কেরালায় কুরুক্ষেত্র এবার একেনকে টেক্কা দিল বাবাজি পিল্লাই

৩৬৫ দিন। সৌগত সরকার। কম শব্দে এই ছবির ট্যাগলাইন হিসেবে বলা যায়, গোয়েন্দা একেন্দ্র সেনকে টেক্কা দিয়েছে,বাবাজি পিল্লেই। ছবিটা একেনের না হয়ে, বাবাজি পিল্লাইয়ের হলেও ক্ষতি ছিল না।কেরলমের এই কুখ্যাত আন্ডারওয়ার্ল্ড আন্না, পদে পদে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে একেনকে। এক সময় মনে হচ্ছিল, একেনবাবু বোধ হয় এবার হার মানবেন। বাবাজির দাপটে ধুরন্ধর, প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব সম্পন্ন, মাছ ভাত খাওয়া বাঙালি মস্তিষ্ক, বোধহয় গোল খেয়ে যাবেন। কিন্তু শেষে গিয়ে দেখা গেল, কষ্ট করে সম্বর ইডলি ধোসা সামলে, একেন বাবাজি পিল্লাই কেও গিলে ফেললেন। তবে এই ছবিতে একেনের কাছে হেরে গেলেও বাবাজি পিল্লাই দশে দশ পাবেন।
একটা সময় হিন্দি ছবিতে সংলাপ লেখার সময়, খানিক রিলিফ দেওয়ার জন্য, গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের মুখে, বাংলা তামিল ইত্যাদি আঞ্চলিক ভাষা ভুল উচ্চারণে বসিয়ে, একটা কমিক ফিল্ড তৈরি করার রেওয়ায়াজ ছিল। বাঙালি দর্শকরা মজা পেত, ওই দেখো ধর্মেন্দ্র বাংলা বলছে… এই ভেবে। অন্যদিকে হিন্দিভাষীরা বিদঘুটে ভাষা ভেবে কৌতুক বোধ করত। সোনার কেল্লার কানপুর স্টেশিন ছাড়ার পর,সেই বিখ্যাত সংলাপ.. আপনি হিন্দিটা চালিয়ে যেতে পারেন.. আরে ধুর মশাই, হিন্দি কি সাধে বলে নাকি। স্যাটাইয়ার এর মধ্যে দিয়ে সত্যজিৎ বুঝিয়ে দিলেন, দর্শক শ্রোতাদের কাছে এটা ফান হলেও, আসলে যিনি বলছেন, তার কাছে এটা সারভাইভাল স্ট্র্যাটেজি। ব্যাস, জোর জবরদস্তি সংলাপে অন্য আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের অভিমুখটা বদলে দিলেন। কমিক বা ফানের থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল প্রয়োজনীয়তা বা নেসেসিটি। পরিচালক জয়দীপ মুখোপাধ্যায় অত্যন্ত নিপুণতার সঙ্গে এটা গোটা ছবির ৮০ শতাংশ জুড়ে ব্যবহার করলেন। প্যান্ট শার্ট কিংবা পাঞ্জাবি পায়জামা ছেড়ে, দক্ষিণ ভারতীয়দের মতো ধুতি গুটিয়ে লুঙ্গির মতো করে পড়া যতটা কঠিন, তার ১০০ গুণ কঠিন, খাঁটি বাঙালি একেনকে দিয়ে দক্ষিণ ভারতীয় ভাষা বলানো। সেটাই করলেন, চূড়ান্ত কৌতুকের মধ্যেও, কোথাও কোথাও অন্য জাতির ভাষাকে ছোট করার প্রচেষ্টা নেই। একেন্দ্র সেন কেরালায় পৌঁছেছেন মানেই, তিনি একেন অনুরাগীদের সংলাপে সংলাপে বিপুল মজা দেবেন, সেটা তো সত্যি বটেই, কিন্তু তাতে কোন পরিহাস লুকিয়ে নেই, বোকামি নেই, জোর করে হাসানোর প্রবণতা নেই, আছে তার সারভাইভাল বা টিকে থাকার লড়াই। ধন্যবাদ জয়দীপ।
কেরলম কেলেংকারিম
