৩৬৫ দিন। দু’পক্ষই তাল ঠুকছে! একদিকে ককরোচরা বলছে লড়ে নেব অন্যদিকে দিল্লি পুলিশ,কেন্দ্র বলছে, খেলাটাই হবে না। খেলা শুরুর আগেই বোতল বন্দি করে দেব! হুঙ্কার পাল্টা হুঁশিয়ারিতে ককরোচদের মহালয়ার সকালে দিল্লির রাজপথ দখল ঘিরে টান টান উত্তেজনা যে উত্তেজনা সাধারণত কোনও যুদ্ধ ক্ষেত্রে থাকে। গত ৭২ ঘন্টায় দিল্লির চেহারাটাই আমুল বদলে গিয়েছে। চেনা ছন্দে পতন নেমেছে, দিল্লি পুরোদস্তুর এখন দুর্গ। রেল ও সড়ক পথে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন আকাশপথ মানে বিমানে দিল্লিতে এলেও কড়া নজরদারি চলছে, যেন মারকাটারি সব জঙ্গিরা দিল্লিতে বিরাট কোনো নাশকতা করতে আসছে। যদিও দিল্লি পুলিশ বলছে, সবটাই সতর্কতা মূলক ব্যবস্থা। অশান্তি যাতে না হয় তার জন্য-ই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। জনজীবন স্বাভাবিক আছে। অসুবিধা কিছু নেই। ককরোচ জনতা পার্টি বলছে, দিল্লি পুলিশ বিজেপি মিলে যতোই চেষ্টা করুক, তাদের রোখা যাবে না। দিল্লির পথে একটাই আওয়াজ উঠবে, ‘দফা এক দাবি এক জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ’!
বাতিল রাজধানী সহ বহু ট্রেন, মেট্রো, সিল বর্ডার, বন্ধ ইন্টারনেট
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে জ্ঞানেশ কুমারের এস আই আর কেলেঙ্কারির খবর প্রকাশিত হতেই ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি ১০ অক্টোবর দিল্লিতে যন্তরমন্তর ২.০ কর্মসূচির ঘোষণা করে। দাবি, জ্ঞানেশ কুমারকে জাতীয় নির্বাচন কমিশনার পদ থেকে পদত্যাগ করতে হবে। এর মধ্যে ইন্ডিয়া জোট রাহুল প্রিয়াঙ্কারাও এই এক দাবীতে পথে নেমেছেন। কিন্তু দিল্লি পুলিশের মাথা ব্যথা হল ককরোচদের নিয়ে। এর পেছনে কারণ অবশ্য-ই তাদের যন্তরমন্তরে নিট প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদে আন্দোলন। দিল্লি পুলিশের অন্দরেই বার বার প্রশ্ন উঠেছে ককরোচদের সেই আন্দোলন দমনে পারদর্শীতা নিয়ে এবার তাই যখন ককরোচরা ফের যন্তরমন্তরে আন্দোলনের ডাক দেয় তখন আর কোনও ঝুঁকি নেয়নি দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। মজা করে অনেকে বলছেন শুধু সেনার ট্যাঙ্ক আর যুদ্ধ বিমানটাই যা নামেনি। সুযোগ থাকলে হয়তো যমুনায় সাবমেরিনটাও মোতায়েন হয়ে যেত। এক কথায় বলতে গেলে কৃষক আন্দোলনের সময়ের কড়াকড়িকেও এবার টেক্কা দিয়েছে দিল্লি পুলিশ। গত দু’দিন ধরে ধাপে ধাপে দিল্লিতে আনা হয়েছে ৪০ হাজারের বেশী আধা সেনা। তাদের একটা বড় অংশকে দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনে পাহাড়ায় বসানো হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ রেল স্টেশন, মেট্রো, বাস স্ট্যান্ডেও তারা টহল দিচ্ছে। বাকি অংশকে শনিবার ককরোচদের মিছিলে অশান্তি হলে নামানো হবে বলে ঠিক হয়েছে দিল্লির বেশ কিছু অংশে ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একটি সরকারী চিঠিতে জানা গিয়েছে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অনুমোদনের পর টেলিকমিউনিকেশন নিয়মাবলী এবং আইন অনুযায়ী টেলিকম সংস্থাগুলিকে (এয়ারটেল, ভোডাফোন/আইডিয়া, জিও এবং এমটিএনএল) এই নির্দেশ পাঠানো হয়েছে। সেই নির্দেশিকা অনুযায়ী, জনপথ-কর্তব্যপথ ক্রসিং থেকে চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। নির্দেশ অনুযায়ী, ৯ অক্টোবর রাত ১০টা থেকে শুরু করে ১০ অক্টোবর রাত ১০টা পর্যন্ত টানা ২৪ ঘণ্টা এই এলাকায় সমস্ত প্রযুক্তির ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা হবে। বিক্ষোভের জেরে তীব্র যানজট ও বিশৃঙ্খলা এড়াতে পরিবহনের ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি শুরু হয়েছিল। শুক্রবার রাতে হাওড়া ও শিয়ালদহ থেকে দিল্লিগামী রাজধানী এক্সপ্রেস-সহ একাধিক ট্রেন বাতিল করে রেল। এছাড়া মধ্য দিল্লিতে ঢোকার পথ বন্ধ করতে প্রায় ৫৭টি মেট্রো স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার কথা বলেছিল দিল্লি মেট্রো কর্তৃপক্ষ।
দিল্লি জুড়ে ১৬৩ ধারা, মোড়ে মোড়ে মাইকিং
সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, শনিবার দিল্লি রণক্ষেত্র হবে ধরে নিয়ে প্রায় গোটা শহর জুড়েই ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছে। অনেকে বলছেন অঘোষিত কার্ফু জারি হয়েছে। যন্তরমন্তর ও তার সংলগ্ন এলাকা তো বটেই দিল্লির সব গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাতেই ১৬৩ ধারা জারি করে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ৫ জন বা তার বেশী লোক জমায়েত করতে পারবে না। রাস্তার মোড়ে মোড়ে মাইকিং করা হচ্ছে দিল্লি পুলিশের তরফে। সেখানে বলা হচ্ছে, ১৬৩ ধারা জারি থাকায় কোনো রকম জমায়েত করা যাবে না। পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙা যাবে না। নির্দেশ অমান্য করলে কড়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দিল্লি পুলিশের একটি সূত্র বলছে, শনিবার ককরোচদের আন্দোলনে যেহেতু কোনো অনুমতি নেই তা আইনের চোখে বেআইনি। ফলে পুলিশের কঠোর পদক্ষেপ করতে অসুবিধা নেই। তবে প্রথমেই তারা কঠিন কোনো পদক্ষেপ নিতে চায় না। একটা জায়গা পর্যন্ত মিছিল বা ধর্নাকে ছাড় দিয়ে সেখানে আটকে দেওয়া হতে পারে তবে যাই হোক না কেন যন্তরমন্তরের ত্রিসীমানায় ককরোচদের ঘেঁষতে দেওয়া হবে না। দিল্লি পুলিশ সূত্রে খবর, দিল্লিতে ঢোকা ও বেরনোর সব কটি পয়েন্টে কড়া নজরদারি চলছে। গাড়ি থামিয়ে তল্লাশি চলছে। স্টেশন গুলোতেও ব্যাপক নজরদারি চলছে। রাজধানী সহ প্রচুর ট্রেন বাতিল হলেও পুলিশ মনে করছে ঘুর পথে ককরোচরা দিল্লি ঢুকতে পারে তাই ট্রেন বাতিল করেও নজরদারিতে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। শনিবার দিল্লির অন্তত ২৫০ টি স্থানে পুলিশের ব্যারিকেড থাকবে। এর মধ্যে শতাধিক জায়গায় বড় ব্যারিকেড থাকছে। ব্যাক আপ হিসাবে আরো ১০০-১৫০ ব্যারিকেড থাকছে। ১৫০০-২০০০ অতিরিক্ত ক্যামেরা বসানো হয়েছে বিভিন্ন স্ট্যাটেজিক পয়েন্টে। শতাধিক ড্রোনে নজর রাখা হবে ককরোচদের গতিবিধির ওপর। প্রাথমিকভাবে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে প্রথমেই আগ্রাসী মনোভাব দেখানো যাবে না। শান্তিপূর্ণ ভাবে আন্দোলনকারীদের বোঝাতে হবে। তাতে কাজ না হলে মৃদু লাঠিচার্জ করা যাবে। জলকামান ব্যবহার করতে হবে যদি আন্দোলনকারীরা একাধিক ব্যারিকেড ভেঙে ফেলে। তবে পুলিশের ওপর হামলা হলে পাথর বা বোতল ছোঁড়া হলে পুলিশকে ফ্রি হ্যান্ড দেওয়া হবে। গতবার পেলেট গান ছোঁড়া নিয়ে ভয়ঙ্কর মুখ পুড়েছিল দিল্লি পুলিশের। এবার যাতে সেই পরিস্থিতি তৈরী না হয় তার জন্য আগাম সতর্ক থাকছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক।
মাছি মারতে হাতুড়ি!
