৩৬৫ দিন।বাংলা ছবিতে গোয়েন্দা চরিত্রের অভাব কোনওদিনই ছিল না। কিন্তু শার্লক হোমসের ভাবনাকে সঙ্গে নিয়ে সেই গোয়েন্দা-জগতের গল্প যদি এসে মিশে যায় আজকের কলকাতার বাস্তবতায়? এই সহজ অথচ আকর্ষণীয় প্রশ্ন থেকেই জন্ম নিয়েছে পরিচালক অরিন্দম শীলের নতুন ছবি কলকাতায় শার্লক।বাংলা চলচ্চিত্র জগতের ‘থ্রিলার অ্যান্ড অ্যাকশন কিং’ হিসেবে পরিচিত অরিন্দম শীল এবার শার্লক হোমসকে সরাসরি পর্দায় আনছেন না। বরং শার্লকের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, যুক্তিবোধ ও রহস্যভেদের ভাবনাকে নিয়ে তৈরি করেছেন এক সম্পূর্ণ নতুন চরিত্র—জ্যোতিষ্ক।
ছবির চরিত্ররা
ছবির মুখ্য চরিত্র জ্যোতিষ্কের ভূমিকায় রয়েছেন বিক্রম চট্টোপাধ্যায়। তাঁর সহযোগী শরণজিতের চরিত্রে দেখা যাবে বনি সেনগুপ্তকে। ফলে ছবিতে তৈরি হচ্ছে এক নতুন ‘শার্লক-ওয়াটসন’ সমীকরণ। তবে এই দুই চরিত্র কনান ডয়েলের সৃষ্ট চরিত্রের সরাসরি প্রতিরূপ নয়। বরং শার্লক হোমসের মিথ ও ভাবনাকে আজকের কলকাতার সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক পরিসরে নতুন করে ব্যাখ্যা করেছেন পরিচালক।জ্যোতিষ্ক একজন সমকালীন বাঙালি যুবক। শার্লক হোমসের প্রতি তার অদ্ভুত আকর্ষণ রয়েছে। চারপাশের মানুষ যে বিষয়গুলো সহজে দেখতে পায় না, সেগুলো তার তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতায় ধরা পড়ে। আপাতদৃষ্টিতে সম্পর্কহীন ঘটনা ও তথ্যের মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে বের করার ক্ষমতাই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। তার সঙ্গে ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ে শরণজিৎ। কখনও নিজের ইচ্ছায়, কখনও আবার প্রায় অজান্তেই সে হয়ে ওঠে জ্যোতিষ্কের সঙ্গী।
শার্লকের ছায়ায় সম্পূর্ণ নতুন জ্যোতিষ্ক
তবে গল্পটি শুধুই গোয়েন্দা রহস্যের মধ্যে আটকে থাকছে না। একটি অপরাধের অনুসন্ধান করতে গিয়ে গল্প খুলে দেয় আরও বড় এক জগৎ। রয়েছে এক রহস্য, রয়েছে এক ভিজিলান্তে এবং রয়েছে ন্যায় ও সত্যের প্রশ্ন। যে ব্যবস্থা মানুষের ন্যায় পাওয়ার কথা, সেই ব্যবস্থাই যখন ব্যর্থ হয়ে পড়ে, তখন একজন মানুষ কী সিদ্ধান্ত নিতে পারে-সেই প্রশ্নও গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
পরিচালকের বক্তব্য
পরিচালকের বক্তব্য অনুযায়ী, কলকাতায় শার্লক এর গল্প এগোবে আজকের কলকাতা এবং শার্লক হোমসের মিথের সঙ্গে যুক্ত অন্য এক সময় ও পরিসরের মধ্যে। চিত্রনাট্যে ইচ্ছাকৃতভাবেই তৈরি করা হয়েছে দুই জগতের মধ্যে সাদৃশ্য ও প্রতিধ্বনি। ফলে অতীত এবং বর্তমান একে অপরকে আলোকিত করবে। শার্লক হোমসের পরিচিত আবহের সঙ্গে সমকালীন কলকাতার অপরাধ, সমাজ ও মানুষের মনস্তত্ত্ব মিলিয়ে তৈরি হবে ছবির রহস্যের জাল।