রাজস্থানের ডাকু সামলে, বেনারসের বিভীষিকা উতরে, এবার একেন বাবু পৌঁছেছেন কেরালায়। পরিচালকের মাস্টারিং আর অনির্বাণের অভিনয় এই ছবিকে,একটা নতুন গিয়ার দিল। পরবর্তী একেন ছবির জন্য আরও কয়েক ধাপ উচ্চতায় ওঠার বেঞ্চমার্ক তৈরি করে দিলেন। অসাধারণ রোমাঞ্চকর ট্রাভেলগের সঙ্গে, জমজমাট একশন, পুজোয় দর্শকদের কাছে ব্ল্যাক কমিডির পঞ্চ ব্যঞ্জন সহযোগে বিনোদনের ভোগের থাল সাজিয়ে দিল বলা যায়। ছবির সব গল্প ফাঁস করে দর্শকদের থ্রিল নষ্ট করতে চাই না। চিত্রনাট্য এমন ভাবে সাজানো,সেখানে ছবির গল্প বলতে গেলে, বুদ্ধিমান পাঠক ধরে ফেলবেন। একই সঙ্গে পরিচালক,অভিনেতা সহ বাকি একেন টিমের সঙ্গে প্রতারণা হবে। তাদের দীর্ঘ লড়াই,পরিশ্রমকে অসন্মান করা হবে।
একটা নিউক্লিয়ার ব্যালেস্টিক মিসাইল এর অ্যাক্টিভেশনের ফর্মুলা, হরপ্পার প্রাচীন লিপি এবং আন্ডারগ্রাউন্ড জিহাদি জঙ্গি গোষ্ঠী, এই ত্রিভুজের এবার আটকা পড়েছেন একেন বাবু। একটি সরকারি অ্যাসাইনমেন্টে দুই সঙ্গীকে নিয়ে পুরুলিয়া গিয়েছিলেন, সেখান থেকেই তাকে কিডন্যাপ করা হয়। খোঁজ নেই গোয়েন্দা একেনের। এদিকে পাকিস্তানের নিউক্লিয়ার সেমিনার থেকে সদ্য ভারতে ফেরা বিজ্ঞানীও অপহৃত হয়। যে অপহরণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, কেরালার কুখ্যাত বাবাজি পিল্লাই। পাকিস্তানের গুপ্তচর এবং জিহাদী ইরফান ফাজিলের চাই ব্যালেস্টিক মিসাইল এর ফর্মুলা। যার মূলসূত্র আগে থেকে আঁচ পেয়েই বাঙালি বিজ্ঞানী এক দুর্বোধ্য হেয়ালির মাধ্যমে লুকিয়ে রেখেছেন। একেনের অপহরণ,আবার হঠাৎ তার উদয়,পরিচিত মুখের আড়ালে গুপ্তচরকে খোঁজা, দুঃসাহসিক এক অভিযান, ক্যামোফ্লাজ, গল্পে একাধিক মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া টুইস্ট,আর সেয়ানে সেয়ানের টক্কর বাবাজি পিল্লাইয়ের সঙ্গে। সব মিলিয়ে কেরালার দুর্দান্ত ফটোগ্রাফিক ক্যানভাস এর সঙ্গে, রোমাঞ্চকর এক পর্যটন, দর্শককে নড়তে দেবে না।
কুঞ্চম কুঞ্চম রহস্যম
প্রথমেই বলেছি, জয়দীপ মুখোপাধ্যায় পরিচালিত রাজস্থান এবং বেনারস সিরিজের থেকে এই ছবির স্ট্রাকচারাল বিল্ড আপ ভিন্ন। ছবির গতি এক কেন্দ্রীক হলেও, ছবির দুটো লেয়ার আছে। একটা লেয়ারে দর্শকদের পরিচিত একেন্দ্র সেন, তার দুই সহযোগী বাপি, প্রমথ, এবং একেন্দ্র সুলভ অ্যাক্টিভিটি দিয়ে সাজানো। নাম ভুলে যাওয়ার প্রবণতা, খাদ্যের প্রতি তীব্র আকর্ষণ, ভুল প্রবাদ নিজের যুক্তিতে সাজিয়ে ভুল ভাবে বলা, কিংবা বডি ল্যাঙ্গুয়েজ। একেন্দ্রিয় ব্যাপার আর কি।
কিন্তু ছবির দ্বিতীয় লেয়ারটি অনেক গভীরে প্রথিত। অনেক সিরিয়াস। এবং একইসঙ্গে বাকি একেন্দ্র ছবির থেকে এই ছবিকে গুণমান এগিয়ে দেয়। এই দ্বিতীয় লেয়ার তৈরিতে পরিচালক এবং চিত্রনাট্যকারের যতটা পরিশ্রম হয়েছে, যতটা মেধা খরচ হয়েছে, তার ১০০ গুণ বেশি মেধা,পরিশ্রম ব্যয় করতে হয়েছে অভিনেতা অনির্বাণকে। অনেকেই ছবির কাস্টিং টিজার এবং ট্রেলার দেখে, বলতে বা লিখতে শুরু করেছিলেন, যে এই ছবির মূল টক্কর অনির্বাণ বনাম ঋত্বিক। কিন্তু আসলে এই ছবিতে অনির্বাণের টক্কর হয়েছে অনির্বাণের