৩৬৫ দিন। শুক্রবার আলিপুরদুয়ারের বক্সার জঙ্গলে রাজ্যের প্রথম ব্যাঘ্র পুনর্বাসন কর্মসূচির সূচনা হল। বিহারের বাল্মিকী টাইগার রিজার্ভ থেকে আনা তিন বছরের বাঘিনীকে এদিন বক্সার জঙ্গলে ছাড়া হয়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং কেন্দ্রীয় পরিবেশ ও বনমন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব সহ অন্যান্য বিশিষ্ট জনেরা এদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। বাঘিনীটিকে সরাসরি গভীর জঙ্গলে না ছেড়ে ‘সফট রিলিজ’ করা হয়, যেখানে তার শিকার করার ক্ষমতা এবং গতিবিধির ওপর নজর রাখা হবে। পরবর্তীতে তাকে মুক্ত জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হবে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, খুব শীঘ্রই বক্সায় আরও তিনটি বাঘ আনা হবে। পাশাপাশি জয়ন্তী, মানস লাগোয়া এলাকায় ২০০০ একর জমির উপর পৃথিবী বিখ্যাত অভয়ারণ্য তৈরি করা হবে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “কেন্দ্রীয় সরকার, বিহার সরকারকে ধন্যবাদ জানাব, তাদের সহযোগিতায় বক্সার জঙ্গলে আমরা বাঘিনী ছাড়তে পারলাম। পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে গোটা পৃথিবীর পর্যটককে রাজ্যে নিয়ে আসবে। শীঘ্রই আরও তিনটি বাঘ এখানে ছাড়া হবে। আগের সরকারের এই কাজ করার মানসিকতা, প্রচেষ্টা ছিল না। আগের সরকারের এই কাজ করার কোন রকম কোন মানসিকতা ছিল না। তৃণমূল সরকারের সময় বনাঞ্চল লুট হয়েছে, বন্যপ্রাণী শিকার হয়েছে। আলিপুরদুয়ারের মানুষ কিছুই পায়নি। উন্নয়নের মাধ্যমে আমরা আলিপুরদুয়ারের ঋণ শোধ করে দেব। আগে টাইগার রিজার্ভ ছিল, কিন্তু এখানে কোন বাঘ ছিল না। আমরাই এই কাজ করলাম।” উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের পর ২০২১ সালের ডিসেম্বর, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বক্সার জঙ্গলে বসানো ট্র্যাপ ক্যামেরায় রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের ছবি ধরা পড়ে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এগুলি কোনও স্থায়ী বাঘ ছিল না। বাঘগুলি প্রতিবেশী দেশ ভুটান অথবা অসমের মানস জাতীয় উদ্যান থেকে সীমানা পার হয়ে বক্সার জঙ্গলে সাময়িকভাবে যাতায়াত করছিল। তাই বক্সায় এই নতুন সদস্যের আগমন তাৎপর্যপূর্ণ।
জয়ন্তীর পাশে অভয়ারণ্য
এদিনের অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, জয়ন্তী ও মানস লাগোয়া অঞ্চলের ২০০০ একর জমির উপর পৃথিবী বিখ্যাত অভয়ারণ্য গঠন করা হবে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “কেন্দ্রীয় বনমন্ত্রী (ভূপেন্দ্র যাদব) আমাকে বলেছেন, জয়ন্তী লাগোয়া ২০০০ একরের আরো একটি জঙ্গল চিহ্নিত করুন, যেখানে পৃথিবী বিখ্যাত ফরেস্ট ডেস্টিনেশন গড়ে উঠবে। খুব দ্রুত এই কাজ করা হবে।” এই কাজের জন্য কেন্দ্রীয় বনমন্ত্রকের তরফে একজন বরিষ্ঠ আধিকারিককে রাজ্যের হয়ে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন কেন্দ্রীয় বনমন্ত্রী।
ফাউন্ডার গ্রুপ’ তৈরি করে বাঘের বংশ বিস্তার
