অভিজিৎ অধিকারী
৩৬৫ দিন। বয়সের ফারাক প্রায় ১০ বছরের। বালক সুধীন্দ্রনাথ যখন ব্রিটিশ শাসিত শহর দার্জিলিংয়ে পাহাড়িয়া বাঁশিতে সুর তুলছেন, বাবার কাছে তবলার বোল শিখছেন, তখন জন উইনস্টন লেনন ১৯৪০-এ ইংল্যান্ডের লিভারপুলের মাতৃ সদনে ভূমিষ্ঠ হলেন। বছরের তারতম্য থাকলেও পৃথিবীর ২ গোলার্ধের এই ২ গানের আঙ্গিকের প্রথা ভাঙার রুপকারের জন্ম কিন্তু হয় একই দিনে, আজকের এই ৯ অক্টোবরে। হয়ত দুজনের সাক্ষাৎ হয়নি কোনোদিন, সুদূর পশ্চিমে সাত সমুদ্র পেরিয়ে পৌঁছয়নি বাংলা গানে সুধিন্দ্রনাথের সুর বরং অনুজ হলেও খানিক দেরি করে লেননের ছক ভাঙা ননসেন্স লিরিক্স, কড়া যুদ্ধ বিরোধী গান বাংলার জল হওয়ায় এসে মিশেছে। মর্মে পশিত হয়েছে সুধিন্দ্রনাথের, অবশ্য ততদিনে তিনি সুধীন দাশগুপ্ত হিসেবে বাংলার রসিকমহলে সমাদর পাচ্ছেন। ডাক পাচ্ছেন মুম্বই থেকে। চলতি হওয়ার বাইরে তাঁর সুরের মায়ালোকে বুঁদ হচ্ছেন শ্রোতারা।
সুধীন দাশগুপ্তের আশ্চর্য সুরের জগৎ
বাবা দার্জিলিং গভর্মেন্ট স্কুলের মাস্টারমশাই এবং মা সেই সময়কার সমাজসেবিকা হলেও দুজনেরই সঙ্গীতের প্রতি ছিল গভীর অনুরাগ। সুধীন হয়ত তাই সঙ্গীতে ছিলেন এতটা আসক্ত। ছোট থেকেই বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারতেন এবং প্রায় প্রতিটি সমান দক্ষতার সঙ্গে। যেমন সেসময় তিনি বাজাতে পারতেন সেতার, সরোদ, হারমোনিয়াম, পিয়ানো, পিকোলো, গিটার, বেহালা, এসরাজ প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র। তাল বাদ্যতে তবলা ও ড্রামসে তিনি ছিলেন বিশেষ দক্ষ। শেষ পর্যন্ত সঙ্গীত নিয়েই তিনি অধ্যয়ন করেন এবং স্নাতক হন লন্ডনের রয়েল স্কুল অফ মিউজিক থেকে। ভারতীয় সঙ্গীতের ঠাসবুনোট বুনিয়াদে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের প্রথাগত শিক্ষা তাঁর সাংগীতিক দিগন্তকে এতটাই প্রসারিত করে যে তিনি সেই বিশালাকায় ক্যানভাসে পরীক্ষা নিরীক্ষার অবাধ পরিসর পান। সলিল চৌধুরী বাংলা গানে যে পশ্চিমী আর্কেস্ট্রেশনের অবাক করা চলন ঘটিয়েছিলেন সুধীন তাতে পালিশ লাগান। অতিরিক্ত কোমল, তীব্র স্বর প্রয়াগ না করে কী ভাবে শুধু শুদ্ধ স্বর ব্যবহারে হারমনি করা যায় সুধীন তার নমুনা দেখান। তাতে গান আরও সহজ হয় এবং ছোট থেকে বড়, সবার হৃদয় স্পর্শ করে। এমনকি যারা তথাকথিত গাইয়ে নয় তারাও অনায়াসে গানটি গেয়ে দিতে পারেন। প্রথম জীবনে আইপিটিএ আন্দোলনে যুক্ত থাকার সুবাদে স্বর্ণ যুগের বহু গায়ক গীতিকার সুরকারের সংস্পর্শে এসেছিলেন তিনি যা পরবর্তীকালে তাঁর সঙ্গীতের বহুমাত্রিক স্পেকট্রামের বর্ণচ্ছটা উজ্জ্বলতর করে তুলেছিল। সুধীন দাশগুপ্তের এই উত্তরণের প্রতিফলন আমরা সবচেয়ে বেশি পাই তার সুরারোপিত বাংলা ছবির গানে। প্রায় ৫০ এরও বেশি সিনেমার গানে সুর দিয়েছেন তিনি এবং দাপটের সঙ্গে যেমন হিট দিয়েছেন তেমনি সুরের স্বতন্ত্রতা বজায় রেখেছেন। ৬০-এর শেষ ৭০-এরের দশকে ইংরেজি গান শোনার প্রবণতা আজকের তুলনায় ছিল বেশি। যদিও তখন এত সহজলভ্য ছিল না, চোরা পথই ছিল ভরসা। তখন কি সুধীন লেননের গান শোনেননি? জানতেন কি দুজনের জন্ম তারিখ এক? ৬০ দশকের দুনিয়া কাঁপানো বিটলস কি সুধীন্দ্রনাথ শোনেননি ভ্রু কুঁচকে, খুব মন দিয়ে?
