মানুষ-বন্যপ্রাণ সংঘাত কমানোর লক্ষ্যে প্রযুক্তির ব্যবহারেও জোর দেওয়া হচ্ছে,বসছে এআই এবং জিএসএম-সক্ষম ক্যামেরা
৩৬৫ দিন।ভারতের অন্যতম প্রতীক—বাঘ। তার শক্তি, সৌন্দর্য, স্বাতন্ত্র্য এবং বন্যতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এ বার বিশেষ উদ্যোগ সিকো ইন্ডিয়ার। ভারতের বন্যপ্রাণ ও প্রকৃতি সংরক্ষণের ভাবনাকে সামনে রেখে ‘সিকো প্রসপেক্স’ সংগ্রহে যুক্ত হল একটি বিশেষ সীমিত সংস্করণের টাইমপিস। বেঙ্গালুরুতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ঘড়িটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। মাত্র ১,০০০টি ঘড়ি তৈরি করা হয়েছে এই বিশেষ সংস্করণে। এই ঘড়ির দাম রাখা হয়েছে প্রায় ১ লক্ষ ৭ হাজার টাকা।মোট ১০ কোটি টাকার ঘড়ি বাজারে এনেছে সিকো।ঘড়িটির মডেল নম্বর
এইচবিবি০০৫কে১।
বাঘের গায়ের রং-নকশাতেই অনুপ্রেরণা
নতুন এই ঘড়ির নকশায় সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ছে তার গাঢ় অ্যাম্বার রঙের ডায়াল। ভারতীয় বাঘের গায়ের সমৃদ্ধ রং এবং ডোরাকাটা চেহারা থেকেই নেওয়া হয়েছে নকশার মূল অনুপ্রেরণা। ডায়ালের রং ও গঠনে রয়েছে বাঘের গায়ের আবরণ বা লোমের মতো টেক্সচারের ছাপ। ফলে ঘড়িটি শুধু সময় দেখার যন্ত্র নয়, বরং ভারতীয় বন্যপ্রকৃতির একটি প্রতীকী উপস্থাপনও হয়ে উঠেছে।সিকোর প্রসপেক্স সংগ্রহের পরিচিত যান্ত্রিক ঘড়ি তৈরির ঐতিহ্যের সঙ্গে বাঘের এই রুক্ষ অথচ আকর্ষণীয় চরিত্রকে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘড়িটির সঙ্গে দেওয়া হচ্ছে একটি অতিরিক্ত কালো সিলিকন স্ট্র্যাপ। অর্থাৎ ব্যবহারকারীর প্রয়োজন ও পছন্দ অনুযায়ী ঘড়িটির চেহারায়ও বদল আনা যাবে।
প্যাকেজিংয়েও বাঘের ছাপ
শুধু ঘড়ির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি বাঘের উপস্থিতি। বিশেষ সংস্করণের প্যাকেজিংয়েও রয়েছে বাঘের ডোরাকাটা নকশা। বিশেষ বাক্সের ভিতরে রাখা হয়েছে ঘড়িটি এবং অতিরিক্ত স্ট্র্যাপ। পুরো প্যাকেজিংয়ের নকশায় বন্যপ্রকৃতির আবহকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ফলে সংগ্রাহকদের কাছেও এই বিশেষ সংস্করণটি আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।এই উদ্যোগের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী আরজু খুরানা-র কাজও। দেশের সমস্ত ৫৮টি টাইগার রিজ়ার্ভে গিয়ে বাঘের ছবি তুলেছেন তিনি। অনুষ্ঠানে তাঁর তোলা বন্যপ্রাণের ছবির একটি বিশেষ প্রদর্শনীরও আয়োজন করা হয়েছিল। সেই প্রদর্শনীর মাধ্যমে ভারতের জঙ্গলে বাঘের জীবন, তার বাসস্থান এবং সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি সামনে আনা হয়।
ঘড়ির নকশায় প্রকৃতি সংরক্ষণের বার্তা
অনুষ্ঠানে সিকো ইন্ডিয়ার প্রেসিডেন্ট এবং সিওও নীলাদ্রি মজুমদার জানান, ভারতের বাঘের সঙ্গে মানুষের এক বিশেষ আবেগের সম্পর্ক রয়েছে। সেই কারণেই এই বিশেষ সংস্করণের মাধ্যমে বাঘকে সম্মান জানানোর উদ্যোগ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সিকোর কারিগরি ঐতিহ্য এবং দেশের অন্যতম মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ বাঘ-এই দুইয়ের মেলবন্ধনই নতুন ঘড়িটির মূল ভাবনা।শুধু নকশা বা বিপণনের মধ্যেই অবশ্য সীমাবদ্ধ থাকছে না সিকোর উদ্যোগ। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার-ইন্ডিয়া (ডব্লিউডব্লিউএফ-ইন্ডিয়া)-র সঙ্গে যুক্ত হয়ে সুন্দরবনে বাঘ সংরক্ষণের কাজেও অবদান রাখছে সংস্থা।
