ইমরানের কামব্যাক, কেরিয়ারের সেরা
সিক্যুয়াল না হয়ে মৌলিক হলেও ক্ষতি ছিল না

৩৬৫ দিন। পল্লব ঘোষ। ১৯ বছর পর ফিরে এলো আওয়ারাপন। আরো বেশি চিত্তাকর্ষক ও মনোমুগ্ধকরভাবে। আবেগ, বিষাদ, মমতা, স্নেহ, সংকল্প, অ্যাকশনের মিশ্রণ নিয়ে। খাঁচা বন্দী পাখিকে মুক্ত করা মানে, মনুষ্যত্বকে মুক্ত করা।  আওয়ারাপনে শ্রিয়া সরণের এই সংলাপই ছিলো ছবির ক্যাচলাইন। আওরাপন টু তে পরিচালক নীতিন কক্কর , সেটাকে উপজীব্য করেই এগিয়েছেন।
আওয়ারাপন এর প্রথম ভাগ এর গল্পের বিষয় ছিলো নারী পাচার। দ্বিতীয় ভাগ এর গল্পের বিষয় শিশু পাচার। পাচার হয়ে যাওয়া সেই শিশুদের মুক্ত করার দায়িত্ব শিবম পণ্ডিতের (ইমরান হাসমি)।
প্রথমভাগে ছবির প্রথমার্ধেই মৃত্যু হয়েছিলো ছবির মুখ্য নারী চরিত্র ও শিবমের ভালোবাসা আলিয়া হামিদের। ছবির বাকি সময়ে আলিয়া ছিলেন না ঠিকই, কিন্তু গল্প এগিয়েছে তার ভাবনাকে কেন্দ্র করেই।
দ্বিতীয় ভাগ শুরু হচ্ছে আলিয়ার জন্মদিনে আলিয়ার কবরের সামনে শিবমের এক সদ্যজাত কন্যা শিশুর আবিষ্কার করার মধ্য দিয়ে। তার ভালোবাসার জন্মদিনে পাওয়া সেই মেয়েটির নাম শিবম রাখেন আলিয়া। মেয়েটি স্থানীয় একটি অনাথ আশ্রমে বেড়ে ওঠে। তার সাথে শিবমের সখ্যতা সবচেয়ে নিবিড়। একদিন এক যুগল সেই মেয়েটিকে দত্তক নিতে অনাথ আশ্রমে আসে। মেয়েটি যেতে না চাইলেও , মেয়েটির ভবিষ্যত ও সে একটি পরিবার পাবে এই ভেবে তাকে নতুন বাবা মায়ের সঙ্গেই যাওয়ার পরামর্শ দেয় শিবম। মেয়েটি অনাথ আশ্রমে সবাইকে বিদায় জানিয়ে চলে যায়। এরপরই গল্পের মোড় নেয় যখন ইন্টারপোলের এক পুলিশ আধিকারিকের ( অতুল কুমার ) এর কাছ থেকে শিবম জানতে পারে, তার আলিয়া ব্যাঙ্ককে পাচার হয়ে গেছে। পাচার করার পর পুলিশি এনকাউন্টারে পাচারের সঙ্গে জড়িত যুগলের মৃত্যু হয়েছে। সমরজিৎ সিং নামে ঐ ইন্টারপোলের পুলিশ অফিসার তাকে আলিয়ার সঙ্গে পাচার হয়ে যাওয়া বাকি মেয়েদের উদ্ধার করার দায়িত্ব দেন ও এর জন্য ব্যাঙ্ককে গিয়ে এই কাজে জড়িত গ্যাং এর সঙ্গে সামিল হওয়ার পরামর্শ দেন শিবমকে। শিবম ব্যাঙ্ককে গিয়ে কিভাবে তার হারিয়ে যাওয়া আলিয়া ও বাকিদের উদ্ধার করবে সেটা নিয়ে ছবির মূল গল্প। ছবিতে কোকেন এর ব্যবসা নিয়ে দুই গ্যাং এর লড়াই দেখানো হয়েছে। যারা ব্যবসার জন্য মানুষ খুন করতেও পিছপা হয় না। এক গ্যাং এর নেতৃত্বে রয়েছেন অমিত সিং ( বরুন চন্দ)  ও অপর গ্যাংয়ের নেতৃত্বে রয়েছেন নাফিসা নাওয়াজ (শাবানা আজমি )। অমিত সিংকে খুন করে ব্যবসার উত্তরাধিকার পায় ছবির মুখ্য খলনায়ক জোরাওয়ার সিং ( পুরান গাব্বি )। তিনিই কোকেন ছেড়ে শিশু পাচারকেই তার মূল ব্যবসা করে তোলেন।
