৩৬৫ দিন। সায়ান্তী অধিকারী। হতে পারে শতবর্ষও। কিন্তু উত্তম কুমার যেন চিরনতুন। বাঙালির হৃদয়ে তাঁর জনপ্রিয়তা আজও অমলিন। মহানায়কের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে তাই বাংলা জুড়ে চলছে নানা অনুষ্ঠান, প্রদর্শনী ও স্মরণ-আয়োজন। সেই আবহেই কলকাতা সেন্টার ফর ক্রিয়েটিভিটিতে (কেসিসি) শুরু হল গুরু-আ সেন্টিনারি এগজিবিশন। তৃণাঙ্কুর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কিউরেশনে এই প্রদর্শনীতে উঠে এসেছে উত্তমকুমারের চলচ্চিত্রজীবন, ব্যক্তিজীবন এবং তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বহু অমূল্য স্মারক।কলকাতা কথকতা গোষ্ঠীর সাত সদস্যের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে বেছে নেওয়া হয়েছে প্রদর্শনীর উপকরণ। মহানায়কের জীবনের এমন কিছু মুহূর্ত ও স্মারক এখানে স্থান পেয়েছে, যা সাধারণ দর্শকের চোখে সচরাচর পড়ে না। গৌরীদেবীর সঙ্গে পারিবারিক মুহূর্ত, বেড়াতে গিয়ে ঘোড়ায় চড়া কিংবা সাঁতার কাটার আলোকচিত্র-সব মিলিয়ে পর্দার মহানায়কের আড়ালে থাকা মানুষটিকেও যেন নতুন করে আবিষ্কার করার সুযোগ মিলছে।
আজকের ডিজিটাল সময়ে দাঁড়িয়ে বায়স্কোপের এই অভিজ্ঞতা তাই আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কয়েক মুহূর্তের জন্য মোবাইলের পর্দা সরিয়ে চোখ রাখতে হবে অন্য এক যন্ত্রে। আর সেই ছোট্ট পরিসরের মধ্যেই খুলে যাবে উত্তমকুমারের সিনেমার জগত। পুরনো গান, পুরনো ছবি এবং স্মৃতির আবহ মিলিয়ে তৈরি হবে এক অন্যরকম নস্টালজিয়া।
বায়স্কোপে ফিরবে ষাট-সত্তরের দশক
প্রদর্শনীতে ঢুকলেই নজর কাড়ছে একটি বায়স্কোপ। চোখ রাখলেই যেন সময়ের দরজা খুলে যাচ্ছে। দর্শক ফিরে যাচ্ছেন ১৯৬০-৭০-এর দশকে। উত্তমকুমার অভিনীত বিভিন্ন ছবির গান সেখানে একের পর এক বাজছে। ‘নীড় ছোট ক্ষতি নেই, আকাশ তো বড়’ থেকে ‘পৃথিবী বদলে গেছে’—গানের সুরে ফিরে আসছে বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগ।
মাত্র ৫৫ টাকা দিয়েই এই বিশেষ অভিজ্ঞতার অংশ হওয়া যাবে। আর্ট অলিন্দ-এর উদ্যোগে তৈরি এই বায়স্কোপ দর্শকদের কাছে নিছক প্রদর্শনীর অংশ নয়,বরং অতীতে ফিরে যাওয়ার এক অভিনব পথ।

পোশাক থেকে কাপ-প্লেট, চেয়ারও বলবে উত্তমের গল্প
শুধু ছবি নয়, প্রদর্শনীতে রয়েছে উত্তমকুমারের ব্যবহৃত নানা সামগ্রী। তাঁর পোশাক, কাপ-প্লেট থেকে শুরু করে সেই চেয়ারটিও রাখা হয়েছে, যেখানে বসতেন মহানায়ক। রয়েছে রাইফেল, ইস্ত্রী, মরচেতীর হিল্লাজ-সহ নানা স্মারক। প্রতিটি বস্তুই যেন তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবন এবং ব্যক্তিগত পরিসরের এক একটি গল্প বলে। চলচ্চিত্রের স্মৃতিও এই প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ।চিড়িয়াখানা’ ‘সংসারী’, ‘রাইফেল’-সহ একাধিক ছবির পোস্টার ও নথি রয়েছে সেখানে। ‘চিরদিনের ছবি’-র হাতে আঁকা নিবি কার্ড, ‘লুনার ক্লাব’ ও ‘শিল্পী সংসদ’-এর পত্রিকা, ‘উত্তমকুমার ফিল্মস প্রাইভেট লিমিটেড’-এর শেয়ার সার্টিফিকেট—সব মিলিয়ে সংগ্রহটি যেন উত্তম-জীবনের এক বিস্তৃত দলিল।
চলচ্চিত্রের বিজ্ঞাপন-প্রচারে ব্যবহৃত গ্রাম প্যানেলের নিদর্শনও রয়েছে প্রদর্শনীতে। ফলে উত্তমকুমারের অভিনয়জীবনের পাশাপাশি সেই সময়ের চলচ্চিত্র-সংস্কৃতি ও প্রচারের ধরনও দর্শকের সামনে উঠে আসছে।
শুধু প্রদর্শনী নয়, সন্ধ্যাগুলিও উত্তমময়
