোস্টের সত্যতা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। মুম্বাইয়ের ভিলে পারলে -জুহু অঞ্চলে ১৮ অক্টোবর রবিবার সন্ধ্যার ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে জানা যাচ্ছে, ধৃত রেহান লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সহযোগী অনিল পণ্ডিতের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল। ধারণা করা হচ্ছে, দু’জনকে মূলত শুটার হিসেবে ভাড়া করা হয়েছিল।
এই ঘটনার তদন্তে নেমে মুম্বাই পুলিশ ও ক্রাইম ব্রাঞ্চ মিলে মোট ১৫টি বিশেষ দল গঠন করে তদন্ত চালাচ্ছেন। সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে হামলাকারীদের চিহ্নিত করার পাশাপাশি আন্ধেরি স্টেশন থেকে ইতিমধ্যে তাদের ফেলে যাওয়া বাইকটি উদ্ধার করার পর বাইকটির মালিকানা এবং সেটি কত হাত বদল হয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে হামলায় ব্যবহৃত মূল আগ্নেয়াস্ত্র এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। মুম্বাই ক্রাইম ব্রাঞ্চের একটি টিম সোমবার টাইগার শ্রফের বাড়িতে গিয়ে তাঁর বয়ান রেকর্ড করেছেন। পাশাপাশি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং টাইগারের আহত গাড়িচালক ফিরদৌসের বয়ানও নথিভুক্ত করা হয়েছে।
রবিবার ফুটবল খেলে ফেরার সময় জুহুতে টাইগারের গাড়ি লক্ষ্য করে প্রায় ৫ থেকে ৭ রাউন্ড গুলি চালানো হয়। টাইগার শ্রফ এই হামলায় সম্পূর্ণ অক্ষত ও সুরক্ষিত আছেন। তবে কাচ ভাঙা এবং বারুদের ঝাপটায় তাঁর ডান হাতে সামান্য পোড়া দাগ লেগেছে। এই ঘটনায় তাঁর চালক ফিরদৌস এবং চৌহান নামের এক অটোচালক গুলিবিদ্ধ হয়ে নানাবতী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং বর্তমানে তাঁদের অবস্থা স্থিতিশীল। মহারাষ্ট্র সরকারের পক্ষ থেকে অভিনেতার নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে। রবিবার ১৮ অক্টোবর এই হামলার ঘটনা ঘটার কয়েক ঘন্টা পরেই গভীর রাতে মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিণ্ডে সরাসরি বান্দ্রায় টাইগারের বাড়িতে যান। সেখানে তিনি টাইগারের শরীরের খোঁজ নেন এবং তার মা আয়েশা শ্রফ ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের আশ্বস্ত করেন। ঘটনার সময় টাইগারের ডানহাতে কাঁচ ও বারুদের কারণে আঘাত লেগেছিল যার ফলে হাত বুকে ব্যান্ডেজ বাধা ছিল। পরে বাইরে বেরিয়ে এসেছে তিনি সংবাদমাধ্যমের উদ্দেশ্যে বলেন, “মুম্বাইয়ে কারও দাদাগিরি চলবে না। মুম্বাই বা মহারাষ্ট্রে কোনও রকম গ্যাংস্টার বা দুষ্কৃতীদের দাদাগিরি বরদাস্ত করা হবে না। ভয় দেখিয়ে বা হুমকি দিয়ে আধিপত্য বিস্তার করার চেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা হবে। এবং এরপর থেকে গুলির উত্তর গুলিতেই দেওয়া হবে। পুলিশ অপরাধীদের তাদের নিজস্ব ভাষাতেই জবাব দেবে। একনাথ শিন্ডে মনে করিয়ে দেন, ৯০ -এর দশকে মুম্বাইতে এই ধরনের গ্যাং ওয়ার বা তোলাবাজির দাপট ছিল। যা ১৯৯৫ সালের মধ্যে মুম্বাই পুলিশ সম্পূর্ণ শেষ করে দিয়েছিল। একনাথ শিন্ডে জানান, টাইগার তাকে জানিয়েছেন যে কোনও ব্যক্তিগত শত্রুতা বা বিরোধের জেরে এই হামলা হয়নি। মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, “সেলিব্রেটি হোন বা সাধারণ নাগরিক, সকলের নিরাপত্তার নিশ্চিত করা সরকারের প্রথম দায়িত্ব এই বিষয়ে কোনও আপোস করা হবে না।”





