প্রয়াত চলচ্চিত্র পরিচালক রাজা সেন

৩৬৫ দিন।প্রয়াত হলেন বর্ষীয়ান বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক রাজা সেন। রবিবার কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭১ বছর বয়সে মৃত্যু হয় তাঁর। তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী এই পরিচালক বেশ কিছুদিন ধরেই একাধিক শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। শেষ কয়েক দিন তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হয়। তাঁকে ভেন্টিলেটর সাপোর্টে রাখা হয়েছিল।
হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানিয়েছেন, একাধিক জটিলতার কারণে তাঁর অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক ছিল। চিকিৎসা চললেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।এদিন তাঁর মরদেহ নন্দনে নিয়ে আসা হয়।
‘মায়া মৃদঙ্গ’-এর শুটিংয়ে গুরুতর চোট
রাজা সেনের দীর্ঘদিনের শারীরিক সমস্যার সূত্রপাত কয়েক বছর আগে। মায়া মৃদঙ্গ ছবির শুটিং চলাকালীন সেটে পড়ে গিয়ে গুরুতর পিঠে চোট পান তিনি। সেই সময় চোটটি খুব গুরুতর বলে মনে না হলেও পরবর্তী সময়ে তা তাঁর চলাফেরায় দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। ক্রমে শারীরিক সমস্যা আরও জটিল হয়ে ওঠে।
তথ্যচিত্র দিয়ে চলচ্চিত্রজগতে পথচলা
আশির দশকে তথ্যচিত্র তৈরির মাধ্যমে চলচ্চিত্রজগতে আত্মপ্রকাশ করেন রাজা সেন। রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সুচিত্রা মিত্রকে নিয়ে তৈরি তাঁর তথ্যচিত্র ‘সুচিত্রা মিত্র’ ১৯৯৩ সালে জাতীয় পুরস্কারে সেরা শিল্প ও সাংস্কৃতিক চলচ্চিত্রের সম্মান পায়।
১৯৯৬সালে ‘দামু’ ছবির মাধ্যমে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র পরিচালনায় পা রাখেন তিনি। এই ছবিই তাঁকে সর্বভারতীয় স্তরে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়।দামু জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা শিশু চলচ্চিত্রের সম্মান অর্জন করে।
তিনবার জাতীয় পুরস্কার
১৯৯৯ সালে ‘আত্মীয় স্বজন’ ছবির জন্য সেরা পরিবারকল্যাণ বিষয়ক চলচ্চিত্রের জাতীয় পুরস্কার পান রাজা সেন। অর্থাৎ তাঁর পরিচালিত তিনটি কাজ জাতীয় পুরস্কারে সম্মানিত হয়।এছাড়াও সুবর্ণলতা ধারাবাহিক ছিল অন্যতম সৃষ্টি।সিনেমা আত্মীয় স্বজন,দেশ,দেবীপক্ষ,কৃষ্ণকান্তের উইল,ল্যাবরেটরি,এবং মায়া মৃদঙ্গসহ একাধিক উল্লেখযোগ্য ছবি রয়েছে তাঁর পরিচালনায়। ২০০২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দেশ’ ছবিতে অভিনয় করেছিলেন জয়া বচ্চন ও অভিষেক বচ্চন। তাঁর একাধিক ছবি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও প্রশংসিত হয়েছে।
সংস্কৃতি জগতের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে তথ্যচিত্র
শুধু চলচ্চিত্র নয়, তথ্যচিত্র নির্মাণেও বিশেষ অবদান ছিল রাজা সেনের। বাংলার সংস্কৃতি ও শিল্পজগতের একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে নিয়ে তথ্যচিত্র তৈরি করেছিলেন তিনি। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন রবীন্দ্রসঙ্গীতের বিশিষ্ট শিল্পী সুচিত্রা মিত্র।
শোকের ছায়া বাংলা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন জগতে
রাজা সেনের প্রয়াণে বাংলা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন জগতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। কয়েক দশক ধরে চলচ্চিত্র ও তথ্যচিত্র নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত থাকা এই বর্ষীয়ান পরিচালকের মৃত্যু বাংলা সংস্কৃতি জগতের কাছে এক অপূরণীয় ক্ষতি।অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় নিজের সোশ্যাল মিডিয়া একাউন্টে লিখেছেন,একজন কিংবদন্তির বিদায় সবসময় বেদনাদায়ক। বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান আমাদের কাছে অমূল্য। রাজাদা, আপনাকে শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি। আপনার স্মৃতি এবং সৃষ্টি চিরকাল থেকে যাবে।এদিকে চিরঞ্জিত চক্রবর্তী বলেছেন,রাজা সেনের সঙ্গে আমার আলাপ বহু বছরের। ও ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড উইনার। বড় দুর্ভাগ্যের কথা যে রাজা চলে গেল।পরিচালকের মৃত্যুতে মর্মাহত অভিনেতা আরও বলেন, “রাজাকে হারানো মানে এটা ইন্ডাস্ট্রির খুব বড় ক্ষতি হল, আমার নিজের পার্সোনালি ক্ষতি হল খুব।তবে তাঁর চলে যাওয়াকে একেবারেই মানতে পারছেন না বর্ষীয়ান অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিক।তিনি বলেছেন,আমি কিছুদিন ধরেই শুনছিলাম উনি অসুস্থ। এভাবে যে চলে যাবেন ভাবা যায়? ৭০ একটা বয়স? আমি প্রায় ৩টে ছবিতে কাজ করেছি। পরিচালক হিসেবে অত্যন্ত নিদারুণ। মানুষ তো ভাল বটেই। কাজের ফাঁকে কত গল্প করেছি। আড্ডা মেরেছি। উনি এমন এক পরিচালক, যার সঙ্গে কাজ করে আমি খুশি হয়েছিলাম। সত্যিই আজ মন খারাপের দিন।

Scroll to Top