৩৬৫ দিন। তপন বকসি। মুম্বাই। বৃহস্পতিবার সকালে গোয়ার বাড়িতে হৃদ্রোগে আক্রান্ত প্রয়াত হলেন ভারতীয় হিন্দি সিনেমার বলিষ্ঠ অভিনেতা নানা পাটেকর। দীর্ঘক্ষণ চেষ্টা করেও বাঁচানো গেল না এই বর্ষীয়ান অভিনেতাকে। নানার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। পরে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে তাঁকে বাঁচানোর শেষ করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ভোর ৫টা ২০ মিনিটে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করেন চিকিৎসকেরা।
নানা পাটেকরের ছেলে মলহার পাটেকর জানিয়েছেন, সকাল বেলায় গোয়ার বাড়িতে বুকে ব্যথা অনুভব করেন নানা। শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। সঙ্গে সঙ্গে নিজেই ডাক্তারকে ফোন করেন। ডাক্তাররা বাড়িতে এলে দেখতে পান ততক্ষণে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েছেন নানা। এরপরেই ডাক্তাররা দ্রুত তাঁকে মণিপাল হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালে পৌঁছে চিকিৎসকেরা দীর্ঘ সময় ধরে সিপিআর-সহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চালালেও তাঁর সাড়া মেলেনি বলে জানিয়েছেন মণিপাল হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগের প্রধান চিকিৎসক শেখর সালকর। এই ঘটনায় আইন অনুযায়ী একটা মেডিকো লিগ্যাল(এমএলসি) কেস নথিভুক্ত করা হয়েছে। নানার মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত করতে ময়নাতদন্ত করা হবে বলেও জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। নানা পটেকরের ছেলে মলহার পাটেকর সেই সময় পুনেতে ছিলেন। বাবার মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর তিনি গোয়ার উদ্দেশে রওনা হয়েছেন বলে সূত্রের খবর।
১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রে জন্ম নানা পাটেকরের। তীব্র অভিনয়শক্তি, সংলাপ বলার নিজস্ব ভঙ্গি এবং জটিল ও ব্যতিক্রমী চরিত্রকে পর্দায় জীবন্ত করে তোলার ক্ষমতার জন্য তিনি ভারতীয় সিনেমায় একটা আলাদা জায়গা তৈরি করেছিলেন। ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ ছবির মাধ্যমে বলিউডে তাঁর অভিষেক। পরবর্তী সময়ে ‘পরিন্দা’, ‘ওয়াজুদ’, ‘অব তক ছাপ্পন’, ‘অপরাধান’, ‘ইয়শবন্ত’, খামোশি -দ্য মিউজিক্যাল’, ‘অগ্নিসাক্ষী’- সহ একাধিক ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করে। ‘নটসম্রাট’ ছবিতে তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। ছবিটি ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি মুক্তি পায়। এই ছবিতে নানার চরিত্রের নাম ছিল ‘গণপত রামচন্দ্র বেলওয়ালকর’। যিনি মঞ্চে ‘নটসম্রাট’ এবং পরিবারে ‘আপ্পা’ নামেও পরিচিত ছিলেন। এই সিনেমায় অসাধারণ ও মর্মস্পর্শী অভিনয়ের জন্য নানা পাটেকর ফিল্মফেয়ার মারাঠি পুরস্কারে ‘সেরা অভিনেতা’ এবং জি গৌরব পুরস্কারে ‘সেরা অভিনেতা’ অর্জন করেন। শুধু গম্ভীর চরিত্রেই নয়, নানা পটেকরের অভিনয়ের পরিসর ছিল বিস্তৃত। ‘ওয়েলকাম’ ছবিতে উদয় শেট্টির চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের কাছে বিপুল জনপ্রিয় হয়। পরে ‘ওয়েলকাম ব্যাক’-এও একই চরিত্রে ফিরে আসেন তিনি। ‘হাউসফুল ৫’-এও তাঁকে অভিনয় করতে দেখা গিয়েছিল। ‘রাজনীতি’ ছবিতেও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি।
অভিনয়ের পাশাপাশি প্লেব্যাক গায়ক হিসেবেও কাজ করেছেন নানা পটেকর। ‘ইয়শবন্ত’ (১৯৯৭), ‘ওয়াজুদ’ (১৯৯৮) এবং ‘আঁচ’ (২০০৩) ছবিতে তাঁর কণ্ঠ শোনা গিয়েছে।
ভারতীয় চলচ্চিত্রে তাঁর দীর্ঘ ও উল্লেখযোগ্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে নানা পটেকর তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। ২০১৩ সালে তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানেও ভূষিত করা হয়। অভিনয়ের বাইরেও নানা পটেকর বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিশেষ করে কৃষক ও কৃষিসঙ্কটে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির পাশে দাঁড়ানোর জন্য তাঁর উদ্যোগের কথা বারবার উঠে এসেছে। মৃত্যুর মাত্র চার দিন আগেও গোয়ার ডোনা পাউলায় একটি অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। সেখানে ‘সম্রাট ক্লাব ইন্টারন্যাশনাল’-এর একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে বক্তব্যও রেখেছিলেন তিনি। তাঁর মৃত্যুতে ভারতীয় হিন্দি সিনেমার জগতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে নানা পটেকর যে স্বতন্ত্র অভিনয়ভাষা তৈরি করেছিলেন, তা ভারতীয় সিনেমায় তাঁর স্মৃতিকে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখবে।




