৩৬৫ দিন। কর্ণাটকের মহীশূর জেলা থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে এবং কুর্গ (মাদিকেরি)-এর ঠিক প্রবেশদ্বারে বাইলাকুপ্পে অঞ্চলে অবস্থিত নামড্রোলিং মনাস্ট্রি, যা বিশ্বজুড়ে ‘গোল্ডেন টেম্পল’ নামেও অত্যন্ত পরিচিত। এটি ভারতের বৃহত্তম তিব্বতি বৌদ্ধ বিহারগুলির মধ্যে অন্যতম এবং তিব্বতের বাইরে নিংমা সম্প্রদায়ের প্রধান কেন্দ্র। দক্ষিণ ভারতের উষ্ণ ও সবুজ প্রকৃতির মাঝে তিব্বতি সংস্কৃতির এই অপূর্ব নিদর্শন দেশি-বিদেশী পর্যটকদের মনে এক অদ্ভুত শান্তির পরশ বুলিয়ে দেয়। ১৯৬৩ সালে পরম পবিত্র কুঞ্জুর পেমা নোরবু রিনপোচে (ড্রাবওয়াং পদ্মা নোরবু রিনপোচে)-র দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এই মঠটি শুরুর দিনে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে নির্মিত হলেও, সময়ের সাথে সাথে এটি আজকের এই বিশাল ও নান্দনিক রূপ ধারণ করেছে। এই মনাস্ট্রির মূল আকর্ষণ হলো এর প্রধান প্রার্থনা হল বা মন্দির, যা তার স্থাপত্যশৈলী এবং রাজকীয় সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করলেই দর্শনার্থীদের চোখ জুড়িয়ে যায় প্রায় ৪০ ফুট উচ্চতার তিনটি সুদৃশ্য সোনার প্রলেপযুক্ত বুদ্ধ মূর্তির দিকে। মাঝখানে রয়েছে শাক্যমুনি বুদ্ধের বিশাল মূর্তি, এবং তার দুই পাশে রয়েছে অমিতায়ু বা বুদ্ধ পদ্মসম্ভব ও অমিতাস বুদ্ধের মূর্তি। এই মূর্তিগুলির সোনালী আভা এবং মন্দিরের দেয়ালের গায়ে তিব্বতি পুরাণ ও বৌদ্ধ ইতিহাসের চিত্রকর্ম ও থাংকা পেইন্টিং এক মায়াবী পরিবেশের সৃষ্টি করে। পর্যটকদের কাছে এই স্থানটি কেবল একটি ধর্মীয় তীর্থক্ষেত্র নয়, বরং এটি দক্ষিণ ভারতের অন্যতম আকর্ষণীয় এবং জনপ্রিয় অবকাশ যাপন কেন্দ্র হিসেবেও বিকশিত হয়েছে। এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক ও আধ্যাত্মিক সাধক ভিড় করেন। সকালের দিকে এখানে গেলে সন্ন্যাসীদের সমবেত প্রার্থনা এবং পবিত্র মন্ত্রোচ্চারণের শব্দ মনকে এক অন্য মাত্রার প্রশান্তি দেয়। মন্দিরের প্রাঙ্গণে বিশাল প্রদীপ, বাতাসে ওড়া তিব্বতি প্রার্থনার পতাকা (প্রেয়ার ফ্ল্যাগস) এবং ধূপের সুবাস এক সুদূর হিমালয়ের তিব্বতি উপত্যকার আমেজ তৈরি করে।![]()
একটি আদর্শ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে নামড্রোলিং মনাস্ট্রির আকর্ষণ বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে এর আশেপাশের পরিবেশ এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য। পর্যটকরা এখানে এসে তিব্বতি জীবনযাত্রার খুব কাছাকাছি আসার সুযোগ পান। মনাস্ট্রির চত্বরেই রয়েছে একটি চমৎকার বাজার বা শপিং জোন, যেখান থেকে দর্শনার্থীরা খাঁটি তিব্বতি হস্তশিল্প, হস্তনির্মিত গহনা, রঙিন কার্পেট, শো-পিস এবং বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী সুগন্ধি কিনতে পারেন। এছাড়া এখানকার স্থানীয় তিব্বতি রেস্তোরাঁগুলিতে আসল তিব্বতি খাবারের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে, যার মধ্যে ‘থুকপা’ এবং ‘মোমো’ অত্যন্ত জনপ্রিয়।
যাতায়াতের দিক থেকেও এই জায়গাটি অত্যন্ত সুবিধাজনক। মহীশূর বা ব্যাঙ্গালোর থেকে সড়কপথে খুব সহজেই বাইলাকুপ্পে পৌঁছানো যায়। কুর্গ বা ওটি ভ্রমণের সময় পর্যটকরা সাধারণত এই মনাস্ট্রিতে এক বা দু’ঘণ্টার জন্য বিরতি নেন, যা তাদের পুরো ট্যুরের অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে। মনাস্ট্রির সুশৃঙ্খল পরিবেশ, পরিচ্ছন্ন চত্বর এবং সবুজ বাগানের উপস্থিতি ভ্রমণপিপাসুদের ক্লান্তি দূর করতে দারুণ সাহায্য করে। ফোটোগ্রাফি প্রেমীদের জন্য এটি একটি স্বর্গরাজ্য, কারণ এখানকার উজ্জ্বল সোনালী স্থাপত্য, লাল চীবর পরিহিত বৌদ্ধ ভিক্ষুদের আসা-যাওয়া এবং চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দী করার মতো এক অপূর্ব দৃশ্যপট তৈরি করে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, কর্ণাটকের নামড্রোলিং মনাস্ট্রি বা গোল্ডেন টেম্পল কেবল একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়, এটি আধুনিক ধাবমান জীবনের মাঝে মানসিক শান্তি ও তিব্বতি সংস্কৃতির এক অপূর্ব মিলনমেলা। যারা ইতিহাস, স্থাপত্য, আধ্যাত্মিকতা এবং শান্ত প্রকৃতির টানে ঘুরতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য এটি দক্ষিণ ভারত ভ্রমণের এক অন্যতম সেরা এবং অবশ্য দর্শনীয় গন্তব্য।
দক্ষিণ ভারতে বসেই পাবেন তিব্বতের স্বাদ! জানুন কর্ণাটকের বিখ্যাত ‘গোল্ডেন টেম্পল’ সম্পর্কে




