৩৬৫ দিন। প্যারিসে রাতের অন্ধকারে হানা। হাতুড়ির আঘাতে গুঁড়িয়ে দেওয়া হল সুরক্ষাবেষ্টনী।তার পর প্রায় ১৫০ কেজি ওজনের দুর্মূল্য ব্রোঞ্জের মলাট নিয়ে চম্পট দিল দুষ্ক্রীতরা। ফ্রান্সের একটি ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায় এই দুঃসাহসিক চুরির ঘটনায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। চুরি যাওয়া শিল্পকর্মটির নকশাকার স্বয়ং প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী সালভাদর দালি। দামি পাথর, সামুদ্রিক শাঁস এবং ধাতব সরঞ্জামে সাজানো এই মলাটের ঐতিহাসিক মূল্য কয়েক মিলিয়ন ইউরো। ঘটনায় ফের প্রশ্নের মুখে ইউরোপের সংগ্রহশালাগুলির নিরাপত্তাব্যবস্থা।
রাতারাতি উধাও দুর্মূল্য শিল্পকর্ম
ফরাসি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৪ থেকে ৫ অক্টোবরের মধ্যবর্তী রাতে ফ্রান্সের ইসোয়ার শহরের একটি ছোট্ট ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা থেকে চুরি যায় দালির নকশা করা ব্রোঞ্জের মলাটটি। সংগ্রহশালার মালিক ও শিল্পী ক্রিশ্চিয়ান কারুতজোসের দাবি, দুষ্কৃতিরা ভিতরে ঢুকে কার্যত তাণ্ডব চালায়। বইটিকে সুরক্ষিত রাখার জন্য রাখা স্বচ্ছ প্লেক্সিগ্লাসের আবরণ হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়। তার পরই উধাও হয়ে যায় শিল্পের এই অমূল্য নিদর্শন। ফরাসি সংবাদমাধ্যম ‘লা মঁতান’-কে কারুতজোস জানান, চোরেরা ঢুকে সব কিছু ভেঙেচুরে দিয়েছে। কীভাবে এত ভারী একটি শিল্পকর্ম সংগ্রহশালা থেকে সরানো হল, চুরির পিছনে কারা রয়েছে।

অক্ষত পাণ্ডুলিপি, তবু অপূরণীয় ক্ষতি
চুরির ঘটনায় স্বস্তির একমাত্র খবর, বইটির ১৫০টি পৃষ্ঠা মলাটের ভিতরে ছিল না। ফলে মূল পাণ্ডুলিপি অক্ষত রয়েছে। শুকনো ভেড়ার চামড়ায় তৈরি এই পাতাগুলির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। মলাট-সহ সম্পূর্ণ বইটির ওজন প্রায় ২০৯ কেজি। অর্থাৎ, দুস্ক্রিতিরা যদি গোটা বইটি সরানোর চেষ্টা করত, তবে তাদের সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ থাকত। তবে পাণ্ডুলিপি রক্ষা পেলেও দালির নকশা করা মলাটের হারিয়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে বড় ক্ষতি। কারণ, এই শিল্পকর্মের মূল্য শুধু তার উপকরণ বা বাজারদরে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিংশ শতাব্দীর শিল্পচর্চার গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস
কয়েক কোটি ইউরোর ঐতিহাসিক সম্পদ সৃষ্টির সময় এই বইটিকে বিশ্বের সবচেয়ে দামি শিল্পকর্মগুলির অন্যতম বলে বিবেচনা করা হত।১৯৬১ সালে এর মূল্য ছিল ২০ লক্ষ ফরাসি ফ্রাঁ, যা সেই সময়ের মার্কিন প্রায় ৪ লক্ষ ৮ হাজার ডলারের সমান। বর্তমানে এই শিল্পকর্মকে ফ্রান্সের ঐতিহ্যসম্পদ হিসেবে দেখা হয়। এর মূল্য কয়েক মিলিয়ন ইউরো বলে অনুমান করা হয়।
ইউরোপের সংগ্রহশালায় বাড়ছে চুরির উদ্বেগ
