সৃজিতের পথের দাবীও ডকু ফিচার স্টাইলে ছবিতে শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ দু’জনেই আছেন

৩৬৫ দিন। সৌগত সরকার। কথা সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সার্ধশতবর্ষে পা দিয়েছেন ১৫ ই আগস্ট। ফলে শরৎবাবু কে নিয়ে চলচ্চিত্র জগতে একটা ছোট ঢেউ উঠেছে বলা যায়। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্যে একাধিকবার ভারতের স্বাধীনতার লড়াই এসেছে। তবে সবচেয়ে বিতর্কিত এবং আলোর ফেলে দেওয়া উপন্যাসটি হল পথের দাবী। এমন এক কল্পিত নায়ক কে নিয়ে শরৎচন্দ্র ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে একটা স্ফুলিঙ্গ তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যার ফলস্বরপ, শুধু ব্রিটিশ প্রশাসনে নয় বাংলার বিদ্যজন মহলেও হইচই পড়েছিল। পথের দাবির প্রধান চরিত্র সভ্যসাচী আসলে কাল্পনিক নাকি সত্যি কোনো রক্ত মাংসের আন্ডারগ্রাউন্ড বিপ্লবী তা কখনোই সামনে আনেননি শরৎবাবু। কিন্তু এই উপন্যাস মুক্তি পাওয়ার পর বাংলার সশস্ত্র আন্দোলনে যে গতিমুখ বদলের উপক্রম হয়েছিল, তার নার্ভ বুঝে ফেলেছিল ব্রিটিশ প্রশাসন।
ফলে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় এই উপন্যাসকে।মামলা লড়ে ও সরকার বিরোধী তীব্র স্বাধীনতার অগ্নিকুণ্ড হিসেবে এই উপন্যাস বাজারে আসতে দেয়নি, ব্রিটিশ প্রশাসন, কপিস্ক পুড়িয়ে ফেলা হয় প্রকাশ্য রাস্তায়। গোপনে এই বই বিক্রির প্রবণতা ১০০ গুন বেড়ে যায়। উপন্যাস নিষিদ্ধ হওয়ার প্রতিবাদে, বাংলার বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় লেখক সমাজ এবং অবশ্যই মনীষীরা সরব হলেও স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ এই উপন্যাস সম্পর্কে খোলাখুলি মত দেননি। শরৎ বাবুর এই উপন্যাস পড়ে তার যৌক্তিকতা খুঁজে পাননি গুরুদেব।
সে বিতর্ক ঐতিহাসিক দলিল। শরৎচন্দ্রের শতবর্ষে এই উপন্যাস সৃষ্টি, তার সামাজিক প্রভাব এবং প্রধান চরিত্র সশস্ত্র আন্ডারগ্রাউন্ড বিপ্লবী সব্যসাচীকে নিয়ে এবার সিনেমা করার প্রস্তুতি নিয়েছেন পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়। দীর্ঘ পাঁচ বছরের রিসার্চ ওয়ার্ক এবং ইতিহাসের দলিল ঘেঁটে আবার সব্যসাচী কে বড় পর্দায় ফিরিয়ে আনছেন সৃজিত। যদিও ইতিমধ্যে হিন্দি ছবির জগতে এই সভ্যসাচীকে কেন্দ্র করে তিন তিনটে ছবির প্রস্তাব জমা পড়েছে। বিশাল বড় গ্র্যঞ্জারে সেই ছবি নির্মাণ করতে চলেছেন বাঘা বাঘা পরিচালকরা। যদিও সব্যসাচী নিয়ে সব থেকে সফল বাংলা ছবিটি পরিচালনা করেছিলেন পীযূষ বসু ১৯৭৭ সালে। ৪৯ বছর আগে সেই ছবি যতটা আলোড়ন ফেলেছিল ঠিক ততটাই বিতর্কিত এবং সমালোচিত। মহানায়ক উত্তম কুমার, সুপ্রিয়া দেবী অনিল চট্টোপাধ্যায়, তরুন কুমার অভিনীত সেই ছবি টানা ২৪ সপ্তাহ হাউসফুল থাকলেও, ইতিহাসবিদদের অপছন্দ হয়েছিল। ইতিহাস বিকৃত হয়েছে এই দাবি তারা তুলেছিলেন। যদিও পরিচালক পীযূষ বসু বলেছিলেন, আমি ইতিহাস ঘাঁটিনি, আমি শরৎ বাবুর উপন্যাস অনুসরণ করেছি। বাংলা ছবির ইতিহাসে উত্তম কুমারকে সশস্ত্র বিপ্লবী নেতার ভূমিকায় হাতে রিভলভার, এ দৃশ্য বিরল তো বটেই একইসঙ্গে আকর্ষণীয়। ছবিটি জাতীয় পুরস্কার পায়।বলতে দ্বিধা নেই এই ছবি বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবের এক উজ্জ্বল দলিল। উত্তম কুমার আগে এই ধরনের ছবিতে অভিনয় করেননি। কিন্তু তিনি একটি পত্রিকার পত্রিকায় সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, চরিত্রটা আত্মস্থ করতে আমার সময় লেগেছে, তাই উপভোগ করেছি। এই ছবিকে সন্মান জানিয়ে সৃজিত,রিমেক নয় রিকনস্ট্রাকশন করছেন বলা যায়।
