লাস্ট স্টোরিজ ৩।রিভিউ।চলছে নেটফ্লিক্সে

৩৬৫ দিন।সায়ন্তী অধিকারী । গল্প ১
ছবির শুরু বিক্রমাদিত্য মোতওয়ানের গল্প দিয়ে। সোনালি ও পদ্মার চরিত্রে রয়েছেন কঙ্কণা সেনশর্মা ও রাধিকা আপ্তে। দুই বান্ধবী, দু’জনেই বিবাহিত, কিন্তু নিজেদের দাম্পত্যজীবন নিয়ে দু’জনের মধ্যেই রয়েছে এক ধরনের অপূর্ণতা। তাঁদের স্বামীদের চরিত্রে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিজয় বর্মা।একটি সপ্তাহ শেষের সফরকে কেন্দ্র করে গল্প এগোয় এমন এক পরীক্ষার দিকে, যা তাঁদের বৈবাহিক জীবনে নতুন যৌন উত্তেজনা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে। তবে মোতওয়ানে বিষয়টিকে নিছক হাসির উপকরণ করেননি। বরং দেখিয়েছেন, দাম্পত্যে মানুষ শুধু সঙ্গী চায় না, চায় নিজেকে কাঙ্ক্ষিত বলেও অনুভব করতে।যদিও এখানে বলে রাখা ভালো মহারাষ্ট্রের কান্দেভেলিতে থাকা উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের গুপ্ত ইচ্ছের পরীক্ষা এই গল্প।কিন্তু সেখানে কোরিয়ান সিরিজকে মিলিয়ে একটু খেলো করে দেওয়া হয়েছে।কারণ সিরিজ দেখে মর্ডান হওয়ার দরকার ছিলো না।কঙ্কণা সেনশর্মা সোনালি চরিত্রে যথেষ্ট সাবলীল ও প্রাণবন্ত। তুলনায় রাধিকা আপ্তের পদ্মা চরিত্রটি আরও গভীর। নিজের ইচ্ছের সঙ্গে সামাজিক শালীনতার ধারণার সংঘাত পদ্মাকে অনেক বেশি পরিচিত ও বাস্তব করে তোলে। তাঁর অস্বস্তি থেকেই তৈরি হয় গল্পের বেশ কিছু মজার মুহূর্ত।তবে গল্পের পরিণতি খুব একটা অপ্রত্যাশিত নয়। বরং গল্পের মূল বক্তব্য অন্য জায়গায়-সম্পর্কে নতুনত্ব ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলেই পুরনো সমস্যা মুছে যায় না। অনেক সময় আকাঙ্ক্ষাকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা বরং প্রকাশ করে দেয়,সম্পর্কের আরও কত জায়গা দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল।এই গল্পটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, এখানে আকাঙ্ক্ষাকে কোনো বিচ্ছিন্ন বা নিষিদ্ধ অনুভূতি হিসেবে দেখানো হয়নি। বরং দীর্ঘদিনের দাম্পত্য, অভ্যাস এবং সামাজিক প্রত্যাশার মধ্যে কীভাবে ব্যক্তিগত ইচ্ছা ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যায়, সেটাই গল্পের ভেতরে উঠে আসে। সোনালি ও পদ্মার বন্ধুত্বও তাই নিছক গল্প এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যম নয়,তাঁদের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে দুই নারীর ভিন্ন মানসিক অবস্থান স্পষ্ট হয়। একজন যেখানে নিজের ইচ্ছাকে তুলনামূলক সহজে গ্রহণ করতে পারেন, অন্যজন সেখানে নিজের মধ্যেই প্রশ্নের মুখোমুখি হন। এই পার্থক্যই গল্পটিকে নিছক কমেডি হয়ে উঠতে দেয় না। বরং হাসির আড়ালে একটা অস্বস্তিকর সত্যিকে সামনে আনে।
গল্প ২
