উদয়শঙ্করের শিল্পস্মরণে ‘শঙ্কর নামা’, অভিজিৎ ঘটকের ভাবনায় সাজছে জগৎ মুখার্জি পার্ক

৩৬৫ দিন।শ্রীদাত্রী ঠাকুর। নৃত্য শুধু শরীরের ছন্দ নয়, তার মধ্যে লুকিয়ে থাকে ইতিহাস, স্থাপত্য, ভাস্কর্য, চিত্রকলা এবং একটি দেশের সংস্কৃতির দীর্ঘ যাত্রা। সেই শিল্পভাবনাকেই দুর্গাপুজোর মণ্ডপে তুলে ধরতে এ বার জগৎ মুখার্জি পার্কের ভাবনা ‘শঙ্কর নামা’। কিংবদন্তি নৃত্যশিল্পী উদয়শঙ্করের ১২৫ বছরকে সম্মান জানিয়ে তাঁর শিল্পসত্তা ও ভারতীয় শিল্পের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগকে কেন্দ্র করেই সাজছে এবারের পুজো।
মণ্ডপের শিল্পভাবনার নেপথ্যে রয়েছেন শিল্পী অভিজিৎ ঘটক। তাঁর কথায়, ভারতবর্ষের শিল্পের ইতিহাস নিয়ে কাজ করতে বরাবরই তাঁর আগ্রহ। সেই সূত্রেই উদয়শঙ্করকে নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে এই ভাবনার জন্ম। শিল্পীর বক্তব্য, উদয়শঙ্কর নৃত্যের মধ্যে ভারতীয় সৃষ্টি, স্থাপত্য এবং ভাস্কর্যের নানা উপাদানকে দেখেছিলেন এবং সেখান থেকেই তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। সেই নৃত্যভাবনাকে এবার অন্য এক শিল্পমাধ্যমে ধরার চেষ্টা করছেন তিনি।
মণ্ডপে ভারতীয় শিল্পের বিভিন্ন ধারার মেলবন্ধন ঘটানো হচ্ছে। অজন্তার গুহার ফ্রেস্কোচিত্র, ইলোরার শিল্প ও ভাস্কর্য, রাজস্থানি শিল্প এবং ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের ছোট ছোট স্থাপত্য কাঠামোর আদল মণ্ডপের নকশায় ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে দর্শকের সামনে শুধু একটি পুজোমণ্ডপ নয়, ভারতীয় শিল্পের নানা পর্বের একটি দৃশ্যভাষা তৈরি হবে। মণ্ডপ নির্মাণে ব্যবহার করা হচ্ছে প্লাই, বাতাম, লোহা এবং চিত্রকর্ম। প্রায় ২০-২২ জন শিল্পী শিল্পীর তত্ত্বাবধানে কাজ করছেন। গত দু’মাস থেকে আড়াই মাস ধরে চলছে নির্মাণের কাজ। উদয়শঙ্করের শিল্পজগতকে আরও বাস্তবভাবে তুলে ধরতে তাঁর ব্যবহৃত পোশাক এবং বিভিন্ন সামগ্রীও মণ্ডপের ভাবনায় যুক্ত হচ্ছে। এ বিষয়ে শিল্পীর সঙ্গে সহযোগিতায় রয়েছেন উদয়শঙ্করের কন্যা মমতা শঙ্কর। তাঁর কাছ থেকে উদয়শঙ্করের পোশাক ও ব্যবহৃত সামগ্রী সম্পর্কে তথ্য নিয়ে মণ্ডপের উপস্থাপনার সঙ্গে সেগুলিকে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। মণ্ডপের পাশাপাশি প্রতিমাতেও থাকছে বাংলার নিজস্ব ঐতিহ্য। শিল্পীর কথায়, প্রতিমা হবে একেবারে সাবেকি বাংলার ঠাকুর। মহিষাসুরমর্দিনীর চিরাচরিত রূপ, বাঙালি ঘরানার মুখাবয়ব এবং শান্ত অথচ ঐতিহ্যনির্ভর অভিব্যক্তিই থাকবে প্রতিমায়। পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পুজো কমিটির সদস্যের কথায়, ২০১৬ সাল থেকে জগৎ মুখার্জি পার্ক থিমের মাধ্যমে প্রতি বছর দর্শকদের নতুন কিছু দেখানোর চেষ্টা করছে। এবারের ভাবনায় উদয়শঙ্করকে বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ, বর্তমান প্রজন্মের অনেকের কাছেই তাঁর শিল্পসাধনা অপরিচিত। তাই তাঁর কাজ ও অবদানকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতেই ‘শঙ্কর নামা’-র পরিকল্পনা। কমিটির তরফে আরও জানানো হয়েছে, উদয়শঙ্করের পোশাক, তাঁর নৃত্যশৈলী এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত সামগ্রীও মণ্ডপের উপস্থাপনায় গুরুত্ব পাবে। প্রায় ৩০-৩৫ জন শিল্পী প্লাই, টিন, পেন্টিং-সহ বিভিন্ন কাজে যুক্ত রয়েছেন। সব মিলিয়ে জগৎ মুখার্জি পার্কের এবারের আয়োজন হয়ে উঠতে চলেছে নৃত্য, স্থাপত্য, চিত্রকলা ও ভাস্কর্যের সমন্বয়ে উদয়শঙ্করের শিল্পজগতের এক অভিনব পুনর্নির্মাণ।

Scroll to Top