দমদমের পাশাপাশি দিল্লিতে হচ্ছে দ্বিতীয় বিমানবন্দর

৩৬৫ দিন। পশ্চিমবঙ্গ সরকার নদীয়ার কল্যাণীতে একটি নতুন গ্রিনফিল্ড বিমানবন্দর গড়ে তোলার লক্ষ্যে এখন জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় জোর দিয়েছে। নদিয়া জেলার ৯টি মৌজায় সম্পত্তির নথি নিবন্ধন সাময়িকভাবে স্থগিত করে দেওয়া হয়েছে যাতে এই বৃহৎ প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমি সুরক্ষিত থাকে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী কল্যাণীতে এই গ্রিনফিল্ড বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য মোট প্রায় ২০০৯.৫ একর জমি লাগবে। এর মধ্যে কল্যাণী মৌজায় ৬১৪.২ একর এবং বিরপাড়ায় ৬০৭.৬ একর জমি লাগবে। এই দুই এলাকা মিলিয়ে ১২২১.৮ একর জমি চিহ্নিত করা হয়েছে রাজ্য সরকারের তরফে। বাকি জমির তালিকায় রয়েছে মুরুতিপুর ২৪৪.৩ একর, সারাতি ২০৪.৫ একর, উমাপুর ১৫৪.৫ একর, চর যাদুবতী ৭৬.৭ একর, ঈশ্বরীপুর ৫৩.৮ একর, চর মধুসূদনপুর ৩৬.৯ একর এবং গঙ্গামোহনপুর মৌজায় ৭ একর।
রাজ্য সরকারের হাতে ইতিমধ্যেই প্রায় ২৪১.৭ একর জমি রয়েছে। এর মধ্যে ১৭২ একরের একটি ইটভাটা, বিধান চন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৪ একর, বিএসএনএলের ১৩ একর, একটি পিকনিক গার্ডেনের ১৩ একর এবং নগরোন্নয়ন ও পুনর্বাসন দফতরের অধীনে ৯.৭ একর জমি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বাকি জমি এখনও সংগ্রহ করতে হবে। নবান্ন সূত্রের খবর, স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে কোনোভাবেই এই চিহ্নিত এলাকায় নতুন করে জমির মালিকানা হস্তান্তর না হয়। এতে করে ভবিষ্যতে জটিলতা এড়ানো সম্ভব হবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের পথ মসৃণ থাকবে।২০২৬–২৭ রাজ্য বাজেটে কল্যাণীর নতুন বিমানবন্দরের কথা ঘোষণা করা হয়েছিল। কলকাতা বিমানবন্দরের সম্প্রসারণের জায়গা সীমিত হওয়ায় ভবিষ্যতের যাত্রী ও পণ্য পরিবহণ সামলানোর বিকল্প হিসেবে প্রকল্পটি ভাবা হয়েছে। মুখ্যসচিব মনোজ পন্থ গত জুন মাসে ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তরকে লিখেছিলেন, দিল্লির জেওয়ার ও নবি মুম্বই বিমানবন্দরের মতো দ্বিতীয় বৃহৎ কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে রাজ্য সরকার। তার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য চিহ্নিত জমি এলাকার প্রাথমিক পরিকল্পনায় উত্তর-পূর্ব থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম অভিমুখে দুটি সমান্তরাল রানওয়ের কথা রয়েছে। রানওয়ে ও দুই প্রান্তের নিরাপত্তা-পরিসর মিলিয়ে প্রায় ৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এবং প্রায় ৫০০ মিটার প্রস্থ প্রয়োজন হতে পারে। পূর্ব দিকে যাত্রী ও পণ্য টার্মিনাল, বিমান রাখার জায়গা, বিমান চলাচলের পথ এবং নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারের সম্ভাব্য অবস্থান ভাবা হয়েছে। কল্যাণীতে এই নতুন বিমানবন্দর গড়ে উঠলে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন এলাকার মানুষের জন্য যাতায়াত সহজ হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। স্থানীয় অর্থনীতির ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।নদিয়া জেলার এই অঞ্চলগুলোতে কৃষিজমি এবং কিছু বসতি এলাকা রয়েছে। সরকার জমি অধিগ্রহণের সময় ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ মনে করছেন নতুন বিমানবন্দর এলে এলাকার উন্নয়ন হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে। আবার কেউ কেউ জমি হারানোর আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন। প্রশাসন বলছে, সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। কল্যাণী ইতিমধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। বিধান চন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এখানে রয়েছে।
নতুন বিমানবন্দর স্থাপিত হলে এই অঞ্চলের গুরুত্ব আরও বাড়বে। জাতীয় মহাসড়ক এবং রেল সংযোগের সঙ্গে মিলিয়ে এখানে একটি সমন্বিত পরিবহন কেন্দ্র গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। রাজ্য সরকারের লক্ষ্য হল যত দ্রুত সম্ভব জমি সুরক্ষিত করে পরবর্তী ধাপে পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং অন্যান্য অনুমোদনের কাজ এগিয়ে নেওয়া।বর্তমানে সম্পত্তি নিবন্ধন স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তটি সাময়িক। জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শেষ হলে এই বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হবে বলে নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে। স্থানীয় মানুষকে অনুরোধ করা হয়েছে যেন তারা কোনো গুজবে কান না দিয়ে সরকারি ঘোষণা অনুসরণ করেন। প্রশাসনিক কর্মকর্তারা বলছেন, এই প্রকল্প শুধুমাত্র কল্যাণী বা নদিয়ার জন্য নয়, পুরো রাজ্যের বিমান পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে। কলকাতা বিমানবন্দরের ওপর চাপ কমাবে এবং নতুন রুট চালু হওয়ার সুযোগ তৈরি করবে।

Scroll to Top