হেডফোনের তার পেঁচিয়ে হামলাকারী কো পাইলটকে কাবু করেন বিমানের তিন যাত্রী
নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যে অশান্তির মেঘ ঘনানোর আশঙ্কা

৩৬৫ দিন। ফ্লাইদুবাই ১০৭৩! দূবাই থেকে ইজরায়েলের তেল আভিভে যাওয়ার পথে সৌদির আকাশে বিমানের ককপিটে পাইলটের শরীরে পর পর ছুরি গেঁথে দিচ্ছে তার পাশের আসনে বসা সহকারী পাইলট – বুধবার এই ছবি দেখে হতবাক হয়ে গিয়েছে গোটা বিশ্ব। অসামরিক বিমান পরিবহনের ইতিহাসে এই ঘটনা বিরলতম। পাইলট ও কো পাইলটের জুটির ওপরেই বিমানের ভালো মন্দ নির্ভর করে। সেখানে কো পাইলট যদি পাইলটকে খুন করতে উদ্যত হয় তাহলে বিমান বাঁচে না। তবু ভাগ্য সহায় যে ফ্লাইদুবাই ১০৭৩ ভেঙে পড়েনি। ভয়ঙ্কর বিপদ থেকে এক রকম আশ্চর্য রক্ষা পেয়েছে বিমান ও তার শতাধিক যাত্রী। কি ভাবে ৩৪,০০০ ফুট থেকে ১৭,০০০ ফুটে আচমকা নেমে আসা বিমান রক্ষা পেল সেই কাহিনী যখন সামনে আসছে তা যেন কোনো হলিউডি সিনেমার চিত্রনাট্য। টান টান সাসপেন্স, অ্যাকশন।
হেডফোনের তারে কাবু কোও পাইলট
নিশ্চিত বিপর্যয়ের হাত থেকে ফ্লাইদুবাই ১০৭৩ কে বাঁচানোর হিরো যদি কেউ হয় তাহলে তিনি বিমানের পাইলট ভারতীয় বংশোদ্ভুত স্মিত মচ্ছর। কো পাইলট যখন বিমানে অঘটন ঘটাতে চাইছেন তখন একার হাতে তাকে রুখে দেন স্মিথ। মরিয়া কো পাইলট যখন ছুরি দিয়ে ক্রমাগত তার শরীর রক্তাক্ত করছে তখন- ও বিমানের ওপর নিয়ন্ত্রন হারাননি তিনি। কোনো রকমে হামলা প্রতিহত করে বিমানের ককপিটের দরজা খুলে দেন তিনি। এই খানে বলতে হবে আরো তিন জনের কথা। আজকে যে ফ্লাইদুবাইয়ের বিমান অক্ষত তার পিছনে এই তিনজনের অবদান অনস্বীকার্য। এরা হলেন জভিকা ম্যানেস, আসাফ রাজওয়ান এবং ইয়ানিভ হায়ুনও। তিন জন-ই বিমানের সামনের সারিতে বসে ছিলেন। ম্যানেস বলছেন, বিমানের ককপিটে যে কিছু একটা গন্ডোগোল চলছে তা আগে থেকেই আঁচ পেয়েছিলাম কারণ বিমান দ্রুত নিচে নামছিল যা অস্বাভাবিক। তারপর যখন বিমানের ককপিট খুলে পাইলটকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে যেতে দেখলাম আর দেরী করিনি। তিন জন এক সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ি হামলাকারী কো পাইলটের ওপর। আসলে কো পাইলট যে পাইলটকে মেরে বিমানে সাবোটাজ করতে চাইছেন তা‌ বিশ্বাস করতে‌ পারছিলাম না। কিন্তু যখন বুঝলাম তখন আর আমরা দেরী করিনি। কো পাইলটকে হেডফোনের তার পেঁচিয়ে প্রথমে কাবু করে ফেলি। তারপর তার হাত থেকে ছুরি কেড়ে নিয়ে জিপার দিয়ে হাত বেঁধে ফেলি। আসাফ রাজওয়ান ও ইয়ানিভ বলছেন, ভাগ্য ভালো যে ওই বিমানে দু’জন পাইলট ছিলেন যারা ডিউটি শেষ করে বাড়ি ফিরছিলেন তারাই বিমানকে শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রনে আনেন। এটিসির সঙ্গে যোগাযোগ করে গোটা ঘটনার কথা জানান। বিমানে ইজরায়েলি এক দন্তচিকিৎসক শোতা মোসায়েভ ছিলেন তিনিই প্রাথমিক ভাবে ছুরির ঘায়ে মারাত্মক ভাবে জখম পাইলট স্মিথের চিকিৎসা করেন। বিমান ল্যান্ড করার পর পুলিশ সেনাবাহিনী এসে সকলকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়।
৯/১১ হতে পারত, হিরো স্মিথের প্রশংসায় মোদি-ট্রাম্প-নেতানিয়াহু
নিশ্চিত দুর্ঘটনা কেউ কেউ বলছেন নাশকতার হাত থেকে ফ্লাইদুবাইয়ের বিমানকে বাঁচানো স্মিথের প্রশংসায় মোদি থেকে ট্রাম্প।‌ বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন,  “ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছর একজন নায়ক। ভয়ঙ্কর বিপদের মুখে গুরুতর ভাবে জখম হয়েও তিনি অসীম সাহসিকতা দেখিয়েছেন। অন্যদের প্রাণরক্ষার দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হননি।” মোদি জানান, স্মিতের সাহসিকতার জন্যই কয়েকশো মানুষ বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছেন। স্মিতের দ্রুত আরোগ্য কামনাও করেছেন মোদী। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু জানিয়েছেন, স্মিতের জন্য গোটা দেশ গর্বিত। মোদির আশঙ্কা, ৯/১১ হতে হতে বাঁচা গিয়েছে। এর জন্য স্মিথের উপস্থিত বুদ্ধি,‌সাহসিকতাকে কুর্নিস। মার্কিন প্রেসিডেন্ট‌ ট্রাম্প বলেন, ‘পাইলট স্মিত অসাধারণ কাজ‌ করেছেন। শুনেছি উনি মারাত্মক ভাবে আঘাত পেয়েছেন। তারপরেও যে তিনি বিমানের ওপর নিয়ন্ত্রন হারাননি এটা অ সামান্য বিষয়। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বলেন, যে ভাবে কো পাইলট ‌হামলা চালায় ককপিটের ভেতর তা ভাবা যায়না। এটা সন্ত্রাসবাদী হামলা। পাইলট সাহসী না হলে নিশ্চিত বিপর্যয় অপেক্ষা করেছিল। ১৮০ জন যাত্রীর প্রাণ বাঁচানো স্মিথ আমাদের হিরো।
অস্ত্র এলো কোথা থেকে?