স্কিফল জ্যাজ ব্যান্ড খোলেন লেনন
জনের যখন ৫ বছর বয়স, তাকে বাছাই করতে বলা হয় সে কার সঙ্গে থাকবে, মা না বাবা। জন বাবার আঙুল ধরেছিল তাতে মা জুলিয়া রাগ করে মুখ ঘুরিয়ে হাঁটা দেয়। জন কাঁদতে কাঁদতে মায়ের পিছু নেয়। মায়ের তো বটেই বাবা অ্যালফ্রেড লেননের সঙ্গে শিশু জনেরও পাকাপাকি বিচ্ছেদ ঘটে যায়। মায়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল বটে তবে জন উইনস্টন লেনন বড় হয়ে ওঠে তার নিঃসন্তান মাসি-মেসোর সঙ্গে। মাসির কিনে দেওয়া বই মেসোর দেওয়া মাউথ অর্গান ছিল তার একমাত্র অক্সিজেন। এর বহু পরে লেননের হাতে আসে তার প্রথম গিটার। মায়ের দেওয়া সস্তা গ্যালোটন চ্যাম্পিয়ন। মাসির তীব্র আপত্তি ছিল, তার ধারণা হয়েছিল ছেলেটার ভবিষ্যত বরবাদ হয়ে যাবে। কিন্ত দেখা গেল হয়েছে তার ঠিক বিপরীত। ওই গিটার আঁকড়ে স্কুলের সবচেয়ে অমনোযোগী, মারকুটে ক্লাউন যে সবাইকে ছাড়িয়ে ওপরে উঠে যাবে সেটা কেউ ভাবেনি। যুদ্ধ পরবর্তী ইংল্যান্ডে গিটার, ব্যাঞ্জো, স্যাক্সোফোন, ড্রামস নিয়ে স্কিফল জ্যাজ গ্রুপ হঠাৎ দানা বেঁধেছিল। টেকেনি বেশি দিন। জ্যাজের গুরু গম্ভীর ভাব লঘু করার এই প্রয়াসে প্রথমে মেতে যান লেনন। দ্যা কোয়ারিম্যান নামে একটা দল বানান। ১৯৫৬ থেকে ৬০, এই ব্যান্ডই ছিল বিটলসের বুনিয়াদ। বিটলসের পুরোধা পুরুষ ছিলেন লেনন। তিনিই দলটি গড়েন এবং শেষপর্যন্ত তিনিই ভাঙেন। ধ্রুপদী সঙ্গীত, প্রথম পপ গায়ক কম্পজার এলভিস প্রিসলি থেকে সে সময়কার মার্কিন জ্যাজ ব্লুজ, প্রত্যেক ধারাকে নস্যাৎ করে এমন একটা ছকভাঙা গানের জন্ম দেন জনের নেতৃত্বে বিটলস যা দুনিয়ার মাথা দেয় ঘুরিয়ে। ননসেন্স লিরিক্স থেকে নিটোল প্রেম, যুদ্ধের বিরুদ্ধে হওয়ায় শান্তির ডাক মানুষকে ব্যাপক আকৃষ্ট করে। দলগত ভাবে সেরার তালিকায় পাকাপাকি জায়গা করে নেয় বিটলস। একের পর এক হিট অ্যালবামের পিছনে ছিল লেননের একটাই ছিল বীজমন্ত্র, ভাঙ্গো, প্রথা ভাঙ্গো। এতে যদি নিজেদের ভেঙে পাল্টে ফেলতে হয় তাহলেও ডোন্ট কেয়ার। দল ভেঙে একক ভাবে লেনন ছিলেন সেরার সেরা। প্রতিবার, প্রতি অ্যালবামে তিনি নিজেকে ভেঙেছেন, নতুন করে গড়েছেন।
সুরের ভাবনায় হলো পরিচয়
দুজনেই চলে গেছেন প্রায় ৪৫-৪৬ বছর আগে, আজ তাদের দুজনেরই জন্মদিন। পৃথিবীর বিপরীত দুই গোলার্ধে হয়ত নিভৃতে সে জন্মদিন পালিত হচ্ছে, আমরা কী জানি! ওদের দুজনের কখনও পরিচয় হয়েছিল কিনা বা আদৌ সেই সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল কিনা আমরা জানি না। শুধু জানি, সঙ্গীতের প্রয়োগের ভাবনায়, একটা গান অঙ্কুর থেকে মহীরুহে পরিণত করার প্রক্রিয়ায় তাদের পরিচয় ছিল। প্রথা উপেক্ষা করা বা ছক ভাঙার পদ্ধতিতে সাদৃশ্য হয়ত ছিল না কিন্তু শ্রোতাদের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের কায়দায় রয়েছে আশ্চর্য মিল। বিশ্বাস বা ভরসা নেই, তবু ভাবতে ইচ্ছে হয়ে দুই লিব্রা-সাধক ভাবনায় হরিহর আত্মা!





