সরশুনায় বর্বরতার পাল্টা ছবি! নির্যাতনে অভিযুক্তদের নগ্ন করেই হাঁটাল পুলিশ

৩৬৫ দিন।বর্বরতার শাস্তি পাল্টা বর্বরতা।মধ্যযুগীয় শাসন ব্যবস্থা খাস কলকাতায়।১৩ বছরের ছাত্রীর সঙ্গে প্রেম করার অভিযোগে ১৯ বছরের ছেলে এবং , তাঁর বাবা এবং আর এক বন্ধুকে উলঙ্গ করে বেহালার সরসুনার রাস্তার ৫০ মিটার হাঁটানো হয়েছিল।এমনকি গুলি করে মেরে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়।এই বর্বরতার যোগ্য জবাব হিসেবে পুলিশও নগ্ন করে,কোমরে দড়ি পরিয়ে রাস্তায় ঘোরাল।যাকে আইনের ভাষায় বলা হয় ‘অ্যান আই ফর অ্যান আই’।অভিযুক্তদের ওই একই রাস্তায় নিয়ে গিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণ করল পুলিশ। অভিযোগ, যে পথে তিন জনকে বিবস্ত্র অবস্থায় হাঁটানো হয়েছিল, সেই পথেই খালি গায়ে, কোমরে দড়ি বেঁধে অভিযুক্তদের হাঁটানো হয়।এই ঘটনায় গ্রেফতার করা হয় ৪ জনকে।গ্রেফতার করা হয় কিশোরীর বাবা প্রদীপ সরকার, মামা রাহুল বর্মন, মা রিঙ্কু সরকারকে।
কি ঘটেছিল?
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, লক্ষ্মীপুজোর রাতে ১৮ বছরের বেশি বয়সি রোহিত মালিক তাঁর বন্ধু রুদ্র দাসকে সঙ্গে নিয়ে সরশুনার খালপাড় মাঠের কাছে এক ১৩ বছরের ওই নাবালিকার সঙ্গে দেখা করতে যান। কথাবার্তার সময় রোহিত ওই নাবালিকাকে চুম্বন করেন বলে অভিযোগ। সেই দৃশ্য নাবালিকার মামার এক পরিচিতের নজরে আসে। তিনিই নাবালিকার বাবা ও মামাকে বিষয়টি জানান।এর পরেই পরিস্থিতি ভয়াবহ মোড় নেয় বলে অভিযোগ। অভিযোগ, আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। রোহিত, তাঁর বাবা এবং বন্ধু রুদ্রকে পোশাক খুলতে বাধ্য করা হয়। শুধু তাই নয়, বাড়ির সামনের গলি দিয়ে প্রায় ৫০ মিটার তাঁদের বিবস্ত্র অবস্থায় হাঁটানো হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। রবিবার রাত ৮টা নাগাদ তিন জনকে এ ভাবে হাঁটানোর সময়ে রাস্তার ধারে লোকজনের ভিড় জমে যায়। প্রকাশ্য রাস্তায় এমন অপমানজনক ঘটনার অভিযোগে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, ব্যক্তিগত ক্ষোভের জেরে কী ভাবে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারে!