এদিকে ককরোচদের জ্ঞানেশ হঠাও অভিযান ও তাকে ঘিরে দিল্লিতে বেনজির নিরাপত্তা নিয়ে জল গড়াল সুপ্রিম কোর্টে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চে শুক্রবার সেই মামলা ওঠে। মামলাকারীদের তরফে আদালতে বলা হয়, একটা আন্দোলন ঠেকাতে দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সরকার যে ভয়ঙ্কর নিরাপত্তার বাড়াবাড়ি শুরু করেছে তাতে সাধারণ মানুষের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছে। দিল্লি পুলিশ বকলমে শনিবার মানুষকে ঘর থেকেই যেন বেরতে বারন করছে। ট্রেন,ইন্টারনেট, মেট্রো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গাড়ি থামিয়ে তল্লাশির নামে হেনস্থা করা হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষ ভয় পাচ্ছে জনজীবন বিপর্যস্ত হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের এই কঠোর পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এমএ বেবি। আইনজীবী কপিল সিব্বল, ড. অভিষেক মনু সিংঘবী, গোপাল শঙ্করনারায়ণন ও বৃন্দা গ্রোবর তাঁর পক্ষে বক্তব্য রাখেন। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চে জরুরি শুনানির আর্জি জানিয়ে কপিল সিব্বল ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলেন, ‘‘আমার দেশে এ সব কী ঘটছে?’’আদালতে আইনজীবী সিংঘবী কেন্দ্রীয় সরকারের নেওয়া একাধিক পদক্ষেপের তালিকা পেশ করেন। রাজধানীতে বিক্ষোভ রুখতে ২২১ কোম্পানি কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী (সিএপিএফ) মোতায়েন করা হয়েছে। আন্দোলনকারীদের আটক করে রাখতে অন্তত ১০টি অস্থায়ী ডিটেনশন সেন্টার তৈরি রাখা হয়েছে। দিল্লির প্রায় ৫৭টি গুরুত্বপূর্ণ মেট্রো স্টেশনের গেট বন্ধ রাখার আর্জি জানানো হয়েছে। দিল্লির স্থানীয় হোটেল ও গেস্ট হাউসগুলিকে নতুন করে কোনও অতিথিকে ঘর না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আন্দোলনের ভিডিয়ো তোলা বা প্রচার চালানোর ক্ষেত্রে ইউটিউবারদের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। সাংবাদিকদের আইডি কার্ড সঙ্গে রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং বিভিন্ন এলাকায় ইন্টারনেট পরিষেবা সীমিত করা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট সরাসরি দিল্লি পুলিশের কোনো নির্দেশিকায় স্থগিতাদেশ না দিলেও মন্তব্য করে যে, আন্দোলন শান্তিপূর্ণ রাখতে পুলিশ প্রশাসন চাইলে সব রকম পদক্ষেপ করতে পারে তবে সেটা এমন পর্যায়ে যাওয়া ঠিক নয় যাতে মানুষ অসুবিধায় পড়েন। জনজীবন স্বাভাবিক রাখাও প্রশাসনের দায়িত্ব। এরপর তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ মন্তব্য করে, মাছি মারতে হাতুড়ি আনবেন না!
ভয় পেয়েছে পুলিশ কেন্দ্র
সিজেপি-র যন্তরমন্তর ২.০ কে কেন্দ্র করে দিল্লি পুলিশের নিরাপত্তার বহর নিয়ে তীব্র খোঁচা দিলেন ককরোচদের প্রধান মুখপাত্র সৌরভ দাস। এক্স হ্যান্ডেলে তাঁর প্রশ্ন, ককরোচদের এত ভয় কেন? সৌরভের কথায়, আসলে দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রের সরকার বুঝতে পেরেছে গোটা দেশ থেকে লাখ লাখ ছাত্র যুব শনিবার যন্তরমন্তরে যাবেন। তারা জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা চেয়ে আওয়াজ তুলবেন। তারা প্রশ্ন করবেন কেন ভোট চুরি? কেন কোটি কোটি ভোটারের নাম কেটে বাদ দেওয়া হল? বিপদ বুঝতে পেরেই পুলিশ আধা সেনা নামিয়ে ভয়ের পরিবেশ তৈরী করতে চাইছে কেন্দ্র। সৌরভের হুঁশিয়ারি, ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। ককরোচরা অশান্তি চায় না তবে পুলিশ অত্যাচার করলে তার দায় তাদের-ই নিতে হবে। যন্তরমন্তর ১.০ এখনো কেউ ভোলেনি।





