৩৬৫ দিন। সুমন আদক। হাওড়া: একটি পুজো, একটি পরিবার, আর তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা তিন শতাব্দীরও বেশি সময়ের ইতিহাস। প্রায় ৩১০ বছর আগে বাংলাদেশের ফরিদপুরে ঘটক পরিবারের দুর্গাপুজোর সূচনা হয়। পূর্বপুরুষদের হাত ধরে শুরু হওয়া সেই আরাধনা সময়ের স্রোত পেরিয়ে আজও বহমান। বদলেছে প্রজন্ম, বদলেছে ঠিকানা, বদলেছে চারপাশের সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা—কিন্তু বদলায়নি পুজোর রীতি ও পারিবারিক আবেগ। দেশভাগের সময় অসংখ্য পরিবারের মতো ঘটক পরিবারকেও ছেড়ে আসতে হয়েছিল ফরিদপুরের ভিটেমাটি। নতুন ঠিকানায় নতুন জীবন শুরু হলেও পূর্বপুরুষদের স্মৃতিবিজড়িত দুর্গাপুজোকে তাঁরা সঙ্গে করে নিয়ে আসেন পশ্চিমবঙ্গে। বর্তমানে কলকাতার রামগড়ের বাড়িতে সেই পুজোই হয়ে উঠেছে পরিবারের শিকড়ের সঙ্গে যোগসূত্রের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। ঘটকবাড়ির পুজোর বিশেষত্ব শুধু তার প্রাচীনত্বে নয়, রয়েছে নিজস্ব আচার ও প্রতিমা বিন্যাসেও।
শাক্ত মতে সমস্ত রীতি মেনে এখানে পুজো হয়। প্রায় তিন শতাব্দী ধরে চলে আসা প্রথা অনুযায়ী পুজোর তিনদিনই মহামায়ার সামনে বলি দেওয়া হয় এবং পরিবারেরই কোনও সদস্য নিজের হাতে সেই বলিদান সম্পন্ন করেন। প্রতিমার বিন্যাসেও রয়েছে স্বাতন্ত্র্য—মায়ের বাম দিকে থাকেন গণেশ, আর কার্তিকের অবস্থান কলাবউয়ের পাশে, মায়ের ডান দিকে। এই পুরনো রীতিই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে আসছেন পরিবারের সদস্যরা। ঘটক পরিবারের ইতিহাসের সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে একাধিক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। পরিবারের পূর্বপুরুষ বিধুভূষণ ঘটক ছিলেন মা সারদাদেবীর প্রত্যক্ষ শিষ্য। পরিবারের সূত্রে জানা যায়, ‘উদ্বোধন’-এ প্রকাশিত মা সারদার শিষ্যদের তালিকাতেও তাঁর নাম রয়েছে। স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গেও তাঁর যোগ ছিল বলে পরিবারের দাবি।
১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনে তিনি অংশ নিয়েছিলেন বলেও জানা যায়। ফলে এই পুজোর ইতিহাসের সঙ্গে ধর্মীয় ঐতিহ্যের পাশাপাশি জড়িয়ে রয়েছে পরিবারের সামাজিক ও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারও। তবে ঘটকবাড়ির দুর্গাপুজোর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ সম্ভবত পুজোকে ঘিরে পরিবারের পুনর্মিলন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা সদস্যরা, এমনকী বিদেশে থাকা পরিবারের লোকজনও পুজোর সময় রামগড়ের বাড়িতে ফেরার চেষ্টা করেন। বর্তমান প্রজন্মের অন্যতম আয়োজক প্রসেনজিৎ ঘটক জানান, দূরত্ব যতই থাকুক, দুর্গাপুজোর সময় পরিবারের সদস্যদের একত্রিত করার চেষ্টা থাকে। সকলের সম্মিলিত উদ্যোগেই বছরের পর বছর ধরে পুজোর আয়োজন হয়ে আসছে। প্রবীণদের স্মৃতিচারণ, মধ্যপ্রজন্মের দায়িত্ববোধ এবং নতুন প্রজন্মের কৌতূহল—সব মিলিয়ে পুজোর দিনগুলি হয়ে ওঠে এক আন্তঃপ্রজন্মের মিলনমেলা। নতুন প্রজন্ম এই পুজোর আচার ও পারিবারিক গল্পের মধ্য দিয়ে জানতে পারে ফরিদপুরের কথা, পূর্বপুরুষদের কথা এবং দেশভাগের সেই সময়ের কথা। সেই অর্থে ঘটকবাড়ির দুর্গাপুজো শুধু দেবী আরাধনার আয়োজন নয়; এটি একটি পরিবারের জীবন্ত ইতিহাস, যা সময়ের সঙ্গে নিজেকে বহন করে চলেছে। ফরিদপুর থেকে রামগড়—ভৌগোলিক দূরত্ব পেরিয়ে এই পুজো আজও ধরে রেখেছে পূর্ববঙ্গের স্মৃতি ও পারিবারিক শিকড়। রাজনৈতিক সীমানা বদলালেও ঐতিহ্যের সেই ধারায় ছেদ পড়েনি। প্রতি শরতে মহামায়ার আরাধনাকে ঘিরে তাই ফিরে আসে এক পুরনো সময়, এক হারানো ভূখণ্ডের স্মৃতি এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা ঘটক পরিবারের উত্তরাধিকার।
ফরিদপুরের মাটি থেকে রামগড়—দেশভাগ পেরিয়ে ৩১০ বছরের ঘটকবাড়ির দুর্গাপুজো




