৩৬৫ দিন। শ্রীদাত্রী ঠাকুর। দুর্গাপূজার কাউন্টডাউন শুরু হতেই কলকাতার ঐতিহ্যমন্ডিত পুজো মণ্ডপগুলির প্রস্তুতি দেখতে মানুষের আগ্রহ তুঙ্গে থাকে। এবছর দমদম পার্ক সার্বজনীন পুজোর ৭৫তম পদার্পণ বা প্ল্যাটিনাম জয়ন্তী বর্ষ উপলক্ষে এক সম্পূর্ণ অভিনব ও চিন্তনশীল থিম নিয়ে হাজির হয়েছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে “পঞ্চালিকা”। ‘পঞ্চালিকা’ শব্দের অর্থ পুতুল নাচ। এই প্রাচীন লোকশিল্পটিকে বর্তমান প্রজন্মের সামনে নতুন করে তুলে ধরতে এবং এর সঙ্গে জড়িত শিল্পীদের অক্লান্ত পরিশ্রমকে সম্মান জানাতেই এই আয়োজন।
এই সুবৃহৎ আয়োজনের নেপথ্যে থাকা বিশিষ্ট শিল্পী তাপস দত্ত এবং প্রতিমা শিল্পী সনাতন দিন্দার সৃজনশীলতা মণ্ডপটিকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। শিল্পী তাপস দত্তের দীর্ঘ ৪০ দিনের অক্লান্ত পরিশ্রমে ও প্রায় ২৫-৩০ জন শিল্পীর নিপুণ ছোঁয়ায় গড়ে উঠেছে এই থিমভিত্তিক মণ্ডপ। তিনি জানান যে, বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের মাত্র ১০ শতাংশ পুতুল নাচের দল বেঁচে রয়েছে এবং এই ঐতিহ্য আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে। তাই পুতুল নাচের সেই পেছনের ব্যাকড্রপ, বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী পুতুল, এবং পুতুল নাচের দলগুলির নাম যেমন— ‘মা মনসা পুতুল থিয়েটার’, ‘বর্ধমান পাপেট থিয়েটার’, ‘কলকাতা পাপেট থিয়েটার’ ইত্যাদি মণ্ডপের আনাচে-কানাচে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। পাশাপাশি, প্লাই ও লোহার কাঠামোর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব উপকরণের ব্যবহার করা হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন পুজো হওয়ায় প্রতিমাতেও খুব বেশি বাড়াবাড়ি না করে সনাতন দিন্দার হাতে মায়ের মাতৃরূপ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা থিমের সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।
অন্যদিকে, পুজো কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, প্রতি বছরই তারা সমাজ সচেতনতামূলক বা বাংলার ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার বার্তা নিয়ে কাজ করেন। গত বছর বাংলার হাতশিল্প বা খাদ্য সংকট নিয়ে কাজ করার পর, এবছর তারা পুতুল নাচকে বেছে নিয়েছেন কারণ এই শিল্প নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশেষ আলোচনা হয় না। এমনকি ভারতীয় ডাক বিভাগও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলার পুতুল নাচ নিয়ে বিশেষ ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে, যা এই পুজোর থিমে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। কমিটির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো চতুর্থী থেকে দশমী পর্যন্ত মেদিনীপুর থেকে প্রায় ১৪-১৫ জনের একটি দল ‘মা মনসা পুতুল নাচ থিয়েটার’ নিয়ে মণ্ডপে প্রতিদিন সন্ধ্যায় সরাসরি লাইভ পারফর্ম করবেন। ডাঁড় পুতুল ও তারের পুতুল— উভয় প্রকার পুতুলের নাচ এবং শিল্পীদের পুতুলের মতো অভিনয় করার শারীরিক পরিশ্রমকে দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরাই তাদের মূল উদ্দেশ্য। এছাড়া হোগলার চাটাই, পরিবেশবান্ধব রং এবং লোহার ইনস্টলেশনের মাধ্যমে অত্যন্ত পরিবেশবান্ধব উপায়ে এই মণ্ডপটি সাজানো হয়েছে।
সবমিলিয়ে, আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া বাংলার প্রাচীনতম লোকশিল্প ‘পুতুল নাচ’ এবং তার শিল্পীদের না বলা কষ্টকে দুর্গাপূজার মতো বিশাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মানুষের দ্বারে পৌঁছে দেওয়ার এই প্রচেষ্টা এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে। পুজো কমিটির এই মহৎ উদ্যোগ এবং শিল্পীদের নিখুঁত কারুকার্য এবছর দমদম পার্ক সার্বজনীন-এর মণ্ডপে দর্শনার্থীদের মনে গভীর রেখাপাত করবে এবং হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে নতুন প্রজন্মকে সচেতন করবে বলেই আশা করা যায়।
প্লাটিনাম জয়ন্তীতে ‘দমদম পার্ক সার্বজনীন’-এর থিম ‘পঞ্চালিকা’; শিল্পী তাপস দত্তের ভাবনায় জীবন্ত বাংলার লোকশিল্প পুতুল নাচ
- khabar365din
- October 4, 2026
- 3:07 pm
- No Comments




