৩৬৫ দিন। ‘যন্তর মন্তর ভার্সান ২’ – এস আই আর নিয়ে অনিয়মের বিস্ফোরক অভিযোগ সামনে আসতেই ফের জোরালো আন্দোলনের ডাক দিল ককরোচ জনতা পার্টি। ডেডলাইন বেঁধে দিয়ে তাদের ঘোষণা, ৪৮ ঘন্টার মধ্যে জাতীয় নির্বাচন কমিশনার পদ থেকে পদত্যাগ করতে হবে জ্ঞানেশ কুমারকে। তা না হলে যন্তর মন্তরের পার্ট টু দেখবে দেশ। শুধু জ্ঞানেশের ইস্তফা নয় ককরোচদের আশঙ্কা, এস আই আরের পেছনে বৃহত্তর ষড়যন্ত্র আছে। তার-ও পর্দা ফাঁস করতে হবে। এদিকে, ককরোচদের হুঁশিয়ারির মধ্যেই বিজেপি এবং জাতীয় নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশকে এক সারিতে রেখে আক্রমণ শানিয়েছেন রাহুল। বিরোধীরা একজোট হয়ে জ্ঞানেশের অপসারণ চেয়ে সংসদে প্রস্তাব আনার তোড়জোর করছে বলেও খবর।
ককরোচদের তিন দাবি
সর্বভারতীয় সংবাদ পত্রে এস আই আর নিয়ে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে আসার পরে বুধবার রাতে ককরোচদের তরফে এক্স হ্যান্ডেলে বলা হয়েছিল সব কাজ ফেলে তারা দিল্লি আসছে। তখন-ই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল এই ইস্যুতে সিজেপি বড় আন্দোলনে নামছে। পূর্ব ঘোষিত মত বৃহস্পতিবার তারা দিল্লিতে সাংবাদিক বৈঠক করেন। সেখানে অভিজিৎ দীপকে, আশুতোষ রাঙ্কা, সৌরভ দাসরা জ্ঞানেশ কুমারকে তীব্র আক্রমণ করেন। বৈঠকে দীপকে বলেন, “মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সবচেয়ে বড় দেশদ্রোহী। তাঁর এখনই পদত্যাগ করা উচিত। কারণ তিনি দেশের গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক।” ককরোচরা তিন দফা দাবি ঘোষণা করেন এদিন –
১. জ্ঞানেশ কুমারকে দু’দিনের মধ্যে পদত্যাগ করতে হবে। যদি তিনি পদত্যাগ না করেন তাহলে তাকে অপসারণ করতে হবে। শুধু অপসারণ করলেই হবে না তার এস আই আরের সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্ত করতে হবে। কে তাকে এস আই আর করতে বললো, কার কথায় কোটি কোটি ভোটারের নাম বাদ চলে গেল তার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করাতে হবে নিরপেক্ষ কোনো সংস্থা বা কমিটিকে দিয়ে।
২.আপাতত এস আই আর স্থগিত রাখতে হবে। সংশোধিত ভোটার তালিকা অনুযায়ী আর কোনো নির্বাচন করানো যাবে না। যদি নির্বাচন করাতেই হয় তাহলে ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসের ভোটার তালিকা অনুযায়ী নির্বাচন করাতে হবে। এস আই আর সংক্রান্ত যাবতীয় নথি সুপ্রিম কোর্টের নজরদারীতে সংরক্ষণ করতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে তদন্তের সময় তথ্য প্রমাণের অভাব না হয়।
৩. ককরোচদের তৃতীয় এবং শেষ দাবি হল, ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন বাতিল করতে হবে। নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের জন্য একটি নতুন আইন প্রণয়ন করতে হবে। নতুন আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় নাগরিক সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছে তারা।
রাহুলের ‘চক্রান্তকারী’ আক্রমণ
একদিকে সিজেপি যখন জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনের হুঁশিয়ারী দিচ্ছে তখন কেন্দ্রে বিজেপি সরকারকে জ্ঞানেশ কুমার ইস্যুতে চেপে ধরতে মরিয়া রাহুল গান্ধি। বৃহস্পতিবার ভিডিও প্রেজেন্টেশন করে সাংবাদিক বৈঠক করেন রাহুল। লোকসভার বিরোধী দলনেতার মতে, দেশে এখন সাত জন ‘চক্রান্তকারী’ রয়েছে। মোদি, শাহ, ভগবত, জ্ঞানেশ কুমার, অজিত দোভাল সহ সাত চক্রান্তকারীর ছবি এক এক করে স্ক্রিনে দেখান রাহুল। তার নীচের সরণীতে রাখেন ১২ জনকে। রাহুলের মতে, এই ১২ জন হল ‘বোরে’ যারা ওপরের সাত চক্রান্তকারীর আজ্ঞা বাহক। এরা সবাই মিলে দেশে গণতন্ত্র হত্যা করে দেশের সঙ্গে দেশের মানুষের সঙ্গে গদ্দারি করেছে। রাহুলের হুঁশিয়ারী, এরা ‘চোর’ এদের চুরি ধরা পড়ে গেছে। তাঁর দাবি, ‘‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হল নির্বাচন। নির্বাচন থেকে সংবিধান শক্তি পায়, সংবিধান থেকে আইন তৈরি হয় এবং আইন থেকে প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। ভোট চুরি হলে তা ক্রমান্বয়ে আইন চুরি (‘কানুন চুরি’) এবং প্রতিষ্ঠান চুরি (‘সংস্থা চুরি’)-র রূপ নেয়।’’ রাহুলের কথায়, “২০২৩ সাল থেকে আমি ভোট চুরির কথা বলে আসছি। দেশবিরোধী কাজ করেছেন তাঁরা। মানুষের ভোট কেড়েছেন মানে তাঁরা দেশদ্রোহী।” জ্ঞানেশকে ‘এক জন বুদ্ধিমান মানুষ’ বলে বর্ণনা করে রাহুল বলেন, ‘‘দেশ এবং গণতন্ত্রের স্বার্থে আপনার রাজসাক্ষী হওয়ার বিষয়ে ভাবনাচিন্তা উচিত।’’ রাহুলের দাবি,বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে কোনো ভোট হয়নি। সবটাই চুরি হয়েছে। ভোট যদি অবৈধ হয় তাহলে কেন্দ্রে বিজেপির সরকার অবৈধ। ২০২৩ সালে এই বিজেপি সরকার নির্বাচন কমিশনার আইনে সংশোধনী এনে জাতীয় নির্বাচন কমিশনারকে রক্ষাকবজ দিয়েছে ফলে এই আইন অবৈধ। সুতরাং জ্ঞানেশ কুমার যিনি এখনো জাতীয় নির্বাচন কমিশনার তাকে তদন্তের আওতায় আনা হোক। জ্ঞানেশ কুমারকে রাহুলের প্রস্তাব, আপনি রাজ সাক্ষী হয়ে যান। মোদি শাহকে খোঁচা দিয়ে রাহুল বলেন, বিজেপি ভোট চুরি করে তাই আপনারা বলতে পারেন ৫০ বছর ক্ষমতায় থাকছি। আমি রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। কোনো দিন আমি বা আমার পরিবারের কেউ এমন দাবি করেনি।
জ্ঞানেশ অপসারণ প্রস্তাবের তোড়জোর
একটি সর্বভারতীয় দৈনিকের দাবি অনুযায়ী, এস আই আর ইস্যুতে জাতীয় নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ‘ইমপিচমেন্ট’ প্রস্তাব আনতে চলেছে ইন্ডিয়া জোট। এ ব্যাপারে ইন্ডিয়া জোটের প্রায় সব দল এক মত। ঠিক হয়েছে লোকসভা এবং রাজ্যসভা দুই কক্ষেই ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনা হবে তবে বিষয়টি নিয়ে আটঘাট বেঁধে নামতে চাইছে বিরোধীরা। ইতিমধ্যে কংগ্রেসের সঙ্গে বাকি বিরোধী দলগুলোর কথা হয়েছে বলেও ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এদিন রাহুল গান্ধিও ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব উড়িয়ে দেননি। যদিও কবে এই নোটিশ দেওয়া হবে তা নিয়ে স্পষ্ট করে তিনি কিছু জানাননি। জাতীয় নির্বাচন কমিশনারের পদ সাংবিধানিক পদ। ইমপিচমেন্ট নোটিশ আনতে গেলে অন্তত ১০০ সাংসদের সমর্থন লাগবে। আইনি কিছু দিক-ও রয়েছে। সূত্রের খবর আপাতত সাংসদ জোগাড়ের চেষ্টার পাশাপাশি আইনি পরামর্শ -ও নিচ্ছে বিরোধী শিবির।
মহুয়ার এফআইআর
জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে পুলিশে গেলেন তৃণমূল এ সাংসদ মহুয়া মৈত্র। দিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রীট থানায় দায়ের হল অভিযোগ। তিনটি বিষয়ে অভিযোগ মহুয়ার। এক, জ্ঞানেশ কুমার বাংলায় এস আই আরের নাম করে লাখ লাখ ভোটারের নাম বাদ দিয়েছে। তার মধ্যে যে ৩৩ লাখ ভোটার আপিল করল তাদের মধ্যে কারা যোগ্য তার কোনও তথ্য কেন বাকি দুই নির্বাচন কমিশনারকে দেওয়া হল না? দুই, ফর্ম-৬ তে কেন কি ভাবে পরিবর্তন করলেন জ্ঞানেশ কুমার? তিন, জ্ঞানেশ কুমার জাতীয় নির্বাচন কমিশনার হিসাবে নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালন করেন নি। দুই নির্বাচন কমিশনের আপত্তি সত্ত্বেও এস আই আর করেছেন তাদের থেকে তথ্য লুকিয়েছেন। তাই জ্ঞানেশ কুমারের আর কোনো রক্ষা কবজ থাকতে পারে না। থানা থেকে বেরিয়ে মহুয়া বলেন, দিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় এসে জ্ঞানেশ চোর কুমারের মুখ্য নির্বাচনী কমিশনারের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছি। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সর্ব সম্মতিতে কোন বিল পাস করেননি। উনি একজন অপরাধী। অন্যান্য যে দুজন নির্বাচন কমিশনার রয়েছেন সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী তারা লিখিতভাবে বলেছিলেন যে জ্ঞানেশ কুমার যেটা করছে তা বেআইনি এবং অবৈধ। কিন্তু সেটা অগ্রাহ্য করে জ্ঞানেশ কুমার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ওনার রক্ষাকবচ থাকতে পারে না।”
জ্ঞানেশের ১৪ সিধান্ত বাতিলের দাবিতে মামলা