‘গুরু’ শুধুমাত্র একটি প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ থাকছে না। মহানায়কের স্মৃতি, বাঙালির নিজস্ব ‘সুপারস্টার’ হয়ে ওঠার ইতিহাস এবং তাঁর সুরের জগৎকে ঘিরে সাজানো হয়েছে একগুচ্ছ অনুষ্ঠান।উদ্বোধনী দিনেই ছিল তারকাখচিত আয়োজন।আলোচনায় অংশ নেবেন অপর্ণা সেন, অঞ্জন দত্ত, সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় ও অরুণাভ খাসনবিশ। এরপর থাকবে বিশেষ উপস্থাপনা ‘সর্বোত্তম’। রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় হবে নায়ক-এর নাট্য-পাঠ। ২৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় উত্তম-চলচ্চিত্র নিয়ে কথালাপে থাকবেন দেবজ্যোতি মিশ্র ও অন্যান্য গুণী শিল্পী।
নায়ক থেকে বিচারক কুইজ থেকে দাস্তান
অনুষ্ঠানসূচিতে রয়েছে সত্যজিৎ রায়ের নায়ক এবং বিচারক প্রদর্শনও। নায়ক দেখানো হবে ২৬ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫টায় এবং বিচারক ৮ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টা থেকে। ৯ অক্টোবর সন্ধ্যায় প্রকাশিত হবে জন্মশতবর্ষের স্মারকগ্রন্থ উত্তমকুমার-আ লাইফ ইন সিনেমা।এরপর আলোচনায় থাকবেন মেনাক বিশ্বাস, সামনেদেব চৌধুরী-সহ বিশিষ্টজনেরা। তরুণ প্রজন্মের গুরু জ্ঞান যাচাই করতে থাকছে কুইজ। প্রাচীন কথকতার ঘরানায় পরিবেশিত হবে দ্য দাস্তান অব উত্তমকুমার।স্মার্ট আর্টে ফুটে উঠবে মহানায়কের নানা রূপকল্প।
১১ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে উৎসব
প্রদর্শনী চলবে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত দর্শকের জন্য খোলা থাকবে দরজা। শেষ সন্ধ্যায় আর্টিস্টস ফোরাম এর শিল্পীদের নিবেদনে উত্তমকুমারের ছবির চিত্রসমৃদ্ধ গানের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এই বিশেষ আয়োজন।শতবর্ষ পেরিয়েও যে মানুষটি বাঙালির স্মৃতি, আবেগ এবং সংস্কৃতিতে একই রকম উজ্জ্বল ‘গুরু’ তাই কেবল একটি প্রদর্শনী নয়। এটি উত্তমকুমারকে নতুন প্রজন্মের কাছে ফের আবিষ্কার করার, আর পুরনো প্রজন্মকে স্মৃতির সরণিতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার এক অনন্য প্রয়াস।
অদেখা পোস্টার-বুকলেটের বিপুল সম্ভার
প্রদর্শনীতে রয়েছে উত্তমকুমারের সিনেমার বহু অদেখা পোস্টার ও বুকলেট। সংখ্যায় যা শতাধিক। ফলে শুধু উত্তম-অনুরাগীরাই নন, বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস নিয়ে আগ্রহী গবেষক ও সংগ্রাহকদের কাছেও এই প্রদর্শনী হয়ে উঠতে পারে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র।একটি পোস্টার বা বুকলেটের মধ্যেও লুকিয়ে থাকে একটি সময়ের গল্প। কোন ছবিকে কীভাবে দর্শকের সামনে তুলে ধরা হত, নায়কের জনপ্রিয়তাকে কীভাবে ব্যবহার করা হত, কিংবা একটি ছবির প্রচারের ভাষা কেমন ছিল-এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তরও খুঁজে নেওয়া যায় এই উপকরণগুলির মধ্যে।
একটি প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে উত্তম-স্মৃতি
উত্তমকুমারের জনপ্রিয়তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ সম্ভবত এটাই-তাঁকে ঘিরে নস্টালজিয়া শুধু তাঁর সমসাময়িকদের মধ্যে আটকে নেই। পরবর্তী প্রজন্মও তাঁর সিনেমা দেখে, তাঁর গান শোনে, তাঁর সংলাপ মনে রাখে। জন্মশতবর্ষের এই আয়োজন তাই এক অর্থে সেই উত্তরাধিকারকেই উদ্যাপন করছে। 