এই ছবির ক্ষেত্রে বিশেষ আকর্ষণ হতে পারে কলকাতার নিজস্ব আবহ। কারণ গোয়েন্দা গল্পের সঙ্গে শহরের অলিগলি, ব্যস্ততা, মানুষের ভিড়, পুরনো স্থাপত্য কিংবা শহুরে জীবনের নানা স্তর একেবারে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে যেতে পারে। অরিন্দম শীলের ছবিতে অ্যাকশন ও থ্রিলের পাশাপাশি চরিত্রের মনস্তত্ত্বও যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কলকাতায় শার্লক এর ভাবনাতেও তার ইঙ্গিত রয়েছে। ফলে শুধু খুন, অপরাধ বা সূত্রের সমাধান নয়, মানুষের সিদ্ধান্ত, নৈতিকতা এবং সত্যের সংজ্ঞাও গল্পের আলোচনায় আসতে পারে।
রহস্যের কেন্দ্রে পরিচয়
তবে ছবির আসল রহস্য নিয়ে এখনই মুখ খুলতে নারাজ অরিন্দম শীল। তাঁর মতে, এই ছবির সবচেয়ে বড় রহস্য শুধু কে কী করল, তা নয়। রহস্যের কেন্দ্রে রয়েছে পরিচয়কে শার্লক, কে ওয়াটসন এবং ঠিক কোথায় গিয়ে কল্পনা ও বাস্তবের সীমারেখা মুছে যায়। সেই উত্তর দর্শকদের নিজেদের মতো করে খুঁজে নেওয়ার সুযোগই দিতে চান পরিচালক।ছবিতে বিক্রম ও বনির পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রয়েছেন অর্পণ ঘোষ, অনুরাধা চট্টোপাধ্যায়, সোহাগ সেন, অর্জুন চক্রবর্তী, অর্ণ মুখোপাধ্যায়, শুভ্রজিৎ দত্ত এবং অম্বরীশ ভট্টাচার্য। বিক্রমের চরিত্রের সহযোগী হিসেবে বনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। ছবিতে উষসী রায়কেও দেখা যাবে। অর্থাৎ মূল রহস্যের পাশাপাশি একাধিক চরিত্রের উপস্থিতি গল্পকে আরও জটিল করে তুলবে বলেই ইঙ্গিত।এই ছবির চিত্রনাট্য লিখেছেন শুভাশিস গুহ। প্রযোজনার দায়িত্বে রয়েছে ক্যামেলিয়া প্রোডাকশন্স। অক্টোবর মাস থেকেই ছবির শুটিং শুরু হওয়ার কথা। কলকাতা এবং তার পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন অঞ্চলে হবে শুটিং। ফলে শহর কলকাতা শুধু ছবির পটভূমি নয়, গল্পের আবহ এবং রহস্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে চলেছে।
অতীতের মিথ, বর্তমানের কলকাতা
অরিন্দম শীলের ভাবনায় তাই ‘কলকাতায় শার্লক’ নিছক আর একটি গোয়েন্দা ছবি নয়। শার্লক হোমসের বিশ্বজনীন চরিত্রকে বাংলার মাটিতে দাঁড় করিয়ে সমকালীন কলকাতার গল্প বলার চেষ্টা এই ছবির অন্যতম আকর্ষণ। বিশেষ করে জ্যোতিষ্কের চরিত্রের মধ্যে শার্লকের প্রতি আকর্ষণ এবং নিজের মতো করে সেই চরিত্রকে কল্পনা করার প্রবণতা গল্পে একটি মেটা-ন্যারেটিভের আবহ তৈরি করতে পারে। দর্শকও হয়তো বারবার ভাববেন-যা দেখছেন, তা সত্যিই ঘটছে, নাকি তার মধ্যে কোনও কল্পনার স্তর লুকিয়ে রয়েছে?আর সেখানেই ছবিটির নামের তাৎপর্য আরও গভীর হয়ে ওঠে। কারণ এটি কলকাতায় শার্লককে নিয়ে একটি গল্প, কিন্তু একই সঙ্গে কলকাতার চোখ দিয়ে শার্লককে নতুন করে দেখারও গল্প। পুরনো গোয়েন্দা-মিথকে নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন ভাষায় পৌঁছে দেওয়ার এই প্রচেষ্টাই ছবিটিকে আলাদা করে তুলতে পারে।
শার্লক হোমস সারা পৃথিবীর কিন্তু অরিন্দম শীলের ভাবনায়, শার্লক হয়তো কলকাতারও হতে পারে। সেই ভাবনাই এবার বড় পর্দায় কতটা নতুন রহস্য, উত্তেজনা এবং চমক তৈরি করে, তার অপেক্ষায় দর্শক।





