৩৬৫ দিন। পরিচালক বিধু বিনোদ চোপড়া, তার নতুন বিগ বাজেটের ছবির জন্য, সেই সময়ের সুপারহিট জুটি অনিল কাপুর এবং মাধুরী দীক্ষিতকে বেছে নিয়েছিলেন। সঙ্গে সেই সময়ের আরেক সুপারহিরো জ্যাকি শ্রফ। অন্য গুরুত্বপুর্ন চরিত্রের জন্য নির্বাচিত হয়েই ছিলেন অনুপম খের। প্রযোজক বনি কাপুর এই ছবির জন্য খলনায়ক চরিত্রে আগে থেকেই নির্বাচন করে রেখেছিলেন শক্তি কাপুরকে। কিন্তু বিধু বিনোদের না পসন্ন্দ। বিধু চাইছিলেন এমন একজন খলনায়ক যিনি ছবির বাকি মুখ্য চরিত্রদের সমবয়সী হবে,এবং একই সঙ্গে এই ছবির সমান্তরাল মুখ্য চরিত্র। অনিল কাপুর নানা পাটেগারের নাম প্রস্তাব করেন। বলেন হলে গিয়ে মারাঠি ছবি গিধর দেখে আসুন। ওম পুরি স্মিতা পাতিল এবং নানা পাটেকার অভিনীত ছবিটি দেখে মুগ্ধ হয়ে যান পরিচালক। বিন্দুমাত্র চিন্তা না করে নানাকে নির্বাচন করেন। পরিন্দা মুক্তি পেল। আন্না চরিত্রটা ইতিহাস হয়ে গেল। একটি জাতীয় পুরস্কারের মঞ্চে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং অনিল কাপুরকে বলেছিলেন, আমি পরিন্দা ছবিটা তিনবার দেখেছি। কিন্তু আপনার জন্য নয়, আন্না চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছেন তার জন্য।
মৌলিক অভিনয় শৈলী, ম্যানারিজম সংলাপ বলার ধরন, এবং বডি ল্যাঙ্গুয়েজে নানা পাটেকর হিন্দি ছবিতে এক স্বতন্ত্র ধারা প্রতিষ্ঠা করলেন। সুপারহিরো না হয়েও, তার ফ্যান ফলোয়ার কারুর থেকে কম ছিল না। সংলাপ বলার বিশেষ ধরনের জন্য হিন্দি ছবির বিশেষ বিশেষ চরিত্রগুলোয়, নানাকে ব্যবহার করার একটা ট্রেন শুরু হয়ে গেল পরিচালকদের মধ্যে। অঙ্গার, রাজু বান গেয়া জেন্টলম্যান, ক্রান্তিবীর, যশবন্ত, প্রহার, তিরঙ্গা, অগ্নিসাক্ষী, শাগরিদ, অপহরণ, অব তক ছাপ্পান, চলতেই থাকে নানাকে ব্যতিক্রমীভাবে ব্যবহারের প্রচেষ্টা।
এক মচ্ছর আদমি কো
হিজড়া বানা দে তা হ্যায়
৯ দশকের মাঝামাঝি যশবন্ত ছবিতে নানা পাটেকরের মুখে এই সংলাপ, সিনেমা প্রেমী দর্শকদের মুখে মুখে ঘুরত। মুম্বাই চলচ্চিত্র জগত, পরিন্দার আন্নাকে বারবার বিভিন্নভাবে ব্যবহার করে , সফলতা পেয়েছে। তার স্বতন্ত্র অভিনয়ের দক্ষতাকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করেছে হিন্দি চলচ্চিত্র। মারাঠি নাট্যমঞ্চের দাপুটে অভিনেতা, তিন তিনটে জাতীয় পুরস্কার ও একাধিক ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পকেটে পুরেও, বাণিজ্যিক ছবির চাহিদার কাছে নিজের প্রতিষ্ঠিত ম্যানারিজম বারংবার একইভাবে ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
তৃষাগ্নি, শিনশান, গমন ,সালাম বম্বে, থোরা সা রোমানি হো যায়ে, নট সম্রাটের অভিনেতাকে করতে হলো আজ কি আওয়াজ, ফাঁসি কি ফান্দা, আন্ধা যুদ্ধ, যুগপুরুষ,আজ কি আওয়াজের মত ছবি। প্রিয় বন্ধু অনিল কাপুরকে আফসোস করে বলতেন, মুম্বাইয়ের পরিচালকরা আমাকে সারা জীবন প্রোটোটাইপ অভিনয়ের একঘেয়েমিতে ফেলে দিল। মাঝে মাঝে মনটোনাস লাগে। মনে হয় একই ছবি বারবার করছি। এই আফসোস নানা পাটেকারের ছিল। অনিল কাপুর ও ব্যক্তিগতভাবে মনে করতেন, সঠিকভাবে নানা পাটেকারকে ব্যবহার করা হয়নি। তার প্রমাণ আমরা নানা পাটেকারের পরের দিকের ছবিতে পাই, যেখানে তিনি বারবার নিজের প্রতিষ্ঠিত চরিত্রকে, ভেঙে বেরিয়ে এসেছেন। হু তু তু, রাজনীতি, ২৬/১১মুম্বই অ্যাটাক, ট্যাক্সি নম্বর ৯২১১, হ্যাটট্রিক, দশ কাহানিয়া, ডো না মানা হে, ওয়েলকাম এর মত ছবিতে ভিন্নধর্মী অভিনয়, নিজের প্রতিষ্ঠিত অডি ল্যাঙ্গুয়েজ এবং ম্যানারিজম ছুড়ে ফেলে, এক নতুন প্রচেষ্টায় দুর্দান্ত সফল হলেন নানা পাটেকার।
হিন্দি চলচ্চিত্র জগত
থেকে দূরে
