উৎসবে গ্রাম ও শহরের মেলবন্ধন, বাঙালির ঐতিহ্য এবং আনন্দের চিরন্তন আবহ—সব মিলিয়ে ‘পার্বণ’

৩৬৫ দিন। ‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’ এই বহুলপ্রচলিত প্রবাদটি কেবল উৎসবের তালিকা নয়—বরং বাঙালির জীবনসংগ্রামের সঙ্গে আনন্দের এক চিরন্তন চুক্তি। দৈনন্দিন জীবনের অভাব-অনটন, সুখ-দুঃখ এবং টানাপোড়েনের ক্লান্তি ভুলে মানুষ কীভাবে বারবার উৎসবে সামিল হয়ে জীবনের নতুন রস খুঁজে নেয়—সেই আবহকেই এবার নিজেদের মণ্ডপে ফুটিয়ে তুলেছে বেহালা নতুন দল। চলতি বছরে তাদের দুর্গাপুজো ৬১তম বর্ষে পদার্পণ করল। বিশিষ্ট শিল্পী সোমনাথ তামলির ভাবনা ও নির্দেশনায় এবারের থিম নির্ধারণ করা হয়েছে ‘পার্বণ’।
পার্বণের ভাবনা ও মূল উদ্দেশ্যের সম্পর্কে শিল্পী সোমনাথ তামলি জানান, পার্বণ বা উৎসবের ধারণা দুর্গাপুজোতে নতুন নয়। তবে এর প্রকাশভঙ্গি ও সময়ের সঙ্গে সংযোগই একে অনন্য করে তোলে। বাঙালির ঐতিহ্যবাহী এই বারো মাসের পার্বণগুলিতে শুধু শহরের মানুষ নয়—জড়িয়ে থাকে প্রান্তিক ও গ্রামীণ মানুষের জীবনও। বেহালা নতুন দলের এই আয়োজনে শহরের আধুনিক জীবনযাত্রার সঙ্গে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উৎসবকে এক সুতোয় গাঁথা হয়েছে। মণ্ডপে এলে দর্শনার্থীরা দেখতে পাবেন কীভাবে চড়কপুজো, রথের মেলা কিংবা আদিবাসীদের ‘হুল উৎসব’ ও শালগাছের ফুলপুজোর মাধ্যমে নতুন বছর উদযাপিত হয়।
পার্বণ হল দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি কাটিয়ে আনন্দের আলো। বাংলার মাটি, ঋতু ও মানুষের সঙ্গে এর সম্পর্ক প্রাচীন। টুসু, ভাদু, সহরাই, রথের মেলা, চড়ক ও নববর্ষে ফুটে ওঠে কৃষি ও মানুষের নিবিড় সম্পর্ক। আবার কলকাতার দুর্গাপুজোও হয়ে ওঠে শিল্প ও মহামিলনের উৎসব। পার্বণ শুধু আচার নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কৃষকের শ্রম, শিল্পীর কল্পনা ও ঘরে ফেরার আকুলতা। এই মিলনক্ষেত্রে মুছে যায় ধনী-দরিদ্র, জাতি-ধর্মের ভেদাভেদ এবং জেগে ওঠে সম্প্রীতি ও একসঙ্গে বেঁচে থাকার বিশ্বাস।
সময়ের পরিবর্তন
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পের রূপও বদলায়। ২০০০ সালের শিল্পভাবনার চেয়ে ২০২৬ সালের ভাবনায় সময়ের স্পষ্ট ছাপ থাকা স্বাভাবিক। বেহালা নতুন দলও সেই সময়ের পরিবর্তনকে ধারণ করে নিজেদের কাজে আধুনিক নকশা ও ভাবনার ছোঁয়া এনেছে। বিগত চার থেকে পাঁচ মাস ধরে চলছে এই বিশালাকার মণ্ডপ ও প্রতিমা তৈরির কাজ। প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জন শিল্পী ও কলাকুশলীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় রূপ পাচ্ছে এই শিল্পপ্রয়াস। খোলা আকাশের নিচে কাজের ক্ষেত্রে বৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক নানা চ্যালেঞ্জ এলেও তা অতিক্রম করে কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
প্রতিমা ও সঙ্গীতের বিশেষ মেলবন্ধন সম্পর্কে শিল্পী বলেন, এবারের প্রতিমার ভাবনায় বজায় রাখা হয়েছে আবহমান বাংলার পারিবারিক আবহ। দেবী দুর্গা যেমন মর্ত্যে আগমন করেন তাঁর সন্তান ও বাহনদের নিয়ে, তেমনই মণ্ডপে একদিকে যেমন সমবেত মানুষের ভিড় থাকবে, অন্যদিকে মা-ও যেন সেই উৎসবে মেতে ওঠা মানুষের দিকেই এগিয়ে আসছেন। উৎসবের এই আবহকে আরও জীবন্ত করে তুলতে থাকছে বিশেষ আবহসঙ্গীত ও লিরিক্সের ব্যবহার, যা সহজ-সরল ভাষায় প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে যাবে। প্রযুক্তি ও মূল ধারার শিল্পের লড়াই বর্তমানে এআই বা প্রযুক্তির প্রভাবে শিল্পের অবমূল্যায়ন নিয়ে যে জল্পনা চলছে, সে বিষয়ে শিল্পী সোমনাথ তামলি একেবারেই চিন্তিত নন। তাঁর মতে, প্রযুক্তি হয়তো কিছু কাজের বিকল্প হতে পারে, কিন্তু শিল্পের পিছনের ক্ষুধা, কঠোর শ্রম ও আবেগ কখনও এআই দিয়ে তৈরি সম্ভব নয়। এআই-এর তৈরি নকশায় একটি যান্ত্রিক বা একঘেয়ে ভাব থেকে যায়, যা মানুষের হাতে তৈরি শিল্পের আসল সৌন্দর্য বা দাম কমাতে পারে না।
নতুন প্রজন্মের কাছে বাঙালির এই হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরাই বেহালা নতুন দলের মূল লক্ষ্য। যান্ত্রিক শহরের মানুষ যখন এই মণ্ডপে পা রাখবেন, তাঁরা যেন এক নিমেষে বাংলার লোকজ পার্বণের আবহে ডুবে যেতে পারেন—সেই প্রস্তুতিতেই এখন চূড়ান্ত ব্যস্ত উদ্যোক্তারা।

Scroll to Top