দেশের প্রথম বায়োলজিক্যাল মার্ডার একেবারে গোয়েন্দার চোখে বিশ্লেষণ

৩৬৫ দিন। সৌমেন ভট্টাচার্য। কখনও কখনও সত্য ঘটনা কল্পকাহিনির চেয়েও অবিশ্বাস্য। ড্যান মরিসনের ‘বিষপ্রয়োগকারী বঙ্গ’ তেমনই এক হত্যাকাণ্ডের পুনর্নির্মাণ—যে ঘটনা ১৯৩৩-৩৫ সালে কলকাতা, পাকুড় এবং ব্রিটিশ ভারতের সংবাদজগৎকে তোলপাড় করেছিল। পাকুড় রাজপরিবারের উত্তরাধিকারী অমরেন্দ্রচন্দ্র পাণ্ডের মৃত্যু প্রথমে অসুখ বলে মনে হলেও পরে সামনে আসে এক শীতল পরিকল্পনার ছবি—রোগজীবাণুকে হত্যার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার। বইটি প্রকাশ করেছে জাগারনট।
লেখক: সাংবাদিকের চোখে অপরাধের ইতিহাস
ড্যান মরিসন মূলত সাংবাদিক। বিদেশি সংবাদদাতা হিসেবে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। এর আগে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস, রাজনীতি ও সমাজ নিয়ে লিখেছেন; তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘দ্য ব্ল্যাক নাইল’। পাকুড় হত্যাকাণ্ডের সূত্র তিনি পান ভারতে মহামারির ইতিহাস নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে। একটি বহু পুরনো, প্রায় বিস্মৃত হত্যার খবর তাঁকে টেনে নিয়ে যায় আদালতের নথি, পুলিশি কাগজপত্র, সাক্ষ্য এবং পুরনো সংবাদপত্রের বিশাল ভাণ্ডারে।
এই বইয়ের বড় শক্তি এখানেই। মরিসন শুধু পুরনো মামলার গল্প বলেননি। তিনি একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকের মতো টুকরো টুকরো নথি জুড়ে একটি সম্পূর্ণ হত্যাচিত্র তৈরি করেছেন। তিন মহাদেশের সংগ্রহশালা ও গ্রন্থাগার থেকে সংগৃহীত বিচার-নথি, পুলিশি প্রতিবেদন, সাক্ষ্য এবং সংবাদপত্রের তথ্য তাঁর গবেষণার ভিত্তি।
পাকুড় হত্যারহস্য: উত্তরাধিকার থেকে মৃত্যু
গল্পের কেন্দ্রে দুই বৈমাত্রেয় ভাই—অমরেন্দ্রচন্দ্র পাণ্ডে এবং বিনয়েন্দ্রচন্দ্র পাণ্ডে। পাকুড় রাজপরিবারের বিপুল সম্পত্তির উত্তরাধিকার ঘিরে তাঁদের সম্পর্ক ক্রমশ তিক্ত হয়ে ওঠে। অমরেন্দ্র ছিলেন ২২ বছরের তরুণ উত্তরাধিকারী; বিনয়েন্দ্র ছিলেন বয়সে বড় এবং রাজপরিবারের ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা মানুষ। ১৯৩৩ সালের ২৬ নভেম্বর হাওড়া স্টেশনে পাকুড় যাওয়ার ট্রেনে ওঠার সময় অমরেন্দ্রর হাতে আচমকা সূচের মতো কিছু ফুটিয়ে দেওয়া হয়। প্রথমে ঘটনাটি তেমন গুরুত্ব পায়নি। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যে তাঁর শরীরে অদ্ভুত অসুস্থতা দেখা দেয়। ৪ ডিসেম্বর কলকাতায় তিনি মারা যান। পরে রক্তপরীক্ষায় প্লেগের জীবাণুর উপস্থিতি ধরা পড়ে। আদালতের নথিতেও বলা হয়েছে, তাঁর শরীরে রোগজীবাণু প্রবেশ করানোর ঘটনাই মৃত্যুর কারণ ছিল।
এখানেই মামলাটি সাধারণ হত্যার সীমা ছাড়িয়ে যায়। হত্যার অস্ত্র ছুরি নয়, বন্দুক নয়—একটি রোগজীবাণু। হত্যাকারী এমন একটি পদ্ধতি বেছে নিয়েছিল যার সঙ্গে সেই সময়কার চিকিৎসাবিজ্ঞান, জীবাণুবিদ্যা এবং জনপ্রিয় অপরাধকাহিনির অদ্ভুত যোগ ছিল। মরিসন দেখিয়েছেন, আর্থার কোনান ডয়েলের শার্লক হোমসের কাহিনিরও এই পরিকল্পনার সঙ্গে যোগ ছিল।
তদন্ত: রোগ থেকে খুন
অমরেন্দ্রর মৃত্যুর পর পরিবারের সন্দেহ থেকেই তদন্তের সূত্রপাত। চিকিৎসকদের পরীক্ষায় তাঁর রক্তে প্লেগের জীবাণু পাওয়া যায়। এরপর প্রশ্ন ওঠে—স্বাভাবিক সংক্রমণ, না কি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড? তদন্ত যত এগোয়, বিনয়েন্দ্রর সঙ্গে চিকিৎসক ও জীবাণুবিদ তারানাথ ভট্টাচার্যের ঘনিষ্ঠতার তথ্য সামনে আসে। পুলিশি অনুসন্ধানে বোম্বাইয়ে জীবাণু সংগ্রহের সম্ভাব্য সূত্র, তাঁদের যোগাযোগ এবং হত্যার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত নানা তথ্য উঠে আসে। আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, চিকিৎসা-সংক্রান্ত সাক্ষ্য, নথিপত্র, বোম্বাই ও হাওড়ার ঘটনাপ্রবাহ এবং অভিযুক্তদের পারস্পরিক যোগাযোগ মিলিয়ে ষড়যন্ত্রের ছবি তৈরি হয়েছিল। মরিসনের কৃতিত্ব, তিনি তদন্তকে কেবল পুলিশি কাহিনি বানাননি। চিকিৎসাবিজ্ঞান, পারিবারিক সম্পত্তি, রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, কলকাতার সমাজজীবন—সবকিছুকে একই সূত্রে বেঁধেছেন।
বিচার: আদালতে জীবাণুর লড়াই
পাকুড় মামলা শেষ পর্যন্ত এক দীর্ঘ ও জটিল বিচারপর্বে পৌঁছয়। চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের সাক্ষ্য ছিল মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিরক্ষা পক্ষ প্রশ্ন তোলে—অমরেন্দ্র সত্যিই কি হত্যার মাধ্যমে প্লেগে আক্রান্ত হয়েছিলেন? রক্তের নমুনা কি দূষিত হতে পারে? স্বাভাবিকভাবে প্লেগ সংক্রমণের সম্ভাবনা ছিল কি?
