সিপিএমের সঙ্গে মমতা তৃণমূলের নতুন সমীকরণ
পার্টির সাধারণ সম্পাদক বেবির সঙ্গে মমতার কথা চিঠি

৩৬৫ দিন। কোনও প্রেমপত্র আদান-প্রদান হয়নি। আমি আবার বলছি, সিপিআইএম এবং বামপন্থী দলগুলির পক্ষ থেকে আমরা আলোচনা করেছি যে এসআইআর, ভোট, সাংবিধানিক কাঠামোকে রক্ষা করার জন্য বৃহত্তর আন্দোলনে যেতে হবে। সিপিএমের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবির সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিঠির আদান-প্রদান এবং ফোনালাপের প্রেক্ষিতে বিজেপির বিরুদ্ধে মমতা ও সিপিএম কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াইয়ের যে প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে সেই সম্পর্কে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করলেন বাংলায় সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মোঃ সেলিম। তৃণমূলের জন্ম লগ্ন থেকে সিপিএম বিরোধীতা যেমন প্রত্যেকটি শিরায় উপশিরায় প্রবাহিত হয়েছে, ঠিক তেমনভাবেই দীর্ঘকাল ধরে বাংলায় বিজেপি এবং তৃণমূলকে একযোগে আক্রমণ শানিয়েছে সিপিএম। এমনকি বিগত কয়েকটি নির্বাচনের তৃণমূলকে ঠেকানোর জন্য সিপিএম বিজেপির সঙ্গে গোপনে হাত মিলিয়ে বাম রাম জোট করার পরেও খাতায়-কলমে তারা আক্রমণ করে গিয়েছে তৃণমূল ও বিজেপিকে এক গোষ্ঠীতে রেখে।
এমনকি এর আগেও প্রকাশ কারাতের নেতৃত্বে হোক অথবা প্রয়াত সীতারাম ইয়েচুরির নেতৃত্বে যখনই জাতীয় স্তরে বিজেপি বিরোধী জোটের অংশ হিসেবে তৃণমূল এবং সিপিএমের একসঙ্গে কাছাকাছি আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সিপিএমের কমরেডরা। জ্যোতি বসু থেকে শুরু করে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বা সুজন চক্রবর্তীরা প্রত্যেকবারই কেন্দ্রীয় সিপিএম নেতৃত্বকে জানিয়ে দিয়েছেন নো মমতা। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এবারে হয়তো বদলাতে চলেছে আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের সেই অবস্থান। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে গোটা দেশ জুড়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে তার প্রেক্ষিতে এবারে শত্রুর শত্রু আমার মিত্র এই থিওরি সামনে রেখে সিপিএমের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি সরাসরি চিঠি দিয়েছেন মমতা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। থেকে যেমন ভাবে চিঠি পাঠিয়েছেন দেশের অন্যান্য বিজেপি বিরোধী প্রধান রাজনৈতিক দলগুলির শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে। মমতাও ২৬ এর বিধানসভা নির্বাচনের ফল বেরোনোর পর থেকে বারে বারে বিভিন্ন জনসভা থেকে এবং নিজের বক্তব্যে বারে বারে তুলে ধরেছেন কিভাবে বিজেপিকে ঠেকাতে বাম দলগুলির সঙ্গে তিনি যাবতীয় ইগো ভেঙে লড়াই করতে প্রস্তুত। এবারে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে সেই প্রেক্ষাপট যখন তৈরি হতে চলেছে তাকে বাংলার সিপিএম যে দূরে সরিয়ে রাখতে চায় না তার স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে রাজ্য সম্পাদক মোঃ সেলিমের কথায়। সেলিম জানান, ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ২ অক্টোবর পর্যন্ত আন্দোলনে গোটা দেশকে আহ্বান জানানো হয়েছে। সমস্ত দল যারা বিজেপি-র হাতে তামাক খায় না তাদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। সেই চিঠিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উৎসাহ দেখিয়েছেন। বেবিকে ফোন করে বলেছেন, আমরাও আছি। আমরা চাই সবাই রাস্তায় নামুক, আন্দোলন সংগ্রাম করুক। তার মানে একসঙ্গে ভোট করা নয়। একসঙ্গে যাওয়া, এগুলি বাড়তি কথা।
এমনকি আগামী সপ্তাহেই যেখানে দিল্লীতে ইন্ডিয়া জোটের শরিক দলগুলি বিজেপির বিরুদ্ধে এবং নির্বাচন কমিশনের স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আন্দোলনে নামার জন্য বৈঠকে বসতে চলেছে সেই আবহে বাংলাতেও বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে মমতার তৃণমূল এবং সিপিএম কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করবে কিনা, সেই সম্ভবনা নিয়ে যখন বাংলার রাজনীতