একদিনে রাজ্যজুড়ে পুলিশ হেফাজতে ৩ মৃত্যুর ঘটনা, গাইঘাটা ও ধুলিয়ানে এনকাউন্টারে মৃত্যু দুই অভিযুক্তের

৩৬৫ দিন। ১৮ ঘন্টার মধ্যে রাজ্যে জোড়া এনকাউন্টার। গাইঘাটায় বালিকা ধর্ষণ খুনে অভিযুক্তকে খতম করার পর মঙ্গলবার বিকেলে খতম হল বিজেপি নেতা খুনে অভিযুক্ত। এবার অবশ্য এনকাউন্টার করে সিআইডি। গত কয়েকদশকে বাংলায় একদিনে জোড়া এনকাউন্টার সম্ভবত হয়নি। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু বলেছিলেন ‘সকালে জমা বিকেলে খরচ’- তাঁর সেই কড়া নীতি মেনেই জিরো টলারেন্স নিয়ে চলছে প্রশাসন। যদিও সিআইডি দাবি করছে, নিহত শামিউল পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টা করে তখন তাকে গুলি করা হয়। তাৎপর্যপূর্ণভাবে তার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই দক্ষিণ 24 পরগনার বারুইপুরে ভুয়ো ডিগ্রীধারী ডাক্তারের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটলো পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন।
গাইঘাটা এনকাউন্টার
বারুইপুরের অ্যাকশন রিপ্লে গাইঘাটায়। সেই গভীর রাতে বালিকা ধর্ষণ খুনের পুনর্নির্মাণ, সেই পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টা অভিযুক্তের, পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি, পাল্টা ‘আত্মরক্ষার্থে’ পুলিশের গুলিতে খতম অভিযুক্ত। পুলিশ হেফাজতে ফের এনকাউন্টার, ব্যবধানটা মাত্র মাস তিনেকের। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু বলেছিলেন মহিলাদের ওপর অত্যাচারে তাঁর সরকার জিরো টলারেন্স নীতি নেবে। পর পর ধর্ষণ খুনে অভিযুক্তের এনকাউন্টারের ঘটনায় অনেকে বলছেন শুভেন্দু সরকার উত্তরপ্রদেশের যোগী মডেলকেই অনুসরণ করছেন। সকালে জমা বিকেলে খরচ স্টাইলে অ্যাকশন হচ্ছে।
প্রস্রাব করতে নেমে পালানোর চেষ্টায় এনকাউন্টার
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, গাইঘাটায় একদিন আগে বালিকা ধর্ষণ খুনের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত হিসাবে নিহত বালিকার সম্পর্কে দাদা প্রহ্লাদ দাস নামে একটি ছেলেকে ধরা হয়। সোমবার রাত ১২ টার একটু পরে প্রহ্লাদকে নিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য বেরোয় পুলিশ। গাইঘাটার বৈদ্যপুর থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে একটি জায়গায় ঘটনার পুনর্নির্মাণ হয়। ফেরার পথে ঘটে আসল ঘটনা। বৈদ্যপুরের কাছে এসে প্রহ্লাদ বলে তার প্রস্রাব পেয়েছে। প্রহ্লাদকে গাড়ি থেকে নামাতেই সে কর্তব্যরত এক পুলিশ অফিসারের সার্ভিস গান ছিনিয়ে নেয়। গুলি চালাতে চালাতে সে বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে দৌড়তে থাকে। ঘটনার আকষ্মিকতায় প্রাথমিক ভাবে হতভম্ব হয়ে যায় পুলিশ।