অভিষেকের জন্মদিনের রাতেই রণক্ষেত্র কালীঘাট

৩৬৫ দিন। অভিষেক জন্মদিন উদযাপনকে কেন্দ্র করে শুক্রবার গভীর রাতে রণক্ষেত্রের চেহারা নিল কালীঘাটের পটুয়াপাড়া। অভিষেকের বাড়ির সামনে দফায় দফায় বিজেপি-তৃণমূল সংঘর্ষ চলল, ঝড়লো রক্ত। অশান্তির রেশ রাত গড়িয়ে চলল শনিবার বিকেল পর্যন্ত। অভিষেকের বাড়ির সামনে অশান্তির প্রতিবাদে পথে নামলেন মমতা। অভিষেকের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে বিজেপি ও পুলিশকে একসারিতে রেখে আক্রমণ করে মমতা বললেন, কেস দিচ্ছেন দিন কিন্তু ফেস করতে হবে। মমতার চ্যালেঞ্জ, আসুন, আমার ওপর দিয়ে বুলডোজার চালিয়ে দিন, পুলিশকে সতর্ক করলেন জনরোষ নিয়ে। পাল্টা মমতা অভিষেককে ঠুকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু হুঁশিয়ারীর সুরে জানিয়ে দিলেন, পুলিশের গায়ে হাত দিলে বা তাদের রক্ত ঝরলে লম্বা সময়ের জন্য জেলে যেতে হবে। শুভেন্দুর কথায়, ‘পুলিশকে খোলা ছাড় দিয়ে দিয়েছি’। সব মিলিয়ে কালীপুজোর আগে উত্তেজনা চড়লো ভবানীপুরে‌।
হ্যাপি বার্থ ডে’ বনাম চোর স্লোগান
শুক্রবার তখন মধ্যরাত। অভিষেকের জন্মদিন উপলক্ষ্যে তাঁর ভবানীপুরের বাড়ির সামনে জড়ো হয়েছিলেন কর্মী সমর্থক অনুরাগীরা। রাস্তার একাংশ ঘিরে সেখানে দাঁড়িয়েছিলেন তারা। কেক কাটার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল।‌ এই সময় এলাকায় বিজেপি কর্মী বলে পরিচিত কয়েকজন সেখানে চলে আসেন। তারা রাস্তা ঘিরে জন্মদিন পালনে আপত্তি জানান। তাদের দাবি, এতে সাধারণ মানুষের অসুবিধা হচ্ছে। মন্ডপে কালী প্রতিমা আসছে। সেখানেও সমস্যা হচ্ছে। এই নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে প্রাথমিক বচসা শুরু হয়। এর মধ্যেই অভিষেকের কেক কাটা পর্ব চলতে থাকে। হ্যাপি বার্থ ডে আওয়াজ উঠতেই অভিযোগ বিজেপি কর্মীরা পাল্টা চোর চোর স্লোগান দিতে শুরু করে। অভিষেকের ছবি লাগানো পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা হয়। পাল্টা তৃণমূলকর্মীরাও তেড়ে যান। রাস্তার ওপরেই দুপক্ষের মধ্যে খন্ডযুদ্ধ বেঁধে যায়। একে অপরকে লক্ষ্য করে ইঁট বৃষ্টি শুরু হয়। দুপক্ষের অন্তত ৭ জনের মাথায় হাতে আঘাত লাগে। কালীঘাট ও ভবানীপুর থানা থেকে বিশাল বাহিনী গিয়ে লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
রাতভর ধর্নায় অভিষেক, লোকসভার স্পীকারকে ট্যাগ করে লিখলেন, হত্যার চক্রান্ত চলছে
কিন্তু অভিষেক অভিযোগ করতে থাকেন পুলিশ হামলাকারীদের ছেড়ে দিয়ে তাদের কর্মীদের মারধর করেছে। এর প্রতিবাদে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে বাড়ির সামনে ধর্নায় বসে পড়েন তিনি। পুলিশ অফিসারদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয় তাঁর। অভিষেককে পুলিশ অফিসারকদের তর্জনি উঁচিয়ে বলেন, ‘আমাকে বাড়ির বাইরে আসত হল কারণ আপনারা সঠিক ভাবে দায়িত্ব পালন করছেন না। বিজেপির কথায় এমন কাজ করবেন না যাতে চাকরি নিয়ে টানাটানি না হয়। ১৫-২০ বছর এখনো তো চাকরি আছে। ফাঁসবেন তো আপনি।’ শনিবার ভোর পর্যন্ত চলে অভিষেকের ধর্না। ততক্ষণে অবশ্য তাঁর বাড়ির সামনে ১৬৩ ধারা জারি হয়ে গিয়েছে। শনিবার সকাল সাড়ে ৬টা নাগাদ পুলিশের হস্তক্ষেপে অভিষেক বাড়িতে ঢোকেন। তার আগে ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ জানান, হামলার আশঙ্কার কথা জানিয়ে দু’দিন আগেই সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট করেছিলেন তিনি। তাতে ‘ট্যাগ’ করেছিলেন লোকসভার স্পিকারকেও। অভিষেকের দাবি, তাঁর চার-পাঁচ জন অনুগামী গুরুতর আহত হয়েছেন। তাঁকে হত্যার চক্রান্ত চলছে।
