৩৬৫ দিন। চোরবাগান সর্বজনীন পুজো মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনায় শোকের ছায়া নেমেছে। উৎসবের মরসুমে এমন মর্মান্তিক বিপর্যয় কী ভাবে ঘটল, ভিড় নিয়ন্ত্রণে কোথায় গলদ ছিল এবং নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের ভূমিকা কী ছিল, তা নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন। ঘটনার পর রবিবার ভবানী ভবনে জরুরি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বৈঠক শেষে তিনি এক দিকে দুর্ঘটনার পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেছেন, অন্য দিকে নিরপেক্ষ তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন। পাশাপাশি, রাজ্যের অন্যান্য বড় পুজো মণ্ডপেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর করার বার্তা দিয়েছেন তিনি।
মণ্ডপের ভিতরে নয়, দুর্ঘটনা এন্ট্রি-এক্সিট পয়েন্টে
চোরবাগানের দুর্ঘটনা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, মণ্ডপের ভিতরে কোনও দুর্ঘটনা ঘটেনি। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ভিতরে কোনও দুর্ঘটনা ঘটেনি। ঘটলে আরও ভয়ঙ্কর হতো। সংখ্যাটা কোথায় পৌঁছত ভাবতেও পারবেন না। দুর্ঘটনা ঘটেছে এন্ট্রি ও এক্সিট পয়েন্টে।মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যে ভিড়ের চাপ সামলানো এবং প্রবেশ ও বেরোনোর পথের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। বড় পুজো মণ্ডপে দর্শনার্থীদের প্রবেশ ও প্রস্থানের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা, সুশৃঙ্খল লাইন এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল, তা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে ঠিক কী কারণে পদপিষ্টের ঘটনা ঘটল, তা তদন্তের পরেই স্পষ্ট হবে।
চোরবাগান বিপর্যয়ে মৃতদের মধ্যে অধিকাংশই জেলার বাসিন্দা
চোরবাগান সর্বজনীন পুজো মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ১৯ জন। মৃতদের তালিকায় কলকাতার পাশাপাশি হুগলি, হাওড়া, নদিয়া, পূর্ব বর্ধমান এবং উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসিন্দাদের নাম রয়েছে। তালিকায় কিশোর-কিশোরী থেকে ৬০ ঊর্ধ্ব বিভিন্ন বয়সের মানুষ রয়েছেন। বিহারের এক বাসিন্দার নামও রয়েছে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় শোকের ছায়া নেমেছে একাধিক জেলায়।
শ্রীপর্ণা পোদ্দার (২৬) বৈদ্যবাটী, হুগলি
মিঠু মণ্ডল (৪৫) শ্যামপুকুর, কলকাতা
আকৃতি কুমারী (১৭) বালি, হাওড়া
বর্ণালী হালদার (১৭) নিউ টাউন
তানিয়া বিশ্বাস (১৮) নিউ টাউন
শুভম শঙ্কর (৩৩) মানিকতলা, কলকাতা
আরতি সরকার বিশ্বাস (৪৫) চাকদহ, নদিয়া
টিঙ্কার বেজ (৩৭) মাধবডিহি, পূর্ব বর্ধমান
সন্দীপ বেজ (১৪) মাধবডিহি, পূর্ব বর্ধমান
কল্পনা জানা (৪৬) খড়দহ, উত্তর ২৪ পরগনা
বিকাশ ভট্টাচার্য (৬৬) মালিপাঁচঘড়া, হাওড়া
স্নেহা ভাওরী (২০) বাকরাহাট, দক্ষিণ ২৪ পরগনা
পিয়ালী প্রামাণিক (২৫) আরামবাগ, হুগলি
প্রিয়া সমাদ্দার (১৮) নিউ ব্যারাকপুর, উত্তর ২৪ পরগনা
প্রাঞ্জল সরকার (১৩) আগরপাড়া, উত্তর ২৪ পরগনা
দিলীপ ঘোষ (৫৯) বরানগর, উত্তর ২৪ পরগনা
দিপালী ঘোষ (৪৬) বরানগর, উত্তর ২৪ পরগনা
অভিষেক শ্রীবাস্তব (৩৮) মুজফ্ফরনগর, বিহার
আয়াংশ কুমার শ্রীবাস্তব (৭) বৈদ্যবাটী, হুগলি।
অভিযোগের অস্থায়ী হোমগার্ডদের বিরুদ্ধে
ঘটনার জন্য অস্থায়ী হোমগার্ডদের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, নিহতদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পেরেছেন, মূল অভিযোগ ওই অস্থায়ী হোমগার্ডদের বিরুদ্ধে। ইতিমধ্যেই তাঁদের নামের তালিকা চেয়ে পাঠিয়েছেন তিনি।নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের ভূমিকা, ভিড় নিয়ন্ত্রণে তাঁদের প্রস্তুতি এবং প্রবেশ ও প্রস্থানের পথে দায়িত্ব পালনে কোনও গাফিলতি হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে অভিযোগ উঠলেই কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। তদন্তে তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নির্ধারিত হবে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের পর অস্থায়ী হোমগার্ডদের দায়িত্ব ও তাঁদের নিয়োগ-সংক্রান্ত বিষয়ও তদন্তের আলোচনায় উঠে আসতে পারে।
নিরপেক্ষ তদন্তে সিট, বাইরে কলকাতা পুলিশ ও পুরসভা
চোরবাগান বিপর্যয়ের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট গঠনের কথা জানানো হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এই দলে কলকাতা পুলিশ, রাজ্য দমকল বিভাগ এবং কলকাতা পুরসভার কোনও প্রতিনিধিকে রাখা হবে না। তদন্তের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতেই এই সিদ্ধান্ত বলে জানানো হয়েছে।
