শহরে ব্যাপক ছড়াচ্ছে সোয়াইন ফ্লু
আতঙ্কিত হবেন না, আশ্বাস ডাক্তার,বিশেষজ্ঞদের

৩৬৫ দিন। দিনে পনেরশো পাওয়ারের প্যারাসিটামল খেয়েও জ্বর কমছে না। সঙ্গে অসহ্য শরীরে ব্যথা। কারোর আবার ভয়ংকর পেটের গন্ডগোল। ডাক্তারের চেম্বারে মরশুম বদলের ধাক্কা নিয়ে রোজ বাড়ছে ভিড়। কারোর আবার এসব উপসর্গের কোনটাই নয়,অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়ে যাচ্ছে রক্তচাপ জ্বর,সুগার লেভেল, সর্দি কাশি ছাড়াই শুকনো কাশি। ফলে রোগীদের মতই প্রাথমিকভাবে বিভ্রান্ত হচ্ছেন ডাক্তাররাও। বর্ষার ঠিক পরেই সিজনাল ভাইরাল ফ্লু এর সঙ্গে প্রচুর উপসর্গের, মিল থাকার কারণে এই বিভ্রান্তি। ফলে খুব দ্রুত এবং নিঃশব্দে কলকাতা শহরে ব্যাপকভাবে হানা দিয়েছে এই এইচ১ এন১ ভাইরাস বা সোয়াইন ফ্লু। গতবারের থেকে প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে সোয়াইন ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা। কেবল মাত্র শিশুমঙ্গল হাসপাতালে সোয়াইন ফ্লুর উপসর্গ নিয়ে গত ১৫ দিনে চিকিৎসা করাতে এসেছে প্রায় ২০০ জনেরও বেশি রুগী। তবে এদের মধ্যে শিশুদের সংখ্যাই নব্বই শতাংশ। ডক্টর প্রভাস মহারাজ জানালেন, প্যারাসিটামল এবং ইনফ্লুয়েঞ্জার ভ্যাকসিন দিয়েই আমরা চিকিৎসা করছি। শিশুদের ক্ষেত্রে শরীরে ফ্লুইড কমে যাওয়ার প্রবণতা কানোটা আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য। বর্ষা ছাড়র সময়, এই ধরনের ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত রোগীরা আসেন। রক্ত পরীক্ষা করে সোয়াইন ফ্লু পাচ্ছি। ম্যালেরিয়া বা ডেঙ্গুর মতোই উপসর্গ নিয়ে শিশুরা আসছে। আমাদের একটু সাবধান থাকতে হবে।
সরকারি থেকে বেসরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগ, চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারে প্রতিদিন ভিড় বাড়ছে জ্বর-কাশিতে আক্রান্ত রোগীর। শ্বাসকষ্ট বা পেটে সংক্রমণ নিয়ে হাসপাতালেও ভর্তি হচ্ছেন অনেকে। বৃষ্টির এই মরসুমে এই সব রোগীই যে ডেঙ্গি বা ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন, তেমনটা নয়। প্রাথমিকভাবে ছোটদের এবং বয়স্কদের মধ্যে এর প্রভাব দেখা গেলেও, এখন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে কম বয়সীরাও। কলকাতায় যদিও ব্যাপক হারে সোয়াইন ফ্লুড সংক্রমণ ছড়ায়নি, ফলে এই মুহূর্তে উদ্বেগের কারণ নেই বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু এই শহরের বিপুল জনসংখ্যা এর ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করছেন ভাইরোলজিস্টরা। চেন্নাই এইমসের ভাইরাস বিশেষজ্ঞ বাঙালি গবেষক ডক্টর অনির্বাণ চক্রবর্তী জানালেন, গত কয়েক মাসে সোয়াইন ফ্লু ভাইরাস নিয়ে আতঙ্ক বেড়েছে। দিল্লি, বেঙ্গালুরু, পুণেতে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। সম্প্রতি বেঙ্গালুরুর একটি স্কুলে পাঁচশোর বেশি পড়ুয়া একসঙ্গে সংক্রমিত হওয়ায় উদ্বেগ বেড়েছিল। তবে দেশের শীর্ষ চিকিৎসা গবেষণা সংস্থা ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ জানিয়েছে, সোয়াইন ফ্লু নিয়ে এখনই আতঙ্কের কারণ নেই। যে প্রজাতির সোয়াইন ফ্লু এখন দেশে ছড়িয়েছে, সেটি হল এ, মিসৌরি ১১,২০২৫ এইচ১এন১ এবং পিডিএম০৯। ভাইরাসের নতুন কোনও প্রজাতি আসেনি। তবে সংক্রমণ যেহেতু ঘটছে, তাই সতর্ক থাকা জরুরি।
সোয়াইন ফ্লু ,এইচ ১এন ২
সোয়াইন ফ্লু (এইচ১এন১) ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসেরই একটি রূপ। তাই ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো এই ভাইরাসও তার চরিত্র বদলে ফেলতে পারে, অর্থাৎ, ভাইরাসে জিনের বদল বা মিউটেশন খুব দ্রুত ঘটতে পারে। ভাইরাস যদি তার চরিত্র বদলে নতুন প্রজাতি তৈরি করে ফেলে, তা হলে ভয়ের কারণ থেকে যায়।বর্তমানে ইনফ্লুয়েঞ্জার যে টিকাটি দেওয়া হয়, সেটিই এই প্রজাতির সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য উপযুক্ত। তবে শিশু, বয়স্ক ও যাঁদের আগে থেকে হার্টের রোগ, ফুসফুসের রোগ বা ডায়াবিটিস রয়েছে, তাঁদের বেশি সতর্ক থাকতে হবে।শুরুর দিকে শূকরের শরীর থেকে সোয়াইন ফ্লু ভাইরাস মানুষের শরীরে সংক্রমিত হলেও, এখন এটি বাতাসবাহিত সংক্রমণে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ, আক্রান্তের হাঁচি-কাশি, থুতু-লালা থেকে ওই ভাইরাস সহজেই ছড়িয়ে পড়তে পারে ও বাতাসে ভেসে সুস্থ মানুষের শরীরে ঢুকে পড়তে পারে।
আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই
সোয়াইন ফ্লু নিয়ে অকারণে আতঙ্ক করার দরকার নেই, এমনটাই বলছেন অভিজ্ঞ ডাক্তাররা। দেশে বর্তমানে যে স্ট্রেনটি সক্রিয় রয়েছে তা পুরনো সিজনাল এইচ১এন ১ ভাইরাসেরই রূপ, নতুন কোনো বিপজ্জনক প্রজাতির সন্ধান মেলেনি।ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিরা,যেমন প্রবীণ ও শিশুরা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ফ্লু ভ্যাকসিন গ্রহণ করতে পারেন। জানালেন অভিজ্ঞ ডাক্তার সমরজিৎ নস্কর। তিনি কিছু সতর্কতা অবলম্বন করতে পরামর্শ দিচ্ছেন। যেমন,ভিড় এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজনমতো মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। বাইরে থেকে এসে বারবার সাবান ও জল দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলা।জ্বর বা সর্দি-কাশি দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে অবহেলা না, নিজের বুদ্ধিতে ওষুধ না খেয়ে,করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

Scroll to Top