২০১৩/১৪ সাল থেকে নানা পাটেকার একটু একটু করে নিজেকে মুম্বাই ইন্ডাস্ট্রি থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখছিলেন। ঘনিষ্ঠ মহলে তিনি জানিয়েছিলেন, অনিল এবং তিনি মুম্বাই চলচ্চিত্রের মানসিকতার পরিবর্তনে ব্যথিত। গোয়াতে নিজের ফার্ম হাউসে বেশিরভাগ সময় কাটাতেন। আর বাকিটা গোটা মহারাষ্ট্রের খরাপ্রবন অঞ্চল জুড়ে, সারা বছর কাজ করতেন। নিজের সঞ্চিত অর্থের একটা বড় অংশ, তার ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে এই সামাজিক কাজে ব্যয় করতেন। তার দীর্ঘ সময়ের নাট্য বন্ধু মকরন্দ দেশপাণ্ডেকে সঙ্গে নিয়ে, চষে বেরিয়েছেন মহারাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলের খরা প্রবণ এলাকা। স্বাধীনতার এত বছর পরেও, জলের অভাবে কৃষকদের দুরবস্থা এবং আত্মহত্যার ঘটনা বেড়ে চলায়, তিনি নিজে উদ্যোগ নিয়ে ১৫২ টি গ্রামে পাম্প মেশিন বসানোর কাজ শুরু করেছিলেন। একইসঙ্গে ৩২ টি গ্রামে বৃষ্টি ও নানান প্রাকৃতিক জল সঞ্চয় করে করার সময় সেগুলো ব্যবহারের পদ্ধতি চালু করেছিলেন। মহারাষ্ট্র প্রশাসন এবং মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফরনবিশ তাকে পুরস্কৃত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। এর আগেও অভিনয় থেকে উপার্জিত অর্থ তিনি বিহারে বন্যা কবলিত এলাকায় সামাজিক কাজের জন্য ব্যয় করেছিলেন।
বিতর্ক তাকে দমাতে পারেনি
২০১৮ সালে মুম্বইতে অভিনেতা ও শিল্পীদের উদ্যোগে, আচ্ছে দিন ক্যাম্পেইনে তাকে আমন্ত্রণ করা হলে, তিনি যোগ দিতে অস্বীকার করেন। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, পাকিস্তানের সঙ্গে কম্পিটিশন করে এই অচ্ছে হওয়ার কোন মানে নেই, হ্যাঁ লাস্ট বয়দের সঙ্গে আবার তুলনা কিসের? জাপানকে দেখুন, তাদের সঙ্গে তুলনা করুন। এতে সোশ্যাল মিডিয়ার একাংশ তীব্রভাবে নানাকে রাজনৈতিক আক্রমণ শুরু করে একই সঙ্গে তাকে দেশদ্রোহী বলা হয়। এরপরেই এক অভিনেত্রী মি টু আন্দোলনের উদ্যোগে তার নামে শ্লীলতাহানির অভিযোগ তোলে। নানা পাটেকার সর্বভারতীয় একটি মিডিয়াতে পরিষ্কার বলেন, দেশপ্রেম কারুর কাছ থেকে শিখব না। কাউকে প্রমাণ দিতে চাই না। কিন্তু কারগিল যুদ্ধের সময় ৬২ দিন দ্রাসে সৈনিকদের সঙ্গে এ কে ৪৭ নিয়ে লড়াই করেছি। প্রসঙ্গত যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠার খবর শুনে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জর্জ ফার্নান্দেজের সঙ্গে যোগাযোগ করেন নানা। যুদ্ধের এলাকায় সৈনিকদের সঙ্গে থাকতে ইচ্ছেপোষণ করেন তিনি। তিনি কমান্ডো ট্রেনিং নিয়েছিলেন, এমনকি আগ্নেয়াস্ত্র ও রাইফেল শুটিংয়ে তার জাতীয় পর্যায়ের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এসব জেনে তাকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।দ্রাস, লেহ, কুপওয়ারা, বারামুল্লা ও সোপুরে জায়গাগুলো মিলিয়ে প্রায় ৬০ দিন তিনি আর্মি সৈনিকদের সঙ্গে ছিলেন। এমনকি যুদ্ধের সময় তিনি কুইক রিঅ্যাকশন টিম এর অংশও হয়েছিলেন। তিনি বিতর্ককে পাত্তা দেননি। রাজনীতি এবং মুম্বাইয়ের ইন্ডাস্ট্রির পলিটিক্স থেকে দূরে থাকতে চেয়েছেন। পরিবর্তে কাজও অনেক কম পেয়েছেন বিগত ১৫ বছরে। তাতে নানা পাটেকারের কিছু এসে যায়নি, তিনি তার মতোই ছিলেন শেষ দিন পর্যন্ত।
পরনে সাদা কুর্তা, সাদা উত্তরীয়। কপালে কেশরী তিলক।চার দিন আগে ৪ অক্টোবর রবিবার গোয়া পর্যটন দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সম্রাট ক্লাব ইন্টারন্যাশনাল এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন নানা পাটেকর। তিনি বলেন, আমি জানি না, আগামিকাল বেঁচে থাকব কি না।অন্তিম লগ্নে পৌঁছনোর আগে নিজেকেই প্রশ্ন করতে হবে- আমি কি সেই কাজগুলো করতে পেরেছি, যেগুলো আমি করতে চাই? যেন এক অদ্ভূত সমাপতন! তার চলে যাওয়ার মধ্যেও রেখে গেলেন নানা সুলভ নাটকীয়তা।
নানা পাটেকার আফসোস ছিল,মুম্বই তাকে একই ভাবে বারবার ব্যবহার করেছে
- khabar365din
- October 8, 2026
- 5:03 pm
- No Comments