বুকের ওপর দিয়ে বুলডোজার চালিয়ে দাও,বিজেপিকে আক্রমণ মমতার
মাঝরাতে অভিষেকের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গন্ডোগোলের প্রতিবাদে শনিবার পথে নামেন মমতা। কালীঘাটের বাড়ি থেকে বেরিয়ে মমতা এক যোগে পুলিশ ও বিজেপিকে তীব্র আক্রমণ করেন। মমতা বলেন, ‘রাত তিনটের সময় পুলিশ ও বিজেপি কর্মীরা অত্যাচার চালিয়েছে। আমার বাড়িতে কালী পুজো হয় সেই পুজোয় যাতে কেউ আসতে না পারে তার জন্য বাড়ির গলির মুখে অন্য একটি কালীপুজোর অনুমতি দিয়ে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ তৃণমূলের কর্মীদের তুলে নিয়ে যাচ্ছে যাতে আমার বাড়ির পুজো ভেস্তে দেওয়া যায়।’ এরপরেই মমতা হুঁশিয়ারীর সুরে বলেন, ‘ সব কিছুর একটা সীমা আছে। আর কত অত্যাচার করবেন। মাঝ রাতে গিয়ে অভিষেকের বাড়িতে অ্যাটাক হল। এবার বুলডোজার চালিয়ে দিন আমার বুকের ওপর দিয়ে। মনে রাখবেন আমি প্রয়োজনে নিজে সুপ্রিমকোর্টে যাব।’ কেন তাঁকে ও অভিষেককে টার্গেট করা হচ্ছে তার-ও ব্যাখ্যা দেন মমতা। তিনি বলেন, ‘ আমরা ইন্ডিয়া জোটে আছি। তাই এত রাগ! আপনারা অন্যায় করে যাবেন আমরা কিছু বলবো না। বললেই পুলিশ গুন্ডা পাঠাবেন! মনে রাখবেন মানুষ যখন প্রতিবাদ করবে তখন কিন্তু সামলাতে পারবেন না। মমতার কথায়, বুলডোজার চালালে ধরনা শুরু করব। সেখান থেকে কালীঘাট মন্দির পর্যন্ত। আমার মা কালীর পুজো এখানেই হবে।” তিনি আরও বলেন, “বলছেন, ৫০ হাজারের জেলখানা বানাবেন, করুন না। ওই জেলখানাই আমাদের পার্টির কার্যালয় হয়ে যাবে।”
পুলিশকে চরম হুঁশিয়ারী
অভিষেকের বাড়ি থেকে বেরিয়েই মমতা চলে আসেন অভিষেকের বাড়িতে। সেখান থেকে বেশ খানিকক্ষণ পর বেরিয়ে হ্যান্ড মাইকে বক্তব্য রাখতে দেখা যায় তাঁকে। রণংদেহী মেজাজে এবার মমতা টার্গেট করেন পুলিশকে। মমতা বলেন, ‘‘কালীঘাট থানার ওসি, বাড়ি, পরিবার, থানার টেক কেয়ার করুন। কালীঘাট মন্দির রয়েছে। কোটি কোটি মানুষ যায় সেখানে। খেয়াল রাখুন।’’ সেখানেই থামেননি তিনি। তাঁর কথায়, ‘‘বিজেপির হাতে পুতুল হয়ে চেয়ার হারাতে পারেন!’’ তাঁদের কাজে বাধা দেওয়া হলে কোর্টের দ্বারস্থ হবেন বলেও জানিয়েছেন মমতা। তাঁর কথায়, ‘‘মাঝরাত থেকে অ্যাট্রোসিটি করছে (পুলিশ)। বৈশ্বানর (চট্টোপাধ্যায়) পুলিশের বিরুদ্ধে কেস করো, যাতে প্রমোশন না পায়।’’ এরপর কালীঘাট থানার ওসির নাম করে মমতা বলেন,  ‘‘ কয়েকটি থানা যা করে বেড়াচ্ছে! এখানে (কালীঘাট থানা) নতুন এক জনকে আনা হয়েছে। সব জানি বলাইবাবু! আপনার কী ক্ষমতা, কত প্রোমোশন পাবেন!’’ এর পরেই হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘‘আপনি পান। আপনার পরিবার ভাল থাকুক। আপনাকে শুভ দীপাবলি। মনে রাখবেন, জনরোষের যদি বিস্ফোরণ ঘটে!’’
