পূষন গুপ্ত
১. ইউক্রেন (তখন সোভিয়েতের অংশ) এলাকায় ১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল চের্নোবিল নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টের ৪ নং রিঅ্যাক্টরে বিস্ফোরণ ঘটে। পারমাণবিক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় প্রায় ১ লক্ষের জনবসতি ফাঁকা করে দেওয়া হয় বটে, আপাতভাবে মৃত্যুর সংখ্যা কম হলেও তেজস্ক্রিয়তায় ক্ষতি যা ঘটার ঘটে যায়। তৎকালীন সোভিয়েত রাষ্ট্রপ্রধান এবং শেষ রুশ কমিউনিস্ট গর্বাচভ সব তথ্য হাপিস করে দেন বটে কিন্তু আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য ও মানবাধিকার সংগঠনগুলি তদন্ত ও গবেষণা করে প্রমাণ করে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ রেডিয়েশনের ফলে পরবর্তীকালে ক্যানসার ও অন্যান্য ব্যধিতে আক্রান্ত হয়। যদিও ওয়ার্ল্ড নিউক্লিয়ার অ্যাসোসিয়েশনের মতে এসব ভুতুড়ে গল্প, পরমাণু শক্তি বিরোধী লবির প্রচার মাত্র। তাদের মতে এত মৃত্যু ঘটেনি তাছাড়া নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট এত বৃহত্তর একটি প্রকল্প যে সেটি সফল করার ক্ষেত্রে কিছু কোলেটারাল ড্যামেজ হতেই পারে। মনে রাখতে হবে চের্নোবিল ছাড়া এই মাপের নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টে দুর্ঘটনা আর কিন্তু ঘটেনি। বস্তুত পরমাণু শক্তির বিরোধিতা গোটা বিশ্বজুড়ে প্রায় ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধিতার সমতুল্য। বামপন্থীরা বিশেষত একটু উগ্র বামপন্থীরা (এখনকার আর্বান নকশাল), এমন একটা প্রচার সংগঠিত করতে পেরেছিলেন যা হল— পরমাণু শক্তি আর সাম্রাজ্যবাদী শক্তি অনেকটা একই। ভিয়েতনাম আগ্রাসন এবং নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট একই ধরনের নরঘাতী অপরাধ। এটি সম্পূর্ণ ভুল ন্যারেটিভ। কিন্তু ন্যারেটিভটি গোটা বিশ্বে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ৯০ দশকের শেষভাগে যখন গোটা বিশ্বের প্রতিটি দেশ, রাশিয়া সহ নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যন্টের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সঙ্কট অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে তখনও ওই ন্যারেটিভের শিকার উন্নয়নশীল দেশগুলি।
২. এই ন্যারেটিভে নেচে ওঠা তৎকালীন সিপিএম তথা বামফ্রন্ট সরকার পশ্চিমবঙ্গে পরমাণু কেন্দ্রের বিরোধিতা করবে এটাই স্বাভাবিক ছিল। ৯০’এর শেষ দিক থেকে হরিপুরে একটি নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টের প্রস্তাব আসতে শুরু করে। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর শিল্পায়নের প্রসঙ্গ সামনে আসে। বুদ্ধদেববাবু বুঝেছিলেন অপারেশন বর্গা আর পঞ্চায়েত শাসনের কুমিরছানা দেখিয়ে আর বেশিদিন ক্ষমতায় থাকা যাবে না। সামান্য অর্থনৈতিক উন্নয়ন করতে হলেও শিল্প প্রতিষ্ঠার দরকার আছে। বামফ্রন্ট আমলে রাজ্যের নুয়ে পড়া মেরুদণ্ড সোজা করতে হলে শিল্প ও পুঁজি ছাড়া গতি নেই। কারখানার গেটে লাল পতাকা লাগিয়ে ধর্মঘট আর বন্ধ, কম্পিউটার ঢুকতে দেব না বলে বৌবাজারের মোড়ে ব্যাঙ্ক থেকে কম্পিউটার তুলে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার রাজনীতি মানুষ আর মেনে নেবে না। বুদ্ধদেব নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট সম্পর্কে উৎসাহ দেখানো মাত্র, দিল্লির সঙ্গে কথাবার্তা শুরু করা মাত্র পার্টি রে রে করে উঠল। তৎকালীন রাজ্য পার্টি সম্পাদক, বাংলার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা কমরেড অনিল বিশ্বাস সাফ জানিয়ে দিলেন, বুদ্ধ ওসব হবে না। বামপন্থীরা পারমাণবিক শক্তির পক্ষে থাকতে পারে না। প্রসঙ্গত তখন কোথায় আম্বানি, কোথায় আদানি? টাকা মূলত যোগাবে কেন্দ্রই। এটাই পরিকল্পনায় ছিল, টেকনোলজি দেবে রাশিয়া। সেইসময় একক বুদ্ধকে কোমর বেঁধে সমর্থন করেন মথুরাপুর থেকে ৫ বার জিতে আসা সিপিএম সাংসদ রাধিকারঞ্জন প্রামাণিক। বিজ্ঞানের অধ্যাপক রাধিকাবাবু বললেন, পারমাণবিক শক্তির বিরোধিতা করার অর্থ বিজ্ঞানকে অস্বীকার করা। ভবিষ্যৎকে অস্বীকার করা। বুদ্ধবাবুকে এই সমর্থন অনিলবাবু ভালোভাবে মেনে নেননি। ২০০৩ সালে পার্টি থেকে বহিষ্কৃত রাধিকাবাবু, তৃণমূলে যোগ দেন। অনিল বিশ্বাসের উদ্যোগে পার্টির ওই প্রবল চাপকে মোকাবিলা করার ক্ষমতা ছিল না বুদ্ধবাবুর। প্রকল্প থেকে পিছিয়ে যান তিনি। ২০০৭ সালে বাংলার শিল্পায়নে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের অপঘাতে মৃত্যু হল।
৩.প্রসঙ্গত, ২০১১ সালেই তৃণমূল সরকার প্রকল্পটি সরকারিভাবে বাতিল করে দেয়। হরিপুরেই ফিরছে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট। বিজ্ঞান ও উন্নয়নের গতিপথ শেষপর্যন্ত রুদ্ধ থাকে না।