‌ প্রাণ বাঁচাতে একজন পুশিশ কর্মী পুকুরে ঝাঁপ দেয়। বাকিরাও বেশ কিছুটা দূরে সরে যায়। প্রাথমিক জড়তা কাটিয়ে পুলিশ-ও গুলি চালায়। সেই গুলি লাগে প্রহ্লাদের গায়ে। সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তাকে চাঁদপাড়া হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। পুলিশ বলছে, প্রহ্লাদ চার রাউন্ড গুলি চালায়। একটি গুলি লাগে পুলিশের গাড়িতে, একটি গুলি এক পুলিশকর্মীর শরীর ছুঁয়ে বেরিয়ে যায়, বাকি দুটি গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। পাল্টা পুলিশ তিনটি গুলি চালায়। সরকারি ভাবে পুলিশের তরফে মঙ্গরবার দুপুর পর্যন্ত কোনো বিবৃতি না এলেও পুলিশ সূত্রে বলা হচ্ছে, প্রহ্লাদ বাংলাদেশ পালানোর চেষ্টা করছিল। রাতের অন্ধকারে একবার সে গা ঢাকা দিলে আর তাকে খুঁজে পাওয়া‌ যেত না। একাধিকবার তাকে আত্মসমর্পণের সুযোগ দেওয়া হয়। শেষে বাধ্য হয়ে গুলি চালানো হয়।
খটকা যেখানে
পুলিশের ওপর গুলি চললে পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলি চালাতেই পারে কিন্তু তারপরেও প্রশ্ন উঠছে এমন পরিস্থিতি তৈরী হল কেন যেখানে পুলিশের হেফাজত থেকে ধর্ষণ খুনের মত মারাত্মক অপরাধে অভিযুক্ত পালানোর সুযোগ পেল।‌ প্রস্রাবের ছুতো করে পালানোর চেষ্টা আসামীদের পুরনো কৌশল, বিস্ময়কর হল এটি কী পুলিশকর্মীদের অজানা ছিল? প্রহ্লাদ বললো প্রস্রাব করবো আর পুলিশ অন্ধকার রাতে তাকে গাড়ি থামিয়ে নির্জন রাস্তায় নামানোর ঝুঁকি নিয়ে নিল? বারুইপুরে মাঝ রাতে ঘটনার পুনর্নির্মাণে গিয়ে অভিযুক্ত পালানোর চেষ্টা করেছিল তাকে গুলি করতে হয়েছিল, এই ঘটনা থেকে কেন পুলিশ শিক্ষা নিল না? সূর্যপুরের সেই ঘটনার পরেও কেন সেই মাঝরাতেই পুনর্নির্মাণ? প্রহ্লাদের হাতে কী হাতকড়া পরানো ছিল না? না থাকলে কেন ছিল না? থাকলে সে ওই অবস্থায় আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিল কি ভাবে? কেন পুলিশ পা লক্ষ্য করে গুলি চালালো না? এই রকম একাধিক প্রশ্ন উঠছে সোমবার রাতের এনকাউন্টারের পর।
পুলিশ ঠিক করেছে, বলছে নিহতের পরিবার
গাইঘাটায় এনকাউন্টারের খবর সামনে আসতেই সন্তোষ প্রকাশ করেছে নিহত নাবালিকার পরিবার। বালিকার বাবা বলেন, পুলিশ রাজ্য সরকারের নির্দেশে ঠিক কাজ করেছে। ধর্ষণ করে আমার মেয়েকে খুন করেছে। এই জঘন্য অপরাধের জন্য এটাই ঠিক শাস্তি। যদিও প্রহ্লাদ যে তার সম্পর্কে বোনকে ধর্ষণ খুন করতে পারে তা মানতেই পারছে না তার পরিবার। এনকাউন্টারে প্রহ্লাদের মৃত্যুর পর তাদের প্রশ্ন, তদন্ত শেষে যদি উঠে আসে ঘটনা অন্য কেউ ঘটিয়েছে প্রহ্লাদ নির্দোষ ছিল তখন তাকে ফিরিয়ে দিতে পারবে কেউ?
কী ঘটেছিল?
