চিনির আকাশছোঁয়া দাম, কারিগরের সঙ্কট
কালী পুজোয় ‘কদমা’র ভবিষ্যৎ ঘিরে সংশয়

খবর ৩৬৫। বিশ্বজিৎ ব্যানার্জী। কালীপুজোর মণ্ডপে মণ্ডপে মা কালীর নৈবেদ্যে যে সুদৃশ্য ধবধবে সাদা কদমা না হলেই নয়, আজ তার অস্তিত্বই যেন টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত। চিনির পাক দিয়ে তৈরি, দেখতে কদম ফুলের মতো মাঝখানে ফাঁপা এই বিশেষ শুকনো মিষ্টান্নটি বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তবে বর্তমান বাজারে উপাদানের অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি এবং বংশানুক্রমিক কারিগরদের চরম অনীহা—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে ঐতিহ্যবাহী কদমা শিল্প আজ মারাত্মক সংকটের মুখে।
স্থানীয় সূত্রের খবর, একসময় ঐতিহাসিক নবদ্বীপ শহরেই অন্তত ১২ থেকে ১৩টি পরিবার পুরোদমে এই কদমা তৈরির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে সময়ের সাথে সাথে অনেক প্রবীণ কারিগর বয়সের ভারে কাজ ছেড়েছেন, আবার নতুন প্রজন্ম অন্য পেশার দিকে ঝুঁকে পড়ায় এই কাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। বর্তমানে হাতে গোনা দুই-তিনজন কারিগর কোনোরকমে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। দীপাবলি ও কালীপুজোর মরশুমে তাঁদের ওপর কাজের চাপ এতটাই যে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার মতো ফুসরতটুকুও নেই তাঁদের।কারিগর সঙ্কটের পাশাপাশি কদমা শিল্পের ওপর বড় আঘাত হয়ে দাঁড়িয়েছে কাঁচামালের আকাশছোঁয়া দাম। গত বছরের তুলনায় এ বছর চিনির বাজারদর অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি অর্থাৎ কয়লার দাম এবং কারিগরদের মজুরি বৃদ্ধি। নবদ্বীপের গোসাইবাজারের ব্যবসায়ী দীপক পাল বলেন, “কদমা তৈরি করার মতো অভিজ্ঞ কারিগর এখন প্রায় অমিল। তার ওপর চিনির দাম হু-হু করে বাড়ায় প্রতি কেজি কদমার দাম অন্তত ৩০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বাড়াতে বাধ্য হয়েছি। বাজারে চাহিদা ভালো থাকলেও পর্যাপ্ত লোকবলের অভাবে আমরা জোগান দিতে পারছি না।”
আরেক কদমা ব্যবসায়ী চঞ্চল বনিকের গলায় আক্ষেপের সুর। তিনি বলেন, “রোজ রোজ চিনির দাম বাড়ছে, আনুষঙ্গিক খরচ সামলাতে কদমার দাম তো বাড়বেই। এর ফলে বাজারে সাধারণ ক্রেতা তথা খদ্দেরদের মধ্যে চরম অসন্তোষ দেখা দিচ্ছে। আমরা চাই সরকার চিনির দাম নিয়ন্ত্রণে আনুক, তা না হলে ব্যবসা চালানো দায় হয়ে উঠবে।”
বাঙালির ঐতিহ্য আর পুজো পার্বণের ভক্তি যে রসদে মিশে থাকে, সেই কদমা না থাকলে যেন পুজোর থালা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কিন্তু যেভাবে কারিগরের অভাব দেখা দিচ্ছে এবং দাম আগুনের রূপ নিয়েছে, তাতে আগামী দিনের কালীপুজোয় মা কালীর সেই প্রিয় নৈবেদ্য সাধারণের সাধ্যের মধ্যে মিলবে তো? এখন এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে নবদ্বীপের ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ ভক্তদের মনে।

Scroll to Top