একই রাস্তায় অভিযুক্তেরা, পুনর্নির্মাণ পুলিশের
প্রেমিক ও তাঁর বাবা এবং বন্ধুকে হেনস্থার ঘটনায় সরশুনা থানার পুলিশ তিন জনকে গ্রেফতার করেছে। নিম্ন আদালত তাঁদের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছে। পুলিশ সূত্রে খবর, হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর মঙ্গলবার অভিযুক্তদের ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়। যে বাড়িতে তিন জনকে মারধর ও নির্যাতন করা হয়েছিল বলে অভিযোগ, সেখানেও তাঁদের নিয়ে যায় পুলিশ। পাশাপাশি, যে এলাকায় তাঁদের বিবস্ত্র অবস্থায় হাঁটানো হয়েছিল, সেই পথেও ঘটনার পুনর্নির্মাণ করা হয়।রবিবার যে রাস্তায় তিন জনকে ঘিরে কৌতূহলী মানুষের ভিড় জমেছিল, মঙ্গলবারও সেই এলাকায় দেখা যায় একই রকম চাঞ্চল্য। তবে এ বার দৃশ্যের কেন্দ্রে ছিলেন নির্যাতনের অভিযোগে ধৃত তিন ব্যক্তি। তদন্তের স্বার্থেই তাঁদের ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর।
মানবাধিকার সংগঠন এর বক্তব্য
এই ঘটনায় মানবাধিকার সংগঠন জানিয়েছে,যে ঘটনা ঘটেছে, সেটা লজ্জাজনক। দীর্ঘক্ষণ ধরে ওই তরুণ এবং তরুণের বাবার সঙ্গে এই ঘটনা ঘটল। অথচ পুলিশ পৌঁছোয়নি। সময় মতো পুলিশ পৌঁছোলে এই ঘটনাটা ঘটত না। পাল্টা পুলিশ কি করল? অভিযুক্তদের অর্ধনগ্ন করে প্যারেড করাল!এই ট্রেন্ড তো এখন বেশি দেখছি!পুলিশের কর্মবিধিতে এটা কোথায় আছে? ভারতীয় ন্যায় সংহিতাতে আছে? পুলিশের কাজ তো আইন রক্ষা করা, আইন মেনে কাজ করা। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া নয়। এটা পুলিশের কাজ হতে পারে না। ইতিহাস সাক্ষী এই ভাবে অপরাধ কমানো যায় না। আসলে পুলিশ নিজের দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ। তারা সমস্ত আইন অমান্য করে রাজনৈতিক নির্দেশ পালন করছে। প্রসঙ্গত, সিপিএমের করা মামলার প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট রায় দিয়েছিল, পুলিশ অভিযুক্তকে প্রকাশ্যে খালি গায়ে, খালি পায়ে হাঁটাতে পারে না। এমনকি তার ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করাও অন্যায়।
থানায় মামলা, অস্ত্র আইনের ধারাও
নির্যাতনের শিকার তরুণের বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে সরশুনা থানায় ২২২/২০২৬ নম্বর মামলা রুজু হয়েছে। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার একাধিক ধারার পাশাপাশি অস্ত্র আইনের ধারাতেও মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে হুমকি দেওয়ার অভিযোগেরও তদন্ত চলছে।
প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে আপত্তি থাকতেই পারে। নাবালিকার সঙ্গে কোনও অনুচিত আচরণের অভিযোগ থাকলে, তার তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পথও খোলা রয়েছে। কিন্তু সেই অভিযোগকে অজুহাত করে কাউকে বিবস্ত্র করা, মারধর করা কিংবা প্রকাশ্য রাস্তায় অপমান করার অধিকার কারও নেই। কয়েক মাস আগে গিয়ে দেখা উচিত,জুন মাসে একটি জনস্বার্থ মামলায় কলকাতা হাই কোর্টের পর্যবেক্ষণ ছিল, পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে পারে। কিন্তু তার পর ইচ্ছাকৃত ভাবে তাঁর সম্মানহানি করতে পারে না। বিচারপতি জয় সেনগুপ্ত এবং বিচারপতি স্মিতা দাস দে-র ডিভিশন বেঞ্চ বলেছিল,পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে পারে। আইন মেনে তাঁর বিরুদ্ধে পদক্ষেপও করতে পারে। দোষ প্রমাণিত হলে তাঁকে ফাঁসিতেও চড়াতে পারে। কিন্তু গ্রেফতারের নামে ইচ্ছাকৃত ভাবে অভিযুক্তদের সম্মানহানি করতে পারে না। রাজ্যের কাছ থেকে রিপোর্টও তলব করে আদালত।

Scroll to Top