পুলিশ কমিশনারের ইস্তফা দাবি
কালীঘাট থানার ওসিকে আক্রমণের পর মমতার রোষে পড়েন কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দ।‌ পুলিশ কমিশনারের ইস্তফা দাবি করে মমতা বলেন,  ‘‘অজয় নন্দজি, বিনীতকে (গোয়ল) ইস্তফা দিতে হয়েছিল। কারণ তিনি মনে করেছিলেন। মরাল ডিউটি। আপনি করেননি।’’ নেতা কর্মীদের বরাভয় দিয়ে মমতা বলেন, কালীঘাটের পটুয়াপাড়ায় বহু মানুষ প্রতিমা কিনতে আসেন। তাই ব্যবসার যাতে কোনও ক্ষতি না হয়, সে দিকে নজর রাখতে হবে। তাঁর আশ্বাস, ‘‘আপনারা নিশ্চিন্তে ব্যবসা করুন।’’ মমতা জানান, অভিষেকের সঙ্গে যাঁরা দেখা করতে যাবেন, তাঁরা রাস্তার বাঁ দিক ধরে চলবেন। ডান দিক গাড়ি চলাচলের জন্য খুলে রাখা হবে। তার পরেই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা, ‘‘আমি থাকছি।’’ রাতের খবর, এদিকে তৃণমূলের তরফে আইনজীবী বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন মমতার নির্দেশ মতো অভিষেকের বাড়িতে হামলার ঘটনায় পাল্টা অভিযোগ দায়ের করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন এদিন । একইসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন পুলিশ ছাড়াও আদালতেও এই নিয়ে অভিযোগ করা হচ্ছে
পুলিশকে খোলা ছাড় দিয়েছি, শুভেন্দু
একদিকে কালীঘাট থেকে যখন মমতা অভিষেক পুলিশকে চরম হুঁশিয়ারী দিচ্ছেন তখন পাল্টা পুলিশকে খোলা ছাড় দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। শনিবার মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘পুলিশকে আমি খোলা ছাড় দিয়েছি। কোনও পুলিশের গায়ে হাত পড়লে আমি বলে দিচ্ছি লম্বা সময় জেলে যেতে হবে। সে যেই হোক না কেন পুলিশের রক্ত ঝরলে কাস্টডিয়াল ট্রায়াল হবে।’ শুভেন্দু যোগ করেন, পুলিশকে দুটি বিষয়ে খোলা ছাড় দেওয়া হয়েছে – এক,অবৈধ নেশার ঠেক ভাঙতে হবে। নেশা মুক্ত বাংলা তৈরী করতে হবে। এই কাজ করতে গেলে পুলিশকে যা করতে হয় করতে পারে। দুই, পশ্চিমবঙ্গে কোনও মহিলার ওপর অত্যাচার হলে কড়া ব্যবস্থা নিতে হবে। পুলিশ যা খুশি করতে পারে আমি ঢাল হয়ে দাঁড়াব। শুভেন্দুর পাশাপাশি কালীঘাটের অশান্তি নিয়ে দল হিসাবে বিজেপিও তৃণমূলকে পাল্টা আক্রমণ করেছে। দলের প্রধান মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার বলেন, রাস্তা আটকে কেক কাটলে তো মানুষের সমস্যা হবেই তাই তারা আপত্তি জানিয়েছেন। ঠিক-ই করেছেন। তবে এর সঙ্গে বিজেপির কোনো যোগ নেই। কেউ ওখানে বিজেপির পতাকা নিয়ে ছিল না।

Scroll to Top