একটি বলিউড কমার্শিয়াল ছবিতে যেরকম পরিমাণ মশলা থাকা দরকার, তার প্রায় পুরোটাই এই ছবি থেকে দর্শক পাবে। সিনেমার শুরুতেই  মুস্তাফা জাহিদের তোহ ফির আও ও ঠিক তার পরই অরিজিৎ সিং এর আওয়ারাপন টাইটেল সং সিনেমার মেজাজ স্থির করে দেয় । ছবির প্রথম আধ ঘন্টা দর্শকদের আবেগাপ্লুত করবে। শিবম ও তার খুঁজে পাওয়া নতুন আলিয়ার দুইজনের একে অপরের প্রতি সম্পর্কের রসায়ন ভীষণভাবে উপভোগ্য। নতুন করে পাওয়া আলিয়ার মাঝে তার হারিয়ে যাওয়া আলিয়াকে খুঁজে পায় শিবম। তাই নতুন আলিয়ার গলায় , হারিয়ে যাওয়া আলিয়ার তাবিজ। এই আলিয়ার জন্য সব কিছু করতে পারে শিবম। ব্যাঙ্ককে সেই আলিয়াকে খুঁজে পেতে নিজের সবরকম কষ্ট ও যন্ত্রণা সহ্য করতে রাজি সে। ইমরান হাসমি কেরিয়ারের সেরা পারফরম্যান্স দিয়েছেন। শিশু আলিয়ার প্রতি তার পিতৃসম স্নেহ, আলিয়াকে উদ্ধার করতে তার দৃঢ়তা, নায়কোচিত অ্যাকশন, চোখের চাহনি , অভিব্যক্তি মন জয় করে নেওয়ার মত। মুখ্য খলনায়কের ভূমিকায় পুরান গাব্বি দাগ কেটেছেন। যে নিজের ব্যবসায় শ্রীবৃদ্ধির জন্য নিজের বাবাকে খুন করতেও পিছপা হয় না, অন্যদিকে, নিজের অটিজমে আক্রান্ত দাদা সিকন্দর সিং ( অনিরুদ্ধ রাওয়াল ) ও বোন জারা সিং ( দিশা পাটানি ) কে রক্ষা করতে চায়। ছবিতে দিশা পাটানির তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেই। ইমরান হাসমির সঙ্গে তার প্রেমের উপর পরিচালক বেশি নজর দিতে চান নি। অটিজম আক্রান্ত দাদার ভূমিকায় অনিরুদ্ধ নজরে আসবেন। তবে জোরাওয়ারের বিপক্ষ গ্যাং এর নেত্রী হিসেবে নাফিসা নাওয়াজ এর ভূমিকায় শাবানা আজমি দারুণ ভাবে নজর কেড়েছেন। সারাক্ষণ ছটফটে জোরাওয়ার এর বিপরীতে শান্ত অথচ ক্ষুরধার মস্তিষ্কের নাফিসার প্রসন্নচিত্তে বলা সংলাপ , ভয় দেখানো, লাঠি ভর দিয়ে হাটা চলায় শাবানা যথাযথভাবে তার চরিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। ছোট্ট আলিয়ার ভূমিকায় মিষ্টি লেগেছে মিরা শিবানকে।