সুন্দরবনে প্রযুক্তির সাহায্যে নজরদারি
সুন্দরবনের বাঘের আবাসস্থল রক্ষা এবং মানুষ-বন্যপ্রাণ সংঘাত কমানোর লক্ষ্যে প্রযুক্তির ব্যবহারেও জোর দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য এআই এবং জিএসএম-সক্ষম ক্যামেরা বসানো এবং সৌরশক্তিচালিত পথবাতি স্থাপনের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাঘের আবাসস্থল সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণের সংঘাত কমাতেও এই প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
সিকো ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভারতীয় বাঘের আবাসস্থল রক্ষা এবং বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের বিষয়ে তাদের দায়বদ্ধতা ভবিষ্যতেও বজায় থাকবে। ফলে নতুন এই ঘড়িকে শুধু একটি বিলাসবহুল সময়নির্ণায়ক হিসেবে নয়, সংরক্ষণের বার্তা বহনকারী একটি বিশেষ সংস্করণ হিসেবেও তুলে ধরা হচ্ছে।কারণ সুন্দরবনে বাঘের হামলায় বাড়ছে প্রাণহানি।সেখানে বাঘের আক্রমণে মৎস্যজীবী, কাঁকড়া সংগ্রহকারী ও মৌয়ালদের প্রাণহানি নতুন নয়। ঐতিহাসিক নথি এবং আধুনিক বিভিন্ন গবেষণার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারত ও বাংলাদেশের সুন্দরবন মিলিয়ে প্রতি বছর গড়ে ১৫ থেকে ১০০ জন মানুষ বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারান। তবে ব্রিটিশ আমলে সুন্দরবনে বাঘের হামলায় মৃত্যুর সংখ্যা বর্তমানের তুলনায় অনেক বেশি ছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথি ও পরিসংখ্যানে উল্লেখ রয়েছে।জীবিকার তাগিদে সুন্দরবনের গহিন জঙ্গলে প্রবেশ করতে হয় বহু মৎস্যজীবী, কাঁকড়া সংগ্রহকারী এবং মৌয়ালকে। নদী-খাঁড়ি পেরিয়ে মাছ ও কাঁকড়া ধরতে গিয়ে কিংবা মধু সংগ্রহের সময় আচমকাই বাঘের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। জঙ্গলের ঘনত্ব, নদী-খাঁড়ির বিস্তীর্ণ এলাকা এবং বাঘের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্রের কারণে এই সংঘাত পুরোপুরি এড়ানোও কঠিন।
২০২৬ সালেও সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় বাঘের হামলায় একাধিক প্রাণহানির খবর সামনে এসেছে। কুলতলি, সজনেখালি-সহ বিভিন্ন জঙ্গল লাগোয়া এলাকায় মাছ বা কাঁকড়া ধরতে গিয়ে বাঘের হামলার শিকার হয়েছেন স্থানীয় মানুষ। ফলে বাঘ সংরক্ষণের পাশাপাশি জঙ্গলের উপর নির্ভরশীল মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
ঘড়ি সংগ্রাহকদের জন্য সীমিত সুযোগ
প্রসপেক্স সিরিজের রুক্ষ ও অভিযাত্রিক চরিত্রের সঙ্গে বাঘের প্রতীকী উপস্থিতি মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এই বিশেষ টাইমপিস। এক দিকে যান্ত্রিক ঘড়ি তৈরিতে সিকোর দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, অন্য দিকে ভারতীয় বন্যপ্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা-দুইয়ের সংযোগই এই সংস্করণের বিশেষত্ব।





