বিহারের জামুইয়ে টিউশন ফেরৎ বালিকা ও তার পুরুষ সঙ্গীকে হেনস্থা শ্লীলতাহানির ঘটনায় মূল অভিযুক্তকে নন্দন যাদবকে এনকাউন্টার করল পুলিশ

 

গুলি লেগেছে নন্দনের পায়ে, আত্মরক্ষার্থে পুলিশ গুলি চালায় বলে দাবি

৩৬৫ দিন। বিহারের জামুইয়ে টিউশন ফেরৎ বালিকা ও তার পুরুষ সঙ্গীকে হেনস্থা শ্লীলতাহানির ঘটনায় মূল অভিযুক্তকে নন্দন যাদবকে এনকাউন্টার করল পুলিশ। সূত্রের খবর, গুলি লাগলেও প্রাণে বেঁচে গিয়েছে সে। গুলি লাগে তার পায়ে। পুলিশের দাবি, নন্দন কে ধরতে বিহারের বেশ‌ কিছু জায়গায় তল্লাশি চলছিল। সেই সূত্রেই তার খোঁজ পেয়ে অপারেশন চালায় পুলিশ। তার গোপন ডেরায় হানা দিতেই পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় সে।‌পাল্টা গুলিতে জখম হয় সে। গুলি লাগে তার পায়ে। তবে কখন কোথায় এই ঘটনা ঘটে তা পুলিশের তরফে জানানো হয়নি। তবে পুলিশ এটা স্পষ্ট‌ করেছে নন্দন যাদব-ই রবিবারের ঘটনার মাস্টার মাইন্ড। ভিডিওতে যাকে বালিকার হাত ধরে টানাটানি করতে দেখা যায় তার শরীরের নানা জায়গায় অশালীন স্পর্ষ করতে দেখা যায় সে হল নন্দন। বাকি ৬ জন তার কথাথেই বালিকা ও তার বয়ফ্রেন্ডকে হেনস্থা করে। পুলিশ সূত্রে দাবি, জামুই কান্ডে যে ৩ জনকে আগে ধরা হয়েছিল তাদের জেরা করেই নন্দনের নাম পাওয়া যায়। তারপরেই তাকে ধরতে অভিযান শুরু হয়। যদিও বিরোধীরা বলছে, ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর পুলিশ অভিযুক্তদের গুলি করবে এটা তো কোনো সমাধান হতে পারে না। ঘটনা ঘটার আগে তো পুলিশ প্রশাসনকে সতর্ক হতে হবে। তাছাড়া ঘটনা ঘটিয়েছে ৭ জন বাকি ৩ জন তো এখনো অধরা। তারা ধরা পড়বে কবে?
এনকাউন্টার সমাধান নয়
একটা অপরাধ হবে, সেই নিয়ে হৈচৈ হতেই কয়েকজনকে অভিযুক্ত বলে দাবী করে তাদের পুলিশ লাগিয়ে গুলি করে খতম করে দাও! সোজা কথায় এনকাউন্টার- গত এক দশক ধরে গো বলয়ের রাজ্য গুলোতে বিশেষ করে যোগী রাজ্য উত্তরপ্রদেশে প্রতি বছর গড়ে শতাধিক এনকাউন্টার হয়েছে কিন্তু প্রশ্ন হল তার পরেও পরিস্থিতিতে বদল এসেছে কী? এখনো তো অপরাধে বিশেষত মহিলাদের ওপর অপরাধে উত্তরপ্রদেশ প্রথম সারিতে। তাহলে এনকাউন্টার করে লাভটা কী? বিরোধী রাজনৈতিক দল গুলো বলছে এনকাউন্টার এখন আদতে একটা রাজনৈতিক কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপরাধ আটকাতে না পারলে এনকাউন্টার করে লাশ‌ ফেলে দিয়ে আসল সমস্যা থেকে নজর ঘুরিয়ে দাও। ধর্ষণ বা অপরাধ কেন হল পুলিশ সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে তখন আর আলোচনা হবে না। সবাই তখন এনকাউন্টার নিয়ে কথা বলবে অর্থাৎ ধামাচাপা দেওয়ার একটা কৌশল তবে এই এনকাউন্টার মডেল খুব দ্রুত ভেঙে পড়বে।
নেপথ্যে লভ জিহাদ!
বিভিন্ন খবরে প্রকাশ জামুইয়ে নাবালিকার যে পুরুষ সঙ্গী ছিল সে মুসলিম। হিন্দু মেয়ে হয়ে কেন মুসলিম ছেলের সঙ্গে প্রেম করবে ঘুরে বেড়াবে! সেটাই চক্ষুশূল হয়ে ওঠে নন্দন ও তার দলবলের। নন্দনের সমাজমাধ্যমে যে সব ছবি রয়েছে এবং তার পোস্ট দেখেই বোঝা যায় সে কোনও উগ্র হিন্দুত্ব বাদী সংগঠনের দাপুটে নেতা।‌ প্রশ্ন হল, লাভ জিহাদের কথা তো বিজেপির অনেক নেতা প্রকাশ্যে বলে থাকেন তাই এর বশবর্তী হয়ে একজন উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের কর্মী যে এত বড় কান্ড ঘটালো তার দায় তো ওই নেতাদের নিতে হবে,বলছে বিরোধীরা। বিস্ময়কর বিষয় হল, লভ জিহাদের জিগিড় তুলে অত্যাচার বা হেনস্থা তো নতুন নয় এর সমাধান তো এনকাউন্টার করে হবে না। বিরোধীরা বলছে জামুইয়ের ঘটনাকে বিহারের মন্ত্রীরাই তো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলছে। এর থেকেই সরকারের দৃষ্টিভঙ্গী বোঝা যায়।