সেটি কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তা নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন। মলাটজুড়ে দামি পাথর, শাঁস ও ধাতব সরঞ্জাম দালির তৈরি এই মলাটের বিশেষত্ব তার অভিনব নকশা। দামি পাথরের পাশাপাশি এতে বসানো ছিল সামুদ্রিক শাঁস এবং ছুরি-কাঁটাচামচের মতো দৈনন্দিন ব্যবহারের ধাতব সরঞ্জাম। পরিচিত উপকরণকে অপ্রত্যাশিত বিন্যাসে সাজিয়ে শিল্পের নতুন ভাষা তৈরি করার যে প্রবণতা দালির সৃষ্টিতে বারবার দেখা যায়, এই মলাটেও তার ব্যতিক্রমী প্রকাশ ঘটেছে। প্রায় ১৫০ কেজি ওজনের এই ব্রোঞ্জের আবরণ কেবল একটি বইকে সুরক্ষিত রাখার উপকরণ ছিল না, বরং নিজেই ছিল স্বতন্ত্র শিল্পকর্ম। ফলে এর চুরি শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, ফ্রান্সের সামুদ্রিক ঐতিহ্যের ক্ষেত্রেও বড় আঘাত।
তেরো শিল্পী-লেখকের সৃজনশীল মেলবন্ধন
যে বইকে ঘিরে এই চুরি, তার নাম ‘লিভ্র দ্য লাপোকালিপ্স’। এটি বাইবেলের শেষ গ্রন্থ ‘প্রকাশিত বাক্য’ বা ‘অ্যাপোক্যালিপ্স অব সেন্ট জন’-এর বিশেষ সংস্করণ। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে ফরাসি প্রকাশক জোসেফ ফোরের উদ্যোগে এই অভিনব গ্রন্থ তৈরির কাজ হয়। দালির পাশাপাশি প্রকল্পে অংশ নিয়েছিলেন আরও তেরো জন শিল্পী ও লেখক। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বার্নার্ড বুফে, জঁ ককতো, লেওনর ফিনি, লেওনার্দ ফুজিতা, জঁ জিওনো এবং অসিপ জাদকিনের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। একাধিক শিল্পী ও লেখকের সৃজনশীলতার মেলবন্ধনে তৈরি এই বই শিল্পের ইতিহাসে বিশেষ স্থান অধিকার করে রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন সংগ্রহশালায় চুরির ঘটনা নতুন করে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।গত এক বছরে ফ্রান্সের লুভর সংগ্রহশালা থেকে দিনের আলোয় বিপুল মূল্যের রাজমুকুট ও অলংকার চুরি, ফরাসি রিভিয়েরার একটি সংগ্রহশালা থেকে চারটি রেনোয়ার চিত্রকর্ম উধাও এবং দেশের মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত মুসে দ্যু কে ব্রঁলি, জাক শিরাক সংগ্রহশালায় একাধিক চুরির ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দালির ব্রোঞ্জের মলাটটি শেষ পর্যন্ত উদ্ধার হবে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। পাণ্ডুলিপি অক্ষত থাকলেও শিল্পের ইতিহাসের এক অনন্য নিদর্শন হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। নিরাপত্তার ঘেরাটোপ ভেঙে যদি এ ভাবে দুর্মূল্য শিল্পকর্ম উধাও হয়ে যায়, তবে আগামী দিনে ইউরোপের সংগ্রহশালাগুলিকে আরও কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে; এই ঘটনায় সেই বার্তাই স্পষ্ট।
কাবাল কি আবার সক্রিয় হল?
যদিও ইন্টারপোল বলছে,এই মুহূর্তে অর্থাৎ বিগত ২০ বছর, আন্তর্জাতিক আন্ডারগ্রাউন্ড অপরাধ চক্র কবাল সক্রিয় নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিগত ৫ বছরে গোটা ইউরোপে ৩৩ টি মূল্যবান শিল্পকর্ম, আর্ট এফেক্ট এবং ১২০০ গুপ্ত সরকারি গোপন নথি (এপিস্টেইন ফাইল-সহ, যেটা আচমকা ফাঁস হয়) চুরি হয়েছে। ১৪টি ছোট রাষ্ট্রে বিoোহ ও সরকার পরিবর্তন হয়েছে। ফলে গোয়েন্দাদের মতে কাবাল আজও সক্রিয়। ডার্ক ওয়েভের মাধ্যমে ব্যবসা করছে বিশ্বজুড়ে। একইসঙ্গে ব্ল্যাক মার্কেটে টাকা ঢুকিয়ে কৃত্রিমভাবে শেয়ার তুলে,মুনাফা লুটে আবার ফেলে দেওয়ার কাজ করছে। ড্রাগ, অস্ত্র এবং নারী ব্যবসা বরং ছোট দল কাজ করছে।