ফ্লাইদুবাই বিমানের ঘটনায় সব থেকে বড় যে প্রশ্ন সামনে আসছে তা হল‌ বিমানের ককপিটে ছুরি বা কুঠার জাতীয় ধারালো অস্ত্র এল কী করে? নিয়ম হল পাইলট কো পাইলটদের ককপিটে প্রবেশের আগে চেকিং হয়। যাত্রীদের তো চেকিং হয়েই থাকে। তাছাড়া ককপিটে দুম করে কেউ ঢুকেও পড়তে পারে না। তাহলে হামলাকারী কো পাইলট অস্ত্র পেলেন কোথা থেকে? ইজরায়েলের দাবি,‌দুবাই বিমানবন্দরেই কেউ ধারালো অস্ত্র আগে থেকে ককপিটে লুকিয়ে রেখে দিয়েছিল।‌ ককপিটের কোথায় সেই অস্ত্র রাখা আছে তা আগে থেকেই জানত হামলাকারী‌ কো‌ পাইলট।‌ বিমান যখন‌ ৩৪০০০ ফুট উচ্চতায় তখন প্ল্যান মাফিক পাইলটের ওপর হামলা চালায় কো পাইলট।তার উদ্দেশ্য ছিল পাইলটকে মেরে বিমান ছিনতাই অথবা ওই বিমান ধ্বংস করে দেওয়া।‌ শেষ পর্যন্ত অবশ্য যাত্রীদের তৎপরতায় বিমান নামে সৌদির তাবুক বিমানবন্দরে। তবে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি বা সৌদি আরব অথবা আমেরিকা এখন-ই এই ঘটনাকে সন্ত্রাসবাদী হামলা বলতে নারাজ। তিন দেশ-ই বলছে তারা তদন্ত করে দেখছে। পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে ভারত। ইতিমধ্যে তাবুকের যে হাসপাতালে আক্রান্ত পাইলট রয়েছেন সেখানে গিয়ে তাঁর পরিবারের সঙ্গে দেখা করে এসেছেন বিদেশ মন্ত্রকের অফিসাররা।‌ যে কোনো সাহায্যে পাশে থাকার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
ইজরায়েল-সৌদি শীতলতা
এদিকে ফ্লাইদুবাই-এর ঘটনায় নতুন করে উত্তাপ ছড়াচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে। ইজরায়েল ইতিমধ্যেই দাবি করেছে বিমানে থাকা ইজরায়েলি নাগরিকদের খুনের ছক ছিল।‌ যা আবার মানছে না সৌদি বা সংযুক্ত আরব আমিরশাহী। ইজরায়েলের দাবি গোটা ঘটনার পেছনে ইরানের হাত রয়েছে। তারাও এই দাবি মানেনি। ইজরায়েল এর মধ্যেই দাবি করছে, সৌদিতে ফ্লাইদুবাইয়ের বিমানের অবতরণের পর তারা সামরিক বিমান পাঠাতে চেয়েছিল বিমানে থাকা ইজরায়েলিদের উদ্ধার করতে।‌ যদিও তাতে আপত্তি জানায় সৌদি আরব। তারা জানায়, এই সংক্রান্ত কোনো চুক্তি না থাকায় তারা ইজরায়েলের সামরিক বিমানকে নামার অনুমতি দেবে না।‌ এই নিয়ে দুই দেশের মধ্যে শৈত্য শুরু হয়েছে। ফলে বিমানের ককপিটে কো পাইলটের হাতে পাইলটের ছুরিকাহত হওয়ার ঘটনা আর শুধু হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না ক্রমশ তা আন্তর্জাতিক ইস্যু হিসাবে সামনে আসছে। জঙ্গি যোগ থাকুক বা না থাকুক এই ঘটনা নিয়ে মধ্য প্রাচ্যে নতুন করে অশান্তির মেঘ ঘনাতে পারে এমন আশঙ্কা ওড়ানো যাচ্ছে না।

Scroll to Top