সাত দুষ্কৃতীর সঙ্গে একা লড়াই
বাঘের বাচ্চার মত লড়াই করেছ – জামুইয়ে নিগৃহিত বালিকার বয়ফ্রেন্ড এখন গোটা দেশের যুব সমাজের কাছে হিরো। রোগা পাতলা চেহারা, সবে গোঁফের রেখা উঠেছে, মুখ দেখেই বোঝা যায় নিষ্পাপ সরল টিন এজ সেই তরুনের লড়াইকে কুর্নিস করছে গোটা দেশ। ভালোবাসার মানুষকে কি ভাবে আগলাতে হয় রক্ষা করতে হয় তা শিখিয়ে দিল সে। পুলিশ সূত্রে এবং অন্য নানা সূত্রে যে সব ভিডিও সামনে এসেছে জামুইয়ের ঘটনার তাতে নির্যাতিতার পুরুষ বন্ধুর লড়াইকে সাবাশি দিতেই হবে। সাত জন মিলে গার্ল ফ্রেন্ডকে যখন টেনে নিয়ে যাচ্ছে তখন সর্বস্ব দিয়ে লড়াই করে ওই ছেলেটি। সে জানতো সাত জনের সঙ্গে একা লড়াই করা সম্ভব নয় তাও মরণপন লড়াই চালায় সে। নিজে মার খেয়েও রক্ষা করে বান্ধবীকে। সে জানতো ওই সাতজন তাকে মেরে ফেলতেও এক মুহূর্ত ভাববে না তবু অসম লড়াই চালিয়ে যায় সে। স্থানীয় যারা দূর থেকে এই ঘটনা দেখেছে তারা বলছেন ছেলেটির অদম্য সাহসের জোরেই রক্ষা পায় মেয়েটি। বান্ধবীকে সে প্রাণ ভয়ে পালাতেই পারত। সেই সুযোগ তার কাছে ছিল তবু সে পালায়নি। লড়ে গেছে। এই লড়াইকে কুর্নিস করতেই হবে। কুর্নিস করছে গোটা দেশ।
ঘটনাটি কী?
পুলিশ সূত্রে জানা যাচ্ছে রবিবার বালিকা ও তার এক বন্ধু কোচিং ক্লাস সেরে জামুইয়ের পাহাড়ি এলাকায় বেড়াতে যায়। অভিযোগ, মাঝ পথে তাদের স্কুটি আটকে দেয় ৭ টি ছেলে। তারা ওই বালিকা ও তার পুরুষ সঙ্গীর নাম পরিচয় বয়স জানতে চায়। ১ মিনিটের কিছু বেশী সময়ের যে ভিডিও সামনে আসে তাতে দেখা যায় এই জিজ্ঞাসাবাদ চলতে চলতে আচমকা ওই বালিকার বন্ধুর কলার চেপে ধরে তাকে মারতে যাচ্ছে কয়েকজন‌। ওই বালিকাকেও হাত ধরে কোথাও নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হচ্ছে তার শরীরের নানা জায়গায় অশালীন স্পর্ষ করা‌ হচ্ছে। এরপর ৩০ সেকেন্ডের আর একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে ওই সাতটি ছেলের মধ্যে দু তিনজন আবার ওই বালিকা ও তার বয়ফ্রেন্ডকে সেখান থেকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছে। সূত্রের খবর, জামুইয়ের রাস্তায় ওই বালিকা ও তার বয়ফ্রেন্ডকে যারা হেনস্থা করে তাদের প্রশ্ন ছিল মূলত দুটি-১. কেন তারা ছাত্র হয়ে প্রেম করছে ও তাদের জাত ধর্ম কি? আর ২.রাতে তারা কেন জামুইয়ের রাস্তায় ঘোরাঘুরি করছে? এই নিয়ে তাদের সঙ্গে ওই যুগলের কথা কাটাকাটি হতেই তারা রুদ্রমূর্তি ধরে এবং তাদের মারধর শ্লীলতাহানি করে। জামুইয়ের পুলিশ সুপার বিশ্বজিৎ দয়াল জানান, দু’দিন আগে ঘটনাটি ঘটলেও রবিবার পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনও থানায় অভিযোগ দায়ের হয়নি। ভিডিয়োয় যে স্কুটারটি দেখা যাচ্ছে, সেটির নম্বর প্লেট দেখে সোমবার কিশোর-কিশোরীর সন্ধান পায় পুলিশ। ঘটনার সংবেদনশীলতা বিবেচনা করে এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করেননি পুলিশ সুপার। পরে জানা যায় এই ঘটনার ভিডিও ফুটেজ দেখে ৪ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।চাঞ্চল্যকর এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই একযোগে বিজেপিকে আক্রমণ করেন মমতা এবং রাহুল। আম আদমি পার্টিও বিহারের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘বেচি বাঁচাও’ স্লোগানের কথা উল্লেখ করে তাদের অভিযোগ, “বিজেপি-শাসিত বিহারে মেয়েদের সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে।”

Scroll to Top