কিরণ রাওয়ের গল্পটি একেবারেই অন্য মেজাজের। মুম্বইয়ের পটভূমিতে পিৎজা ডেলিভারি কর্মী করণ ও নেল আর্টিস্ট লিসার আকস্মিক পরিচয় থেকেই শুরু গল্প। বছর ২৫ এর ছেলে-মেয়ে একে অপরের প্রতি আকর্ষিত হবে এটাই খুব স্বাভাবিক।করণের চরিত্রে গুরফতেহ পিরজাদা এবং লিসার চরিত্রে সানা থাম্পি।
প্রথম দেখাতেই আকর্ষণ তৈরি হয়। চকচকে উপস্থাপনার আড়ালে অবশ্য গল্পে রয়েছে অপরাধজগতের যোগসূত্র, করণের যমজ ভাই অর্জুন এবং একের পর এক প্রতারণার জটিলতা। লিসাও এখানে নিছক প্রেমের চরিত্র নন। করণের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ধীরে ধীরে তাঁকে নিজের পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেয়।কিরণ রাও গল্পটিকে খুব হালকা রেখেছেন। ফলে খুব গভীর মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান এখানে নেই। এটিই গল্পটির সীমাবদ্ধতা, আবার কিছুটা শক্তিও। এই চারটি গল্পের মধ্যে এটিই তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে পাতলা। তবে একটি আকর্ষণীয় ধারণা রয়েছে,ইচ্ছা সব সময় ঘনিষ্ঠতার জন্য নয়, কখনও কখনও জীবনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের হাতিয়ারও হয়ে উঠতে পারে।এই গল্পে শহুরে জীবনের গতি এবং আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বাস্তবতার সংঘাতটিও বেশ সুন্দরভাবে ধরা পড়ে। মুম্বই এখানে শুধু গল্পের পটভূমি নয়, বরং চরিত্রগুলির মতোই ছুটে চলা একটি জীবন্ত উপস্থিতি। করণ ও লিসার সম্পর্কের মধ্যে যে আকর্ষণ তৈরি হয়, তার সঙ্গে পাশাপাশি তৈরি হয় সন্দেহ, কৌতূহল এবং সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা। ফলে প্রেম এখানে যতটা অনুভূতির বিষয়, ততটাই হয়ে ওঠে পরিস্থিতি বোঝার এবং নিজের ভবিষ্যৎ বদলে নেওয়ার কৌশল। তবে গল্পটি আরও একটু সময় নিয়ে চরিত্রগুলির ভেতরে ঢুকতে পারলে এর আবেগের জায়গাটি নিঃসন্দেহে আরও শক্তিশালী হতে পারত।
গল্প ৩
শকুন বাত্রার গল্পটি সবচেয়ে বেশি আবেগ নির্ভর। আলি ফজল ও রাধিক্কা মদন অভিনীত বরুণ ও সাইনি দম্পতি বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সম্পর্ক শেষ করার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হলেও তাঁদের শারীরিক সম্পর্ক শেষ হয়নি। এখানেই গল্পের মূল দ্বন্দ্ব। কথা বলতে গিয়ে তাঁরা যেখানে বারবার সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছেন, সেখানে শারীরিক ঘনিষ্ঠতা যেন হয়ে উঠেছে তাঁদের শেষ অবশিষ্ট যোগাযোগের মাধ্যম।শকুন বাত্রার ছবিতে পারিবারিক সম্পর্কের বাইরের চকচকে মুখোশের নিচে জমে থাকা অস্বস্তি বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। এই গল্পেও তিনি দেখিয়েছেন, ভালোবাসা শেষ হয়ে গেলেও আকর্ষণ সবসময় একই সময়ে শেষ হয় না। বরুণ ও সাইনির ক্ষেত্রে সেই আকর্ষণ কখনও সাময়িক স্বস্তি দেয়, আবার কখনও সম্পর্ক ভাঙার আসল কারণগুলিকে মুখোমুখি হওয়ার প্রক্রিয়া পিছিয়ে দেয়।