৩৬৫ দিন।মহারানা প্রতাপকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তৈরি শূরবীর গান কেন মির্জাপুর দ্য মুভির একটি হিংসাত্মক দৃশ্যে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে ব্যবহার করা নিয়ে প্রশ্ন তুলল দিল্লি হাই কোর্ট।একটি জনস্বার্থ মামলা (পিআইএল)এর শুনানিতে আদালত প্রাথমিক ভাবে জানায়, ওই দৃশ্যে গানটির ব্যবহার ভালো রুচির পরিচয় বলে মনে হচ্ছে না।একই সঙ্গে আদালতের পর্যবেক্ষণ,আমরা এমন একটা পরিস্থিতিতে এসে পৌঁছেছি, যেখানে আমরা হিংসার মহিমা করছি।
বৃহস্পতিবার এই মামলার শুনানি হয় দিল্লি হাই কোর্টে। প্রধান বিচারপতি ডি কে উপাধ্যায় এবং বিচারপতি তেজস কারিয়ার বেঞ্চে বিষয়টি ওঠে। মির্জাপুর দ্য মুভির নির্মাতারা অবশ্য গানটির ব্যবহারকে ছবির দৃশ্যায়নের অংশ হিসেবেই ব্যাখ্যা করেছেন। তবে বিতর্কের মধ্যেই ছবির ওই অংশের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে পরিবর্তন আনার জন্য নির্মাতারা নিজেরাই কেন্দ্রীয় চলচ্চিত্র শংসাপত্র বোর্ড বা সিবিএফসি-র কাছে আবেদন করেছেন বলে আদালতকে জানানো হয়েছে।
হিংসার দৃশ্যে শূরবীর
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ছবির ক্লাইম্যাক্সের একটি লড়াইয়ের দৃশ্য। মির্জাপুর ফ্র্যাঞ্চাইজির পরিচিত গ্যাংস্টার-দুনিয়ার প্রেক্ষাপটে তৈরি এই ছবিতে প্রধান চরিত্রদের সঙ্গে প্রতিপক্ষ গোষ্ঠীর সদস্যদের সংঘর্ষের সময় শূরবীর গানটি ব্যাকগ্রাউন্ডে ব্যবহার করা হয়েছে।মহারানা প্রতাপের বীরত্ব, আত্মত্যাগ, সাহস ও সম্মানের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত এই গান। সেই কারণে গানটির মতো একটি সাংস্কৃতিক ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ সৃষ্টিকে অপরাধ,গ্যাং-যুদ্ধ এবং হিংসাত্মক দৃশ্যের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন মামলাকারী।শুনানিতে বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, দৃশ্যটির সঙ্গে গানটির এমন সংযোগ প্রাইমা ফেসি অর্থাৎ প্রাথমিক দৃষ্টিতে—ভালো রুচির” বলে মনে হচ্ছে না। আদালতের মন্তব্য,আমরা এমন একটা পরিস্থিতিতে এসে পৌঁছেছি, যেখানে আমরা হিংসার মহিমা করছি।আদালতের এই পর্যবেক্ষণ ঘিরেই মামলাটি নতুন মাত্রা পেয়েছে।
নির্মাতাদের যুক্তি,ঐতিহাসিক চরিত্রের সঙ্গে তুলনা নয় অন্য দিকে, ছবির নির্মাতাদের হয়ে সওয়াল করা আইনজীবী গানটির ব্যবহারকে সমর্থন করেছেন। তাঁর বক্তব্য, গানটি কোনও ভাবেই ছবির চরিত্রদের সঙ্গে মহারানা প্রতাপের তুলনা করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়নি। এটি শুধুমাত্র ছবির ক্লাইম্যাক্সকে আরও প্রভাবশালী করে তোলার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।
নির্মাতাদের পক্ষের আইনজীবীর বক্তব্য,কোনও চরিত্রের সঙ্গে ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের তুলনা করা হয়নি। এর সঙ্গে অপরাধেরও কোনও সম্পর্ক নেই। এটি দুই পক্ষের মধ্যে একটি লড়াই।অর্থাৎ, নির্মাতাদের দাবি, গানটির ব্যবহারের উদ্দেশ্য ছিল দৃশ্যটির আবহ ও নাটকীয়তা বাড়ানো। কিন্তু মামলাকারীর বক্তব্য, দর্শকের কাছে এই ব্যবহার অন্য রকম একটি সাংস্কৃতিক বার্তা পৌঁছে দিতে পারে।
সিবিএফসিকে এক সপ্তাহের সময়
