৩৬৫ দিন। এ যেন ওয়ান ওয়ে ট্রাফিক সিস্টেম। লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনী বা এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাদ দেওয়ার সম্ভব। কিন্তু বাদ দেওয়ার ফর্মুলায় ভুল প্রমাণিত হলেও বাদ পড়া ভোটারদের আবার বৈধ ভোটার তালিকায় ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব। জাতীয় নির্বাচন কমিশনের তৈরি করে দেওয়া বিশেষ পোর্টালে এমন ওয়ান ওয়ে সিস্টেম তৈরি করে বাংলার লক্ষ লক্ষ ভোটারকে তাদের বৈধ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে বলে বিচারপতিদের নিয়ে গঠিত ট্রাইব্যুনালের ১৯ বিচারপতির মধ্যে ১১ বিচারপতি বিস্ফোরক অভিযোগ তুললেন। কয়েকদিন আগেই যেভাবে দেশের বাকি দুই নির্বাচন কমিশনের কোন আপত্তিতে কর্ণপাত না করে একতরফা ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে কোটি কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার জন্য দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে এনেছিল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, এবারও তারাই নিজেদের প্রতিবেদনে এমন বিস্ফোরক তথ্য ফাঁস করেছে।
এখনো ঝুলে প্রায় ৩৭ লক্ষের ভাগ্য
জাতীয় নির্বাচন কমিশন লজিক্যাল ডিস্ক্রিপ্যান্সি ও আনম্যাপড হিসেবে চিহ্নিত ৬০.০৬ লক্ষ ভোটারের তথ্য বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের দিয়ে যাচাই করিয়েছিল। এরপর চূড়ান্তভাবে ২৭.১৬ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। এই ভোটারদের আইনি প্রতিকার দেওয়ার লক্ষ্যেই ট্রাইব্যুনাল ব্যবস্থা তৈরীর নির্দেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। সুপ্রিম কোর্ট ফেব্রুয়ারি মাসে বিচার বিভাগীয় আধিকারিক নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছিল এবং পরবর্তীতে হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের নিয়ে আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠনের নির্দেশ দেয়। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আগে গত ২০ মার্চ ১৯ টি একক-সদস্যের ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। এরপর দু’জন বিচারক পদত্যাগ করেন এবং তাঁদের জায়গায় নতুন বিচারক নিয়োগ করা হয়। বিধানসভা নির্বাচনের পরেও বাংলার ভোটার তালিকায় এসআইআর প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন করে উঠতে পারেনি নির্বাচন কমিশন। সম্প্রতি জাতীয় নির্বাচন কমিশন সুপ্রিম কোর্টকে জানিয়েছে গত ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৩৮.৩১ লক্ষ আবেদন জমা পড়েছিল, যার মধ্যে মাত্র ১.২৬ লক্ষ আবেদনের নিষ্পত্তি হয়েছে। এই আবেদনগুলোর মধ্যে ২২.২১ লক্ষ ছিল তালিকা থেকে বাদ পড়া ভোটারদের পুনরায় অন্তর্ভুক্তির জন্য করা আবেদন, আর ১৬.১০ লক্ষ আবেদনে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল।
কি অভিযোগ
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গঠিত এসআইআর আপিল প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত গাফিলতি অথবা কেলেঙ্কারী হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গের ২৭ লক্ষ বাদ যাওয়া ভোটারের আপিল নিষ্পত্তির জন্য নিযুক্ত ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা নির্বাচন কমিশনের আইটি উইংয়ের তৈরি ডিজিটাল পোর্টালের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর ত্রুটির অভিযোগ তুলেছেন। প্রসঙ্গত পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের আগে থেকেই জাতীয় নির্বাচন কমিশনের আইটি উইং-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিজি আইটি সীমা খান্নার ভূমিকা নিয়ে বারে বারে অভিযোগ তুলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে রাহুল গান্ধী পর্যন্ত। নির্বাচন কমিশন ও কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো ওই বিচারকদের একটি বৈঠকের মিনিটস ও গোপন সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানা গিয়েছে, কমিশনের তৈরি পোর্টালে নোটিশ পাঠানোর কোনো সাধারণ বা সঠিক মেকানিজমই নেই। এমনকি বিগত মে মাসে বিচারকরা নোটিশের একটি খসড়া অনুমোদন করলেও তা আজও পোর্টালে কার্যকর করা হয়নি।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১১ আগস্ট এক বৈঠকে ট্রাইব্যুনালের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারকরা তাঁদের উদ্বেগের কথা নথিভুক্ত করেন। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে এই ১৯ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছিল। এতে এসআইআর প্রক্রিয়ায় নাম বাদ পড়া ভোটারদের দায়ের করা আপিল-সহ অন্যান্য আপিল নিষ্পত্তি করা যায়। পরবর্তীতে এই উদ্বেগের বিষয়টি ভারতের নির্বাচন কমিশন এবং কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে জানানো হয়।
কি কি সমস্যা কমিশনের পোর্টালে
পোর্টালে ত্রুটির কারণে মামলাকারীদের কাছে সরাসরি বা নির্দিষ্ট চ্যানেলের মাধ্যমে নোটিশ পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না।
ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ভোটারদের জমা দেওয়া নথিতে গরমিল থাকলে বা ট্রাইব্যুনালের অতিরিক্ত নথির প্রয়োজন হলে, তা আপলোড বা সংরক্ষণের কোনো অপশন নেই পোর্টালে। বাধ্য হয়ে জেলা প্রশাসন বা ডিএম-এর মাধ্যমে ইমেলে নথিপত্র সংগ্রহের চেষ্টা করা হলেও সাড়া মিলছে না।
জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা ডিইও-দের কাছে যে সমস্ত আপিলের হার্ড কপি বা ফিজিক্যাল নথি জমা পড়েছে, সেগুলির সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও ডিজিটাইজেশনের কোনো সঠিক পরিকাঠামো নেই।
আপিলকারীরা ট্রাইব্যুনালের রায়ের কপি বা সার্টিফিকেট পোর্টাল থেকে ডাউনলোড করতে পারছেন না। অথচ পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দায়ের করা মামলায় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ ছিল, কেন ভোটারের নাম বাদ বা অন্তর্ভুক্ত করা হলো, তার যথাযথ কারণ যেন আবেদনকারীকে জানানো হয়। কোনো মামলায় ভার্চুয়াল উপায়ে শুনানি করার বা বিচার প্রক্রিয়া শেষে কোনো ভোটারের নাম আদালতের নির্দেশে পোর্টালে পুনর্বহাল করার কোনো প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা রাখা হয়নি।
এসআইআর-এ বাদ পড়া ভোটারদের কাছে নোটিশ পাঠানো বা তাদের নাম ফেরানোর কোন অপশন কাজ করছে না কমিশনের পোর্টালে
- khabar365din
- October 6, 2026
- 8:49 pm
- No Comments