আলি ফজল ও রাধিক্কা মদনের অভিনয় গল্পটির অন্যতম শক্তি। কেউই পুরোপুরি খলনায়ক নন। দুজনেরই নিজস্ব ক্ষোভ ও যুক্তি রয়েছে। যদিও কিছু জায়গায় পরিচালক সংলাপের মাধ্যমে এমন বিষয় ব্যাখ্যা করেছেন, যা অভিনেতাদের অভিনয়েই যথেষ্ট স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।এই গল্পের আবেগের জায়গাটি সবচেয়ে পরিচিত লাগে কারণ বিচ্ছেদকে এখানে একদিনে ঘটে যাওয়া কোনো সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখানো হয়নি। বরং সম্পর্ক ভাঙার পরেও থেকে যাওয়া অভ্যাস, স্মৃতি, শরীরী টান এবং অসমাপ্ত কথাগুলো কীভাবে মানুষকে বারবার পুরনো জায়গায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়, সেই জটিলতাই গল্পের ভিত। বরুণ ও সাইনির সম্পর্ক তাই ভালো-মন্দের সরল হিসেব মানে না। তাঁদের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তার পাশাপাশি এমন কিছু মুহূর্তও রয়েছে যেখানে পুরনো পরিচিতি আবার ফিরে আসে। এই দ্বৈততাই গল্পটিকে সবচেয়ে মানবিক করে তোলে। ভালোবাসা শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও মানুষ যে সবসময় সঙ্গে সঙ্গে অপরিচিত হয়ে যেতে পারে না, গল্পটি সেই সত্যিটাই নিঃশব্দে মনে করিয়ে দেয়।
গল্প ৪
সবশেষে বিশাল ভরদ্বাজের গল্প যেন আগের তিনটির তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা জগতে নিয়ে যায় দর্শককে। ১৯৮০-র দশকের হায়দরাবাদ। সাহিত্য শিক্ষিকা সাইরার চরিত্রে অদিতি রাও হায়দরি। তাঁর স্বামী বদরুর চরিত্রে সিদ্ধার্থ।যদিও রিয়েল লাইফেও একে অন্যের পার্টনার তারা।গল্পে এই দাম্পত্যে ভালোবাসার অভাব নেই। সমস্যা অন্য জায়গায়।সাইরার কল্পনা তাঁর দৈনন্দিন জীবনের গণ্ডি ছাড়িয়ে যেতে শুরু করেছে। রোম্যান্টিক ও যৌন সাহিত্য পড়তে পড়তে একসময় নিজের গল্প লিখতে শুরু করেন তিনি। আর সেই লেখার মধ্য দিয়েই আবিষ্কার করেন নিজের এমন এক সত্তাকে, যার কথা এতদিন প্রকাশ্যে বলা সম্ভব হয়নি।ভরদ্বাজ এখানে নারী-আকাঙ্ক্ষাকে অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করেছেন। সময়কাল, হায়দরাবাদি সংলাপ, অভিনয়ের অতিরঞ্জন এবং দৃষ্টিনন্দন নির্মাণ-সব মিলিয়ে এটিই চারটি গল্পের মধ্যে সবচেয়ে বর্ণময় অংশ। অদিতি রাও হায়দরি সাইরা চরিত্রে অসাধারণ। তাঁর অভিনয়ে যেমন আকর্ষণ রয়েছে, তেমনই রয়েছে ব্যক্তিগত কল্পনা ও সামাজিক পরিচয়ের মধ্যে আটকে পড়া এক নারীর হাস্যরসাত্মক অসহায়তা। সিদ্ধার্থ বদরু চরিত্রে সরলতা ও আকর্ষণ-দুইয়ের মিশেল ঘটিয়েছেন। আর গজরাজ রাও পেয়েছেন গল্পের বেশ কিছু মজার মুহূর্ত।এই গল্পটির সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি তার নির্মাণশৈলীতে। তাছাড়া শুটিংয়ের জন্য যে বাড়িটি নেওয়া হয় তার মধ্যে একটা ঐতিহ্য রয়েছে।কারণ এদের পরিবার পারিবারিক কায়দায় ডাক্তারি করছেন।যাকে হাকিমি কায়দায়।