সঙ্গেই। ঋত্বিক একটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র মাত্র। অনির্বাণ নিজেকেই ছাড়িয়ে গিয়েছেন। সোজা ভাষায় বলতে গেলে, একেন বনাম একেন। উত্তরণ অনির্বাণের। কি স্বতঃস্ফূর্ত সরল অভিনয় দিয়ে অসম্ভব এক জটিলতা সহজে পার করেছেন। কেন বাংলার পরিচালকরা, ওকে সঠিকভাবে ব্যবহার করলেন না, সেটাই আশ্চর্য লাগে। শুধু একেন করার জন্য বাংলা চলচ্চিত্রে অনির্বাণ আসেননি।
ইরফান ফাজিল কুটিলম
ছবির কুড়ি মিনিটের মধ্যে যখন পাকিস্তানের আন্ডারগ্রাউন্ড জিহাদী কমান্ডার, ইরফান অর্থাৎ ঋত্বিককে পোর্ট্রে করা হয়, বেহালায় আফগানি টিউন তুলে, অনেক সম্ভাবনার ছবি দেখালেন। যে রহস্যময়তা, যে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়ে তার চরিত্রটা আরো গভীর এবং আকর্ষণীয় হয়ে ওঠার কথা ছিল, ছবির দ্বিতীয়ার্ধে এসে, সেটা যেন অনেক ফিকে হয়ে যায়। একটা সময়, ইরফানের মত ভয়ংকর কমান্ডারের, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ কিংবা পরিসর যেন অতি সাধারণ হয়ে ওঠে। সেই গাম্ভীর্য গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে চরিত্রটা। তখন পর্দায় চুটিয়ে লড়াই চলছে একেনের ক্ষুরধার মস্তিষ্কের সঙ্গে বাবাজি পিল্লাইয়ের। সম্ভবত, পরিচালক একেন এবং বাবাজিকে বেশি জায়গা দিতে গিয়ে, ইরফান তার গুরুত্ব হারিয়েছে। যদিও এটা আমার ব্যক্তিগত মতামত। ঠিক একই অবস্থা হয়েছে দীপা চরিত্রটার। যে রহস্যের গভীরতার মধ্যে দিয়ে দীপা অর্থাৎ রাইমা তার চরিত্রটাকে বিল্ড আপ করছিলেন, ছবির শেষ অংশে সে যেন বড্ড দায়সারা। হাইলি ট্রেন্ড এক গুপ্তচর কেন রাতারাতি সাধারণ একজন ক্রিমিনাল হয়ে গেল। ক্লাইম্যাক্স আরও আকর্ষক আশা করেছিলাম,যেমনটি ছবি এগোচ্ছিল,আরও অ্যাড্রেনালিন ক্ষরণ প্রত্যাশা ছিল। হেঁয়ালির জট খুলল,কিন্তু বড্ড তাড়াহুড়োয়। যেন ইব্রাহিম অপেক্ষায় ছিল…।
ছবির কালার প্যালেট দারুণ ভাবে ব্যবহার করেছেন সিনেমাটোগ্রাফার এবং অবশ্যই যারা টেকনিকাল দায়িত্বে ছিলেন। বড় স্ক্রিন জুড়ে ভারতের নায়গ্রা চোখকে শান্তি দেয়। সুব্রত দত্তকে গুরুত্বপুর্ন চরিত্রের পর্দায় দেখে ভালো লাগল। বড় অভিনেতা। ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামার কৃতি ছাত্র ছিলেন। নয়াজউদ্দিন সিদ্দিকীর ব্যাচমেট। স্কলারশিপ নিয়ে লন্ডনে ড্রামা ইন্সিটিটিউটে পড়াশুনো করেছেন। যদিও ব্যবহার হননি। কয়েক বছর আগে সুব্রত সেনের প্রজাপতি ছবিতে দুর্দান্ত কাজ করেছিলেন। এই ছবিতে যতটুকু সময় পেয়েছেন,নিজের চরিত্রে সাবলীল,ডাউন টিউন এবং বাস্তবসম্মত ছিলেন। ঋত্বিক নিয়ে বলার কিছু নেই। ওই চরিত্রের জন্য সেরা নির্বাচন।
ছবির আবহে মজা আছে। লিরিক, ভোকাল এবং স্কোরিং জমজমাট। অবান্তর আরোপিত মনে হয়নি। পুজোর আবহের সঙ্গে এই ছবি অনায়াসে মিলে যাবে, সব বয়সের দর্শকদের জন্য উপভোগ্য।

Scroll to Top