আদালত চিকিৎসাবিদ্যার বিপুল সাক্ষ্য খুঁটিয়ে বিচার করে সিদ্ধান্তে পৌঁছয় যে অমরেন্দ্রর মৃত্যু প্লেগে হয়েছিল এবং হাওড়া স্টেশনে তাঁর শরীরে জীবাণু প্রবেশ করানো হয়েছিল। ১৯৩৬ সালের কলকাতা হাইকোর্টের রায়ে বিনয়েন্দ্র এবং তারানাথের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগের ভিত্তি গ্রহণ করা হয়। প্রথম বিচারে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল; পরে হাইকোর্ট মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। এই অংশে মরিসনের কাজ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তিনি আদালতের রায়কে শুধু শেষ কথা হিসেবে দেখাননি। বরং দেখিয়েছেন কীভাবে একটি মামলায় প্রত্যক্ষ প্রমাণের অভাবেও চিকিৎসাবিদ্যা, নথি, সম্পর্ক, উদ্দেশ্য এবং ঘটনাক্রম মিলিয়ে পরিস্থিতিগত প্রমাণের জাল তৈরি হয়।
মরিসনের লেখার আসল শক্তি
‘বিষপ্রয়োগকারী বঙ্গ’কে নিছক হত্যার কাহিনি বললে বইটির প্রতি অবিচার হবে। এটি একই সঙ্গে অপরাধের ইতিহাস, ঔপনিবেশিক কলকাতার সামাজিক দলিল এবং বিজ্ঞানকে অপরাধের অস্ত্রে পরিণত করার এক অস্বস্তিকর কাহিনি।
মরিসনের ভাষা তথ্যনির্ভর, কিন্তু শুষ্ক নয়। সাংবাদিকসুলভ সংক্ষিপ্ততা আছে, আবার উপন্যাসের মতো দৃশ্য নির্মাণের ক্ষমতাও আছে। পাঠক জানেন ঘটনাটি সত্যি; তবু পরের পাতায় কী আছে তা জানার আগ্রহ কমে না। কারণ লেখক রহস্যটিকে ‘কে খুনি’ প্রশ্নে আটকে রাখেননি। বরং প্রশ্ন করেছেন—এই হত্যার পরিকল্পনা কীভাবে তৈরি হল, বিজ্ঞান কীভাবে তার হাতিয়ার হল, এবং এত জটিল ষড়যন্ত্রের ভিত কোথায়?
এ কারণেই বইটি প্রচলিত রহস্যকাহিনির চেয়ে আলাদা। খুনি সম্পর্কে পাঠক অনেক আগেই ধারণা পেয়ে যান। আসল উত্তেজনা তৈরি হয় কীভাবে হত্যাটি ঘটানো হল সেই অনুসন্ধানে। একজন সমালোচকও বইটিকে ‘কে খুনি’ নয়, ‘কীভাবে খুন’—এই ধরনের অনুসন্ধান হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তবে মরিসনের বিস্তৃত অনুসন্ধানের একটি দুর্বল দিকও আছে। কখনও কখনও রোগের ইতিহাস, ঔপনিবেশিক সমাজ, আইন এবং পারিপার্শ্বিক তথ্যের বিস্তার মূল হত্যাকাহিনির গতি কিছুটা কমিয়ে দেয়। অন্য এক পর্যালোচনাতেও আইনি ও পারিপার্শ্বিক তথ্যের অতিরিক্ত বিস্তারের কারণে কোথাও কোথাও গতি শ্লথ হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তবু বইটির সামগ্রিক নির্মাণে এই অতিরিক্ত তথ্যই আবার সময়টাকে জীবন্ত করে। ত্রিশের দশকের কলকাতা, জমিদারি ব্যবস্থার ভিতরের লোভ, পারিবারিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, নতুন চিকিৎসাবিজ্ঞান, সিনেমার বিস্তার—সব মিলিয়ে একটি সময়ের প্রতিকৃতি তৈরি হয়। ‘বিষপ্রয়োগকারী বঙ্গ’ তাই শুধু একটি খুনের বই নয়। এটি এমন এক সময়ের দলিল, যখন পুরনো জমিদারি ক্ষমতা, আধুনিক বিজ্ঞান, জনপ্রিয় সংস্কৃতি এবং অপরাধবুদ্ধি এক অদ্ভুত বিন্দুতে এসে মিলেছিল। ড্যান মরিসন সেই বিস্মৃত বিন্দুটিকে নথি, অনুসন্ধান এবং গল্প বলার দক্ষতায় আবার দৃশ্যমান করেছেন।

Scroll to Top