আগের গল্পগুলির তুলনায় এখানে বাস্তবতার সঙ্গে কল্পনার সীমারেখা ইচ্ছাকৃতভাবেই ঝাপসা। সাইরার লেখা যেন তাঁর নিজের মনের দরজা খুলে দেয়, যেখানে সামাজিক পরিচয়ের বাইরে আরেকটি স্বাধীন সত্তা ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে। সেই কারণেই গল্পটি শুধু দাম্পত্য বা যৌন আকাঙ্ক্ষার গল্প হয়ে থাকে না; এটি হয়ে ওঠে নিজের ভেতরের কণ্ঠস্বরকে চিনে নেওয়ার গল্প। আশির দশকের সামাজিক পরিসর এই আত্ম-আবিষ্কারকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। কারণ যে সময়ে নিজের ইচ্ছেকে ভাষা দেওয়াটাই ছিল এক ধরনের সাহস, সেই সময়ে সাইরার কলমই হয়ে ওঠে তাঁর সবচেয়ে গোপন অথচ সবচেয়ে শক্তিশালী স্বাধীনতার জায়গা।
শেষ পর্যন্ত নারী মনের ইচ্ছের স্বাধীনতাই মূল কথা
লাস্ট স্টোরিজ ৩ নিখুঁত অ্যান্থোলজি নয়। চারটি গল্পের মধ্যে ভারসাম্যও সমান নয়। কোথাও গল্প বেশি শক্তিশালী, কোথাও ধারণা ভালো হলেও তার বাস্তবায়ন অপেক্ষাকৃত দুর্বল। কিন্তু চারটি গল্প মিলিয়ে ছবিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পৌঁছয় যৌন আকাঙ্ক্ষা শুধু শরীরের বিষয় নয়।কখনও তা দাম্পত্যের একঘেয়েমি ভাঙতে চায়, কখনও উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মিশে যায়, কখনও ভেঙে যাওয়া সম্পর্ককে কিছুদিন ধরে রাখে, আবার কখনও একজন নারীকে নিজের কল্পনা ও ইচ্ছেকে নিজের মতো করে চিনতে শেখায়।আর সম্ভবত এখানেই লাস্ট স্টোরিজ ৩ এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য। ইচ্ছাকে শুধু লুকিয়ে রাখা বা রোম্যান্সের আড়ালে ঢেকে রাখার বিষয় নয় তার নিজস্ব অস্তিত্ব আছে। সেই ইচ্ছা যখন সামাজিক নিয়মের সঙ্গে সংঘাতে যায়, তখনই তৈরি হয় অস্বস্তি, হাসি, নাটক এবং কখনও আত্ম-আবিষ্কারের মুহূর্ত। চার পরিচালকের চার ভিন্ন গল্প সেই বহুমাত্রিকতাকেই নিজেদের মতো করে তুলে ধরে।চারটি গল্পের মধ্যে তাই সরাসরি কোনো একটি সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। বরং প্রতিটি গল্প নিজের মতো করে প্রশ্ন তোলে-একজন নারী আসলে নিজের ইচ্ছেকে কতটা নিজের বলে ভাবতে পারেন? সমাজ, সম্পর্ক, বিবাহ, ভালোবাসা কিংবা নৈতিকতার নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে থেকেও কি নিজের আকাঙ্ক্ষাকে স্বীকার করা সম্ভব? ছবিটির উত্তর সরল নয়, আর সেখানেই এর সাফল্য। কারণ ইচ্ছেকে স্বাধীনতা দেওয়ার অর্থ সবসময় কোনো বাঁধন ভেঙে ফেলা নয়,কখনও নিজের মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কথাটিকে প্রথমবার স্বীকার করে নেওয়াও এক ধরনের মুক্তি। চার পরিচালকের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা হলেও তাঁদের গল্পের কেন্দ্রে শেষ পর্যন্ত সেই আত্মস্বীকৃতিই ফিরে আসে। নারীকে এখানে শুধু কারও স্ত্রী, প্রেমিকা বা আকাঙ্ক্ষার বস্তু হিসেবে দেখা হয়নি; তাঁকে দেখা হয়েছে নিজের ইচ্ছা, দ্বিধা, কল্পনা এবং সিদ্ধান্ত নিয়ে সম্পূর্ণ একজন মানুষ হিসেবে। আর এই জায়গাটিই লাস্ট স্টোরিজ ৩-কে নিছক যৌনতা-কেন্দ্রিক অ্যান্থোলজির সীমা পেরিয়ে আরও বিস্তৃত এক মানবিক আলোচনায় নিয়ে যায়।

Scroll to Top