অগ্নিকন্যাদের ইতিহাস
এশিয়াডে চিনকে হারিয়ে সোনা জয় হকির মেয়েদের

ভারত – ১
চিন – ০

৩৬৫ দিন। রোহন রায় চৌধুরী। জাপানের মাটিতে ভারত উদয়। গান্ধী জয়ন্তীর বিকেলে ভারতের তেরঙ্গা উড়ল জাপানের মাটিতে। ভারতের মহিলা হকি দল প্রবল প্রতিপক্ষ চিনকে হারিয়ে নতুন ইতিহাস তৈরি করল। টোকিও অলিম্পিকে এই জাপানের মাটিতেই মেয়েদের ব্রোঞ্জ পদক হাতছাড়া হয়েছিল গ্রেট ব্রিটেনের কাছে হেরে গিয়ে। এবার এশিয়ান গেমসে সোনা জিতে পরবর্তী অলিম্পিকের টিকিট আদায় করে নিল দীপিকা, সালিমা, নবনিতরা। দেখতে গেলে গত দেড় বছরে ভারতের মেয়েরা অনেক উন্নতি করেছে। ফিরে এসেছেন পুরনো ডাচ কোচ সোর্ড মারিন। তবে মাথায় রাখতে হবে চিনের মহিলা হকি দল কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মেয়েদের হকিতে অন্যতম সেরা।
এই মাঝের ৪৪ বছরে একাধিকবার ফাইনালে উঠেও হতাশা নিয়ে ফিরতে হয়েছিল। কিন্তু শুক্রবার জাপানের কাকামিগাহারার অ্যাস্ট্রোটার্ফে সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটালেন সালিমা তেতে, সবিতা পুনিয়া ও লালরেমসিয়ামিরা। এশিয়ান গেমস ২০২৬-এর হাই-ভোল্টেজ মেগা ফাইনালে শক্তিশালী চিনকে ১-০ গোলের ব্যবধানে পরাস্ত করে চার দশকের খরা কাটিয়ে স্বর্ণপদক ছিনিয়ে নিল ভারতের মহিলা হকি দল।এই মেগা ফাইনালের শুরু থেকেই বল পজেশন ও আক্রমণে চাপ বজায় রেখেছিল চিন। কিন্তু খেলার গতির বিপরীতেই ম্যাচের দশম মিনিটে আসে সেই জাদুকরী মুহূর্ত। জাতীয় দলের জার্সিতে নিজের ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নামা ২৬ বছর বয়সি তারকা লালরেমসিয়ামি মাঝমাঠে বল কেড়ে নিয়ে একাই চিনের ডি-বক্সে ঢুকে পড়েন। বাঁ প্রান্ত থেকে নেওয়া তাঁর নিখুঁত তীব্র স্ট্রাইক সরাসরি চিনের জালে জড়িয়ে ভারতকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেয়। মিজোরামের এই তারকা হকি খেলোয়াড়ের শটে এতটাই জোর ছিল চিনের গোলরক্ষক নড়ার সময় পর্যন্ত পাননি। সোনা জয়ের রাস্তা মোটেই সহজ ছিল না। পিছিয়ে পড়ে ভারত বক্সে মুহুর্মুহু আক্রমণ শানাতে শুরু করে চিন। দ্বিতীয় কোয়ার্টারের চতুর্থ মিনিটে পেনাল্টি কর্নার থেকে গোললাইন ক্লিয়ার করে ভারতকে নিশ্চিত বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচান নবনীত কৌর। এর কয়েক মিনিট পরেই চরম নাটকের সৃষ্টি হয়—বক্সে ফাউলের জেরে চিনের পক্ষে পেনাল্টি স্ট্রোক দেন আম্পায়ার। কিন্তু ভারতের সামনে তখন প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন দেশের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক সবিতা পুনিয়া। চিনের ঝাং ইংয়ের নেওয়া স্পট-শট নির্ভুল অনুমানে বাঁ দিকে ডাইভ দিয়ে আটকে দেন সবিতা, যা ফাইনালের ভাগ্য গড়ে দেয়।
তৃতীয় কোয়ার্টারে পেনাল্টি স্ট্রোকের আবেদন উঠলেও ভারতের সফল ভিডিয়ো রেফারালের পর তা পেনাল্টি কর্নারে রূপান্তরিত হয়। সেই পেনাল্টি কর্নারটি শরীর ছুড়ে দিয়ে অসাধারণ ক্ষিপ্রতায় ব্লক করেন অধিনায়ক সালিমা তেতে। ম্যাচের একটা মুহূর্তে বল লেগে সেলিমার হাত থেকে রক্ত ঝরে। তবুও লড়াই থেকে পিছিয়ে আসেননি তিনি। এই ঘটনাগুলোই বুঝিয়ে দিচ্ছিল ভারতের মেয়েরা গোল না খাওয়ার প্রতিজ্ঞা নিয়ে নেমেছে। জীবন বাজি রাখতেও তারা পরোয়া করেনি আজ। চিন দেখতে পেল আজ ভারতীয় মেয়েদের ডিফেন্স যেন চিনের প্রাচীর হয়ে গিয়েছে। গুলি চালালেও যেন সেটা ভাঙার উপায় নেই। শেষ পর্যন্ত ভারতের মেয়েদের লড়াই সফল হল। চতুর্থ কোয়ার্টারের শেষে যখন রেফারি ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজালেন গোটা স্টেডিয়াম উঠে হাততালি দিয়ে অভিবাদন জানাল ভারতের মেয়েদের। রিল লাইফের চক দে ইন্ডিয়া যেন ফিরে এল রিয়েল লাইফে। সিনেমায় শাহরুখ খান ছিলেন কোচ কবির খান। আর এই দলটায় কবির খানের ভূমিকায় মারিন।

Scroll to Top