দুটি বাঘিনী এবং একটি বাঘ মিলে একটি ফাউন্ডার গ্রুপ গঠন করে, বাঘের প্রজননের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে বন দফতর। সাধারণত বাঘের প্রজননের ক্ষেত্রে, এই ধরনের ফাউন্ডার গ্রুপ গঠন করা হয়। যে গ্রুপে একের অধিক বাঘিনী থাকে এবং প্রজননের মাধ্যমে বাঘের বংশবিস্তার বৃদ্ধি পায়। বাল্মিকী টাইগার রিজার্ভ থেকে তিন বছরের যে টি-১৩৮ বাঘিনীকে আনা হয়েছে, তার সঙ্গে আরো একটি বাঘিনী ও একটি বাঘ মিলে বৈজ্ঞানিক উপায়ে ফাউন্ডার গ্রুপ গঠন করে বক্সার জঙ্গলে বাঘের বংশবিস্তার বৃদ্ধি করার দিকে মনোনিবেশ করা হচ্ছে।
এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য বাল্মিকী টাইগার রিজার্ভে চার বছর বয়সের ইতিমধ্যেই ৭টি বাঘ চিহ্নিত করা হয়েছে। কেন্দ্রের ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন অথরিটি ইতিমধ্যেই আরও বাঘ আনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র দিয়েছে। এ দিন বক্সায় ‘সফট রিলিজের’ পর বন দফতরের আধিকারিকেরা প্রত্যেক মুহূর্তে বাঘিনীর ওপর নজর রাখছে। বাঘিনীটিকে রেডিও কলার পরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে জঙ্গলের ভেতর বাঘিনীর গতিবিধির ওপর নজর রাখা যায়। বক্সার জঙ্গলে বন দফতরের আধিকারিকদের আরো বেশি সংখ্যায় নিয়োগের দিকে নজর দেওয়া হয়েছে। এই মুহূর্তে বক্সার জঙ্গলে ৮৫ শতাংশ ফরেস্ট গার্ড পোস্ট খালি রয়েছে। বিট অফিসারের ক্ষেত্রেও ৫০ শতাংশ পোস্ট খালি রয়েছে। ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া’র ২০২৩ এর রিপোর্ট অনুযায়ী ৩৫৬টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ২০০ পদ খালি রয়েছে। এই খালি পদ পূরণ শুরু হয়েছে চলতি বছরে। একবার এই পদগুলি পূরণ হয়ে গেলেই, বক্সার জঙ্গলে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা আধিকারিকের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাবে। ফলে জঙ্গলে বাঘের গতিবিধির ওপর আরো ভালোভাবে নজর রাখা সম্ভব হবে এবং বাঘের বংশবিস্তারের জন্য বনদপ্তরের উদ্যোগে পরিকাঠামো সুনির্দিষ্ট করা হবে।
আলিপুরদুয়ারের উন্নয়ন
ব্যাঘ্র পুনর্বাসন কর্মসূচির পাশাপাশি এদিন আলিপুরদুয়ারের উন্নয়ন নিয়েও একগুচ্ছ কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, আলিপুরদুয়ার জেলায়, ডিস্ট্রিক্ট কোট শীঘ্রই উদ্বোধন হবে। আলিপুরদুয়ার মিউনিসিপালিটি হবে। এই জেলায় পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠবে। তার কথায়, “আলিপুরদুয়ারের মানুষ এতদিন কিছু পায়নি। এবার দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন আপনাদের হয়ে কাজ করবে। আগামী ১৫ নভেম্বর জনজাতি গৌরব দিবসে আমি আলিপুরদুয়ারে আসব। তার আগে এখানে এসে একবার প্রশাসনিক বৈঠক করব। আলিপুরদুয়ার সহ কালিম্পং, বালুরঘাট, পশ্চিম বর্ধমান নিয়ে ৪টি নতুন কলেজ হচ্ছে। ধীরে ধীরে বন্ধ চা বাগান গুলি খোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। চা শ্রমিকদের ২০ শতাংশ বোনাস দেওয়া হচ্ছে। চা শ্রমিকদের উন্নয়নের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে ৩১২ কোটি টাকা আমরা অনুমোদন করিয়ে এনেছি। আমরা স্মার্ট স্কুল গঠন করব। টোটোপাড়ার বাসিন্দাদের জন্য বাড়ি, সৌর বিদ্যুৎ, শৌচালয়, পানীয় জল এবং বিশেষ রেশন কিট দেওয়া হবে।”