গাইঘাটা থানা এলাকার বাসিন্দা ওই ছাত্রী তার পরিবারের সঙ্গে গাইঘাটা বাজার এলাকায় একটি বিজয়া সম্মিলনীর অনুষ্ঠানে গিয়েছিল শনিবার রাতে। একটি ফোন পেয়ে রাত ১১.৩০ মিনিট নাগাদ সে সেখান থেকে বেরিয়ে যায়। তারপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ মিলছিল না। রবিবার সকালে প্রতিবেশী একটি পরিবারের শৌচাগারের সামনে তার বিবস্ত্র ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধার হয়। মৃত ছাত্রীর পরিবারের অভিযোগ তাদের মেয়েকে ধর্ষণ করে কুপিয়ে খুন করা হয়েছে। এই ঘটনায় গ্রেফতার হয় প্রহ্লাদ।
ধুলিয়ানে এনকাউন্টার
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধুলিয়ানে বিজেপি নেতা সুজিত মন্ডল খুনের তদন্তে মঙ্গলবার ধুলিয়ান বাজারে তদন্তে আসে সিআইডি। সেখানে নিয়ে আসা হয়েছিল খুনের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত শামিউলকে। তদন্তকারীদের দাবি, তারা যখন ডাকবাংলো মোড়ে একটি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন আচমকা এক পুলিশ অফিসারের সার্ভিস গান ছিনিয়ে নেয় শামিউল। গুলি চালিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালায় এক সিআইডি অফিসার। গুলিবিদ্ধ হয় শামিউল। দ্রুত তাকে অনুপনগর ব্লক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত বলে ঘোষণা করেন। সিআইডি-র দাবি পরিকল্পনা করেই পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়েছিল শামিউল। পুলিশ ও সিআইডি অফিসারদের খুন করাই তার উদ্দেশ্য ছিল। তাদের কাছে এনকাউন্টার ছাড়া অন্য উপায় ছিল না।
সুজিত মন্ডল হত্যাকান্ড
চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের প্রথমে ফারাক্কা ব্যারাজ থেকে এক ব্যক্তির দেহাংশ উদ্ধার হয় পরে জানা যায় ওই দেহাংশ ধুলিয়ানের বিজেপি নেতা সুজিত মন্ডলের। তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে সুজিতের সঙ্গে এক মহিলার সম্পর্ক ছিল। ওই মহিলা আবার শামিউলের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ায়। এই ত্রিকোণ প্রেমের জেরে ওই মহিলা ও শামিউল সুজিতকে খুনের চক্রান্ত করে। সিআইডি সূত্রে খবর, সুজিত হত্যার পুনর্নির্মাণ ও আরও কিছু তদন্তের প্রয়োজনে শামিউলকে ঘটনাস্থলে নিয়ে আসা জরুরি ছিল। সেখানে সে আচমকা অস্ত্র ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টা করে।
বারুইপুরে পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু
জোড়া এনকাউন্টারের দিনেই রহস্যজনক ভাবে মৃত্যু হল ভুয়ো ডাক্তার অভিযোগে ধৃত ব্যক্তির। নিহতের নাম বাসুদেব নস্কর। সম্প্রতি ভুয়ো ডাক্তারদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায় বিভিন্ন থানার পুলিশ‌। তাতে ধরা পড়েন বারুইপুরের বেতবেড়িয়া এলাকার বাসিন্দা বাসুদেব। পুলিশের অভিযোগ ছিল বাসুদেব ভুয়ো চিকিৎসক। তিনি নাম ভাঁড়িয়ে চিকিৎসা করছিলেন। তাঁর সব ডিগ্রি ভুয়ো। তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। সেই থেকে বারুইপুর জেলে ছিলেন তিনি। মৃতের স্ত্রী সোনালির অভিযোগ মঙ্গলবার পুলিশ তাকে জানায় বাসুদেব অসুস্থ। সোনালি দ্রুত জেলে পৌঁছোন স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু সেখান থেকে জানানো হয় জেল হাসপাতালে নয় বাসুদেবকে ভর্তি করা হয়েছে বারুইপুর হাসপাতালে। সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন বাসুদেবকে হাসপাতালের বেডে হাত পা বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে। স্বামীর কী হয়েছে জানতে চাইলে তাকে কোনো কিছু জানাননি নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ ও জেলকর্মীরা। পরে বাড়ি ফিরে তিনি জানতে পারেন হাসপাতালে মৃত্যু হয়েছে তার স্বামীর। সোনালির অভিযোগ, তার স্বামীর অসুস্থতা সংক্রান্ত গোটা বিষয়টি চেপে যাওয়া হয়েছে। তাকে না জানিয়ে কেন তার স্বামীকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হল? কোন রোগের চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হল ? কেন তার হাত পা বেঁধে রাখা হল? এই সব প্রশ্ন তুলছেন তিনি। তাঁর দাবি, বাসুদেবের মৃত্যু স্বাভাবিক নয় তাকে খুন করা হয়েছে। যদিও পুলিশ সূত্রে জানা যাচ্ছে , জেলে আচমকা অসুস্থ হয়ে পড়ায় বাসুদেবকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। বেডে ছটফট করছিলেন বলে তাকে বেঁধে রাখা হয়েছিল অনেক রোগীর ক্ষেত্রেই এমন করা হয়ে থাকে। জেলা পুলিশের তরফে জানানো হচ্ছে, নিহত বাসুদেবের দেহ ময়নাতদন্ত করে দেখা হবে। সেই রিপোর্ট এলে বোঝা যাবে মৃত্যু স্বাভাবিক নাকি তার মধ্যে কোনও রহস্য আছে।

Scroll to Top