মামলার শুনানিতে সিবিএফসির পক্ষ থেকে আদালতকে জানানো হয়, ছবির নির্মাতারাই ইতিমধ্যে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে পরিবর্তনের প্রস্তাব নিয়ে বোর্ডের দ্বারস্থ হয়েছেন। এরপর আদালত সিবিএফসিকে ওই প্রস্তাবের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে নির্দেশ দিয়েছে।আদালতের নির্দেশ, এক সপ্তাহের মধ্যে প্রস্তাবিত পরিবর্তন নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মামলাটির পরবর্তী শুনানি আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর।মামলাকারীর আইনজীবী শুনানিতে আরও প্রশ্ন তোলেন, ছবিটি ওটিটি প্ল্যাটফর্মে চলে গেলে এই পিআইএল-এর প্রয়োজনীয়তা আদৌ থাকবে কি না। তার জবাবে আদালত জানায়, নির্মাতারা যদি নিজেরাই গানটির জায়গায় পরিবর্তন আনেন এবং ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বদলে দেন, তা হলে মামলাটি দায়ের করার মূল উদ্দেশ্যই কার্যত পূরণ হয়ে যায়।
আগে থেকেই আদালতের নজরে ছিল দৃশ্যটি এই প্রথম নয়,ছবির ওই দৃশ্য নিয়ে আদালতে আলোচনা হল। এর আগের শুনানিতেও মির্জাপুর-দ্য মুভির সংশ্লিষ্ট অংশ নিয়ে আদালত প্রশ্ন তুলেছিল। সে সময় নির্মাতাদের আইনজীবীকে ছবিটি দেখে পরবর্তী শুনানিতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।বর্তমান শুনানিতে সেই বিতর্ক আরও স্পষ্ট হয়েছে। এক দিকে নির্মাতাদের দাবি, গানটির ব্যবহার নিছক সিনেমাটিক উপস্থাপনার অংশ।অন্য দিকে মামলাকারীর বক্তব্য, মহারানা প্রতাপের মতো ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ভাবে শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনও গানকে অপরাধ ও হিংসার দৃশ্যে ব্যবহার করা হলে তার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অভিঘাত বিবেচনা করা প্রয়োজন।
কী অভিযোগ মামলাকারীর?
প্রশান্ত কুমার সিংয়ের দায়ের করা পিআইএলে শূরবীর গানটির ব্যবহার নিয়েই মূল আপত্তি জানানো হয়েছে। আবেদনে বলা হয়েছে, মহারানা প্রতাপের ঐতিহ্য সাহস, আত্মত্যাগ ও সম্মানের সঙ্গে জড়িত। অথচ মির্জাপুর-দ্য মুভিতে গানটি এমন একটি পর্বে ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে গ্যাং-সংঘর্ষ, অস্ত্র, মাদক, তোলাবাজি এবং খুনের মতো অপরাধের উপাদান রয়েছে।
মামলাকারীর অভিযোগ, এই ধরনের দৃশ্যের সঙ্গে ঐতিহাসিক ভাবে শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত গানকে মিলিয়ে দেওয়া অনুচিত সাংস্কৃতিক বার্তা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে এই মামলা আরও একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে এনেছে-ঐতিহাসিক বা সাংস্কৃতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে যুক্ত গান, প্রতীক বা সৃষ্টিকে চলচ্চিত্রে ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্মাতাদের কতটা সংবেদনশীল হওয়া উচিত।এখন নজর সিবিএফসির সিদ্ধান্তের দিকে। এক সপ্তাহের মধ্যে বোর্ড কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং মির্জাপুর-দ্য মুভি এর বিতর্কিত দৃশ্যে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে কী পরিবর্তন আনা হয়, সেদিকেই তাকিয়ে সংশ্লিষ্ট মহল।
মির্জাপুর দ্য মুভিতে শূরবীর গান, আপত্তি দিল্লি হাই কোর্টের