কলকাতা হাইকোর্টের কোনও বর্তমান বা প্রাক্তন বিচারপতির নেতৃত্বে তদন্তকারী দল কাজ করতে পারে বলে জানানো হয়েছে। সেই দলে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী বা এনডিআরএফের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে।দুর্ঘটনার কারণ নির্ধারণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থার ত্রুটি চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় এড়াতে কী পদক্ষেপ প্রয়োজন, তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। তবে তদন্তকারী দলের চূড়ান্ত গঠন, সদস্যদের পরিচয় এবং তাদের কার্যপরিধি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন।
নিহতদের পরিবারের পাশে থাকার বার্তা
দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করার কথা ভাবছেন মুখ্যমন্ত্রী। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের পরিবারের সঙ্গেও ব্যক্তিগত ভাবে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন তিনি। উৎসবের দিনগুলিতে সাধারণ দর্শনার্থীদের যাতায়াতে যাতে বাড়তি অসুবিধা না হয়, তা মাথায় রেখেই যত বেশি সম্ভব ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।এই বিপর্যয়ে স্বজন হারানো পরিবারগুলির কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ঘটনার প্রকৃত কারণ জানা, দায় নির্ধারণ এবং উপযুক্ত সহায়তা পাওয়া। আহতদের চিকিৎসা ও তাঁদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোও প্রশাসনের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ দায়িত্ব। মুখ্যমন্ত্রীর প্রস্তাবিত সাক্ষাৎ সেই পরিস্থিতিতে প্রশাসনের সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বড় পুজোয় ভিড় নিয়ন্ত্রণে কড়াকড়ি
চোরবাগানের ঘটনার পর শুধু কলকাতা নয়, রাজ্যের অন্যান্য জেলার বড় ও জনপ্রিয় পুজো মণ্ডপগুলির নিরাপত্তা নিয়েও পর্যালোচনা হয়েছে ভবানী ভবনের বৈঠকে। কোথায় কতটা ভিড় হচ্ছে, দর্শনার্থীদের প্রবেশ ও বেরোনোর পথ কতটা উপযুক্ত এবং বিকল্প রাস্তার ব্যবস্থা রয়েছে কি না, সেই বিষয়গুলি খতিয়ে দেখার কথা জানানো হয়েছে।
বড় পুজোগুলিতে ভিড় নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর শৃঙ্খলা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে ভিআইপি গেট বা বিশেষ প্রবেশদ্বার তুলে দেওয়ার কথাও বিবেচনা করা হচ্ছে। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনও রকম আপস না করার বার্তাই এই পদক্ষেপের মধ্যে দিয়ে দিতে চাইছে প্রশাসন।বিশেষ প্রবেশদ্বার থাকলে সাধারণ দর্শনার্থীদের চলাচলে কোনও সমস্যা তৈরি হচ্ছে কি না, তা-ও পর্যালোচনার বিষয় হতে পারে। তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি মণ্ডপের আয়তন, প্রবেশপথ, বেরোনোর রাস্তা এবং সম্ভাব্য ভিড়ের অনুপাতে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
চোরবাগানে ১৬৩ ধারা, নজরদারি বাড়ল
চোরবাগান বিপর্যয়ের পর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে কড়া পদক্ষেপ করা হয়েছে। রবিবারের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আগামী মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর পর্যন্ত চোরবাগান এলাকায় ১৬৩ ধারা বলবৎ থাকবে। শহরের বিভিন্ন সংবেদনশীল ও জনবহুল এলাকায় পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।উৎসবের মরসুমে যাতে নতুন করে কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে দিকে নজর রাখছে প্রশাসন। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের যাতায়াত স্বাভাবিক রাখা এবং নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
গুজবে কান না দেওয়ার আবেদন
শোকাবহ পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে শান্ত থাকার আবেদন জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। গুজবে কান না দিয়ে প্রশাসনকে সহযোগিতা করার বার্তা দিয়েছেন তিনি। চোরবাগানের মর্মান্তিক ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে এখন নজর তদন্তের দিকে। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের ভূমিকা থেকে শুরু করে প্রবেশ ও প্রস্থানের ব্যবস্থাপনা সব দিক খতিয়ে দেখে দায় নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা ঠেকানোর কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এন্ট্রি-এক্সিট পয়েন্টেই বিপত্তি, নিরপেক্ষ তদন্তের আশ্বাস মুখ্যমন্ত্রীর
- khabar365din
- October 18, 2026
- 6:58 pm
- No Comments