আর ছবিতে কেবল আন্ডারগ্রাউন্ড বিপ্লবী নেতা সভ্যসাচীকে প্রোট্রে করা হবে না, একইসঙ্গে এই সাহিত্য কেন শরৎবাবু সৃষ্টি করলেন, তার পিছনে কোন অনুপ্রেরণা কাজ করছিল, এই উপন্যাস সমাজে স্বাধীনতা আন্দোলন কে কিভাবে প্রভাবিত করেছিল, রবীন্দ্রনাথ এই উপন্যাস সম্পর্কে কি ব্যক্তিগত মত প্রকাশ করতেন, তার সঙ্গে এই উপন্যাস নিয়ে শরৎবাবুর মতানৈক্য,সবটাই উঠে আসবে। ফলে এটিকে আধুনিক সময় ফেলে যেভাবে সৃজিত অ্যান্টনি কবিয়াল কিংবা চৌরঙ্গী, অথবা গুমনামী ছবির বিষয়বস্তুকে রিবিল্ট করেছেন, সম্ভবত তিনি সেই পথেই এই ছবি নির্মাণে এগোচ্ছেন। নিঃস¨েহে সৃজিত এটিকে ডকু ফিচার ফর্মাটে বানাবেন। যেখানে ইতিহাসের সঙ্গে ফিচার ছবি মিলেমিশে যাবে। তবে সেক্ষেত্রে দর্শকদের পক্ষে সরল গল্প দেখার মজাটা নষ্ট হওয়ার প্রবণতা আছে। বাংলা সাহিত্যের কথা বাদ রাখলে, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় হলেন সেই বিরল সাহিত্যিকদের একজন যার সাহিত্য থেকে সব থেকে বেশি চলচ্চিত্রায়ন হয়েছে।তথ্য ঘাটলে দেখা যায় হিন্দি বাংলা সহ বিভিন্ন ভাষায় কেবল দেবদাস ছবি হয়েছে অন্তত ১৪টি। হিন্দি বা বাংলার দেবদাসরা তো কালজয়ী হয়েছেই। উত্তমকুমার থেকে দিলীপকুমার হয়ে সঞ্জয় লীলা বনশালি হাত ধরে শাহরুখ পর্যন্ত। রোমান্স বিরহ বৈরাগ্য কিংবা নারীর সামাজিক অবস্থান এবং জটিল সম্পর্কের বাইরেও শরৎচন্দ্রের সাহিত্যের একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে দেশাত্মবোধ এবং দেশপ্রেম। তার তার একসময় নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়া পথের দাবী যার উৎকৃষ্টতম উদাহরণ। কেন নিষিদ্ধ হল পথের দাবি ১২ বছর পর উঠল নিষেধাজ্ঞা শরৎচন্দ্রের পথের দাবি উপন্যাসটি ১৯২৬ সালের আগস্ট মাসে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এর আগে বঙ্গবাণী পত্রিকায় এটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। ছাপা হয়েছিল কটন প্রেস থেকে। মুদ্রাকর, সত্যকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। দাম তিন টাকা। সাদা কাগজে মোড়া পিচবোর্ডের মলাট। বইয়ের উপর দিকে লাল হরফে ছাপা নাম, পথের দাবী। নীচের দিকে লেখকের নাম, শ্রী শরৎচন্দ্র চট্রোপাধ্যায়। রূপসজ্জার দিক থেকে একেবারেই সাদামাটা এই বই-ই ব্রিটিশ সরকারের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল।ব্রিটিশ সরকার মনে করেছিল বইটি পাঠকদের মধ্যে ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও অসন্তোষ তৈরি করছে। তাই ১৯২৭ সালের ৪ জানুয়ারি সরকারি আদেশে এটি বাজেয়াপ্ত করা হয়। এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবাদ দেখা দেয়। আইনসভায় সুভাষচন্দ্র বসুসহ অন্যান্য নেতারা এর তীব্র যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।প্রথম সংস্করণে মোট তিন হাজার কপি ছাপানো হয়েছিল। বই হয়ে বেরনোর সঙ্গে-সঙ্গেই সব কপি বিক্রি হয়ে যায়। প্রথম দিকে ইংরেজ কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্য ছিল বইয়ের লেখক, মুদ্রক ও প্রকাশক; সকলকেই শাস্তি দেওয়া। আইনি লড়াই শুরু করেন চিত্তরঞ্জন দাস,রাসবিহারী বসু , সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জির মত বাঘা ব্যারিস্টাররা। শেষে আইনি যুদ্ধ শুরু হয়। প্রায় বারো বছর পর ১৯৩৯ সালের ১০ মে এই উপন্যাসের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।

Scroll to Top