৩৬৫ দিন। শ্রীদাত্রী ঠাকুর । কলকাতা শহরের অন্যতম প্রধান ঐতিহ্যবাহী পুজো কমিটি গড়িয়াহাট হিন্দুস্থান ক্লাব সার্বজনীন দুর্গাপূজা কমিটির এই বছর তাদের চৌষট্টিতম বর্ষে এক অনন্য এবং মনোমুগ্ধকর থিমের মাধ্যমে দর্শকদের মন জয় করার প্রস্তুতি নিয়েছে। এই বছরের তাদের থিম হলো ‘দুর্গা দালান’। উত্তর কলকাতার বনেদি বাড়ির সেই শাশ্বত রূপ এবং সনাতন ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটিয়ে এই পুজোর আয়োজন করা হচ্ছে। দুর্গা দালান হলো সনাতন বাঙালি, জমিদার ও বনেদি বাড়ির একটি নির্দিষ্ট ও পবিত্র অংশ, যেখানে প্রতি বছর দুর্গোৎসবের সময় দেবী দুর্গার প্রতিমা স্থাপন করে পুজো করা হয়। এটি সাধারণত বাড়ির উঠানের এক পাশে বা অন্দরমহলের সামনে অবস্থিত উঁচু ও প্রশস্ত একটি বারান্দা বা হলঘর, যার পাশে স্তম্ভ বা পিলার থাকে। এই দালানের কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য ও ইতিহাস আছে— যেমন স্থাপত্যের ক্ষেত্রে সুন্দর কারুকাজ খচিত স্তম্ভ পিলার ও মার্বেল বা চুন সুরকির মেজে এবং ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে উত্তর কলকাতার ও গ্রামীণ বাংলার পুরনো বনেদি বাড়িগুলোতে এই দালানগুলো শতবর্ষের ঐতিহ্য বহন করে। এছাড়া এর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বও অপরিসীম; পুজোর কদিন বাড়ির সব আত্মীয়া ও শরিকরা এই দালানে একত্রিত হন এবং সন্ধিপূজা, ধুনো পোড়ানো, কুমারী পুজো ও সিঁদুর খেলা মূলত এই দালান ঘিরে সম্পন্ন হয়। সময়ের সাথে সাথে পারিবারিক দালান পুজোর গণ্ডি পেরিয়ে আজ সর্বজনীন রূপ নিলেও, বনেদি বাড়ির দালানগুলো আজ ও তাদের স্বকীয় ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।
এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মূল কারিগর ও শিল্পী রাজু সরকার জানিয়েছেন যে, বর্তমান সময়ে কলকাতা শহরে পুরনো শৌখিন দালানগুলো ক্রমশ ফ্ল্যাট বাড়ির ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে এবং এর ফলে বাঙালি সংস্কৃতি ও ইতিহাসও মলিন হয়ে আসছে। ছোট হয়ে আসা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক বন্ধন ও সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়া ফিরিয়ে আনতেই মূলত এই থিমটি বেছে নেওয়া হয়েছে। শিল্পী আরও উল্লেখ করেছেন যে এই ভাবনাটি সম্পূর্ণ তারই নিজস্ব এবং ছোট পরিসরের মধ্যে একটি ঐতিহ্যবাহী দালানের বিশেষ অংশ ও সেই সময়ের প্রতিনিধি স্বরূপ কিছু স্তম্ভ বা পিলারের ব্যবহার ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে। প্যান্ডেল নির্মাণের ক্ষেত্রে প্লাই, কাঠ, পুটি এবং প্লাস্টার ব্যবহার করা হচ্ছে এবং সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব সামগ্রী যেমন বাঁশ ও কাঠ দিয়েই পুরো কাঠামোটি তৈরি করা হচ্ছে। ১৫ই অগাস্টের পর থেকেই এই মণ্ডপ নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে এবং এতে প্রায় সত্তর থেকে আশি জন শিল্পী অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন। প্রতিমার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সাবেকিয়ানা বজায় রাখা হয়েছে এবং মাটির সাজসজ্জার মাধ্যমেই দেবীকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মায়ের মুখের অভিব্যক্তি খুব শান্ত, প্রীতিকর এবং এক স্নিগ্ধ মাতৃরূপে গড়া হয়েছে। শিল্পীর মতে, দর্শকরা আজকাল সাবেকি এবং থিম— উভয় ধরণের রূপই সমানভাবে পছন্দ করেন।
অন্যদিকে, পুজো কমিটির সদস্য জানিয়েছেন যে, উত্তর কলকাতার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ও বনেদিয়ানাকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার জন্যই এই দুর্গা দালান থিমের ভাবনা নেওয়া হয়েছে। সময়ের সঙ্গে আধুনিকতার ছোঁয়া থাকলেও ঐতিহ্যের মূল ভিত্তি যেন কোনোভাবেই হারিয়ে না যায়, সেটাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। সমাজের প্রতিটি স্তরে উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি তারা সারা বছর ধরে রক্তদান শিবিরের মতো বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজও নিয়মিত পরিচালনা করে থাকেন। রথের দিন খুঁটি পুজো হওয়ার দু-চার দিন পর থেকেই এই মণ্ডপ তৈরির কাজ শুরু হয়েছিল এবং প্রতি বছরের মতো এবারও পরিবেশবান্ধব উপায়ে এবং ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেই এই পুজোর আয়োজন করা হচ্ছে, এবং আলোর চাদওয়ায়ও লাগানো থাকবে যেটা দেখার জন্য বহু মানুষ আসেন। পরিশেষে বলা যায়, আধুনিকতার চকমকি আর কৃত্রিমতার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা শিকড়ের সন্ধান দিতে গড়িয়াহাট হিন্দুস্থান ক্লাবের এবারের এই প্রয়াস এক অন্য মাত্রার আবেগ বয়ে এনেছে। প্যান্ডেলের সুনিপুণ কারুশিল্প, পরিবেশসচেতন আয়োজন এবং সাবেকি প্রতিমার স্নিগ্ধ রূপ দর্শনার্থীদের শুধু নস্টালজিয়ায় ভাসাবে না, বরং পুরনো দিনের যৌথ পরিবার ও সংস্কৃতির সেই চিরন্তন মেলবন্ধনের অনুভূতিও ফিরিয়ে দেবে। সবমিলিয়ে, শারদোৎসবের কটি দিন এই দুর্গা দালানের আঙিনায় বাঙালির প্রাণের উৎসব এক পঞ্জাব্যাপী আনন্দের নতুন ইতিহাস তৈরি করার চেষ্টা করছেন।
গড়িয়াহাট হিন্দুস্থান ক্লাব সার্বজনীন দুর্গাপূজা কমিটির শিল্পী রাজু সরকারের ” দুর্গা দালান” -৬৪তম বর্ষে ফিরছে বনেদি বাড়ির নস্টালজিয়া
- khabar365din
- October 2, 2026
- 2:36 pm
- No Comments





