৩৬৫ দিন। রাত যত বাড়ে ততই গুলিয়ে যেতে থাকে কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যে। নেটফ্লিক্স এ মুক্তি পাওয়া নীরজ পাণ্ডের ছবি গজব রাত বা আশ্চর্য রাত, ভালো আর মন্দের মধ্যে এমন জট পাকিয়ে দেয়।, ছবির প্রথম ৪০ মিনিট নার্ভ সোজা রেখে বসে থাকতে হয়। আ ওয়েডনেসডে, বেবি, স্পেশাল ২৬, রুস্তম কিংবা এমএস ধোনি খ্যাত নীরজের ছবি তাও আবার দোসর মনোজ বাজপেয়ী, তাহলে তো কথাই নেই। এই ভেবেই ছবি দেখতে বসা। ফলে প্রত্যাশা তো প্রচুর থাকবেই। জমজমাট থ্রিলারের মতো করে শুরু হয় ছবি। কেবল একটি রাতের গল্প। এক রাতেই পরিচালক গল্পের মাউন্টিং এমন একটা জায়গায় পৌঁছে দিলেন, যেখানে দর্শকের মনে একাধিক সম্ভাবনা এবং ভাবনা তৈরি হতে থাকে, অথচ সেখান থেকেই ছবির ছন্দপতনের শুরু। থ্রিলারের টানটান উত্তেজনা ১০০ গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিলেন একাই মনোজ বাজপেয়ী। অ্যাড্রিনালিন ঝড়া শুরু হয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্য রকম ডাউনফল হতে শুরু করলো থ্রিলের।
ছবির গল্প এগোয় অজয় নির্ভিত (মনোজ), দিল্লির এক ঘুষখোর পুলিশ অফিসারকে নিয়ে। যিনি তার বদমেজাজি ব্যবহার এবং অনৈতিক কাজের জন্য একাধিকবার শাস্তি পেয়েছেন সাসপেন্ড হয়েছেন। গল্প শুরু হয় দিল্লির একটি হোটেলে রেড করা দিয়ে। বেআইনি শরীরী ব্যবসা চলছিল কোন এক হোটেলে, সেখানে রেইচ করে ধরপাকড় শুরু করে মনোজ ও তার টিম। মূল উদ্দেশ্য ছিল একটাই, হোটেল মালিকের থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা নেওয়া। যখন মনোজ তার কাজ শেষ করে দেনা পাওনার হিসেব কষে ফেলেছে, সেই সময় দিল্লির নির্জন রাস্তায় ঘটে যায় এক দুর্ঘটনা। দিল্লির রাজপথে গাড়ি থেকে লাফিয়ে পডে় এক তরুণী। ক্ষতবিক্ষত সেই তরুণীকে ঘিরে পথ চলতি মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি তুলে পোস্ট দিতে শুরু করে।। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে রাজনৈতিক মহলে তৎক্ষণাৎ তাকে ঘিরে শুরু হয় নানা চর্চা। মনোজকে অপর মহল থেকে ফোন করে বলা হয় এক এখনই কেস টা টেকওভার করতে। নারী নির্যাতন বিষয়টাকে প্রশাসন ভীষণ করা হাতে দেখছে। অগত্যা অজয়কে আহত এবং অজ্ঞান মেয়েটিকে একটি বেসরকারি নার্সিংহোমে নিয়ে আসতে হয়। ওদিকে রাজনৈতিক নেতাদের নির্দেশে হাসপাতালে পৌঁছে যায় দেশের নামকরা একজন মহিলা সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্ট। কিছুক্ষণের মধ্যেই হাসপাতালে হাজির হয় সিবিআইয়ের বড় কর্তা, একইসঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা দপ্তরের এক গোয়েন্দা।
কখনও সিবিআই অফিসার মাধোক এসে বলে তরুণী রাশিয়ান ড্রাগ ডিলার। আবার কখনও এনআইএ-র করণ বলে মেয়েটি ব্রিটিশ। প্রত্যেকের উদ্দেশ্যই এক। মেয়েটিকে মেরে ফেলা।
রাষ্ট্রীয় মন্ত্রী থেকে প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্তারা যখন এই মেয়েটিকে মেরে ফেলার জন্য নানা দিক থেকে উদ্যোগ নেয়, হঠাৎই ঘুষখোর, ইমমরাল অজয় বেঁকে বসে। মেয়েটিকে হত্যা করলেই যে পরিমাণ টাকা ওর একাউন্টে ঢুকতো, তা দিয়ে সুইমিংপুল ওয়ালা বাড়ি, যার স্বপ্নে ও সারা জীবন পুলিশই চাকরিতে ঘুষ নিতে পিছপা হয়নি, এসবের লোভনীয় হাতছানি কে উড়িয়ে দিয়ে নীতিহীন পুলিশ অফিসার অজয় মেয়েটিকে বাঁচানোর জন্য সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সামান্য একজন এসআই কিভাবে তার আইনের গন্ডিতে আবদ্ধ থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী এবং প্রশাসনকে চুপ করিয়ে রাখতে পারে, তা নীরজ পাণ্ডের ছবিটি প্রতিমুহূর্তে প্রমাণ করেছে।
অবশেষে অজয় খুঁজে বের করে মেয়েটির নাম আরিয়া। সে ভারতীয়।আর লেখা, স্বভাবতই দর্শক হিসেবে ছবিটা নিয়ে বাড়তি উৎসাহ থাকবেই। কিন্তু উৎসাহে জল ঢেলে দিলো ছবির ক্ল্যাইম্যাক্স। পুরো ছবি জুড়ে তিল-তিল করে গড়ে তোলা উত্তেজনা একেবারে নিমেষে শেষ করে দেয় গল্পের গতিপথ। যে ধরনের ট্যুইস্ট নীরজ-মনোজ জুটির কাছ থেকে আশা করেন দর্শকরা, তা পূরণ করতে কিছুটা ব্যর্থ হয়েছেন তাঁরা। এই ছবি মনোজের, বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রায় প্রতিটা দৃশ্যেই তিনি রয়েছেন। আর তিনি আছেন বলেই ছবির তাল কাটেনি। বিশেষ চরিত্রে দেখা যায় রাজীব গুপ্ত, কিকু শারদা আর নুসরত ভারুচাকে।
তবে ছবিটি শেষ হয় অত্যন্ত সাদামাটা ভাবেই। যা নীরজ পাণ্ডের ছবি র ধরনের বিপরীত। শুধু ভয় দেখিয়ে পদত্যাগ করে দিতে বলে, অসুস্থতার বাহানা করে সরে যেতে বলে, আর সে তা–ই করে। হঠাৎ করে একটি কেসের জন্য আদ্যোপান্ত ঘুষখোর এ মানুষ সৎ হয়ে যায়। আবার সে বাকিদেরও বক্তৃতা দিয়ে সৎ করে দেয়। এ ধরনের গল্প অন্তত নীরজ পাণ্ডের কাছ থেকে প্রত্যাশিত নয়। তবুও বলবো, ছবিটা দেখা উচিত এই কারণে, ছবিটার মধ্যে লুকানো একটা মেসেজ আছে। যেটা সামাজিকভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণ। পরে অবশ্য জানলাম, গল্পটা নীরজ লিখলেও ছবি বানিয়েছেন রিতেশ শাহ। গল্পের ক্লাইম্যাক্স চূড়ান্ত জায়গা থেকে নিচের নিচে ঝপ করে পড়ে যাওয়ার আসল কারণ বুঝলাম, তবে চিত্রনাট্যের জন্য নীরজ পার পাবেন না।