মোহিত সুরির শৈলী থেকে আলাদাভাবে ছবিটি নির্মাণ করেছেন নীতিন কক্কর। এই ছবির আকর্ষণ ছবির চিত্রনাট্য যা একাধিক মোচরে ভরা। পরতে পরতে রয়েছে টানটান উত্তেজনা। কে কোন গ্যাং এর হয়ে কাজ করছে, কে কার ক্ষতি করে নিজের স্বার্থসিদ্ধি করতে চাইছে, কৌতূহলী করে রাখবে দর্শককে। ছবির আরেকটি শক্তিশালী জায়গা ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ও ছবির গান। তোহ ফির আও এর আলাপ বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে বারবার ব্যাকগ্রাউন্ডে বেজে ওঠে  আলাদাই পরিবেশ তৈরি করে। ইমোশনাল দৃশ্য ও মারপিটের দৃশ্যে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের ব্যবহার সত্যিই প্রশংসনীয়।
ছবির প্রতিটি গান যথাযথ ভাবেই চিত্রনাট্যে ব্যবহার করা হয়েছে। সবকটি গানই শ্রুতি মধুর। মিঠুনের সুরে ভে জুনুন গানটি আবেগঘন পরিবেশ তৈরি করে, শ্রেয়া ঘোষাল ও অরিজিৎ সিং এর গলায় তুমহারে লিয়ে গানটি রোমান্টিক। টাইটেল সং ছাড়া বাকি দুটি গান প্রথমভাগের, সেগুলিকে নতুন ভাবে নির্মাণ করা হয়েছে, তার জন্য সঙ্গীত পরিচালকরা প্রশংসার দাবি রাখে। বিষ্ণু রাও এর ক্যামেরার কাজও ভালো। লং শটে গ্রামকে , ব্যাংকক শহরকে তুলে ধরা, মারপিটের দৃশ্যয় ক্যামেরার কাজ যথাযথ। অ্যাকশন দৃশ্য পুরোপুরি বলিউডি স্টাইলে।
নীতিন কক্করের এই সিনেমা দর্শককে ২ ঘন্টা ২০ মিনিট নিজের আসনে বসিয়ে রাখবে। একবারের জন্যও একঘেয়েমি আসতে দেবে না। ছবির গতি একবারের জন্যেও মন্থর হয়নি।
ইতিমধ্যেই এই ছবি তার কেরিয়ারের সবচেয়ে বড় হিট ছবি হয়ে গেছে। ছবির আয় ২০০ কোটি অতিক্রম করা শুধু সময়ের অপেক্ষা।তবে ছবিটির অল্প কিছু খুঁতও রয়েছে। পেটে, বুকে ছয়টি গুলি লেগেও কেউ বেঁচে ফিরতে পারে। সেটা ভাবনার অতীত। তাই পরিচালক প্রথম ভাগের শেষ দৃশ্যের প্রসঙ্গ নাও তুলতে পারতেন। ছবি বাস্তবের গল্প নয়। ফলে আগেরটির সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে না হয়ে এটা স্বাধীন গল্প হিসেবেও ভাবা যেতো। খালি গায়ে লড়াইয়ের দৃশ্য না থাকলে চিত্রনাট্যে কোনো ক্ষতি হতো বলে মনে হয় না। শেষে মারপিটের দৃশ্য আরো একটু সুপরিকল্পিত ও বৈচিত্র্যময় হতে পারতো। শিশু হত্যার দৃশ্য দুর্বল হৃদয়ে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে ১৯ বছর আগের সিনেমার থেকে নির্মাণের দিক থেকে এই ছবি এগিয়ে থাকবে। ছবির শেষ দৃশ্য জানান দেয় আওয়ারাপন থ্রি আসছে। আলিয়ার দেখভালের দায়িত্ব জারার হাতে ছেড়ে শিবম চলে যায় আবার অন্য কারোর দাসত্ব করতে। দর্শকদের উদ্দ্যেশ্যে বলে , এতদিন ছিলো স্বাধীন করার লড়াই, এবার হবে খাঁচা ভাঙার লড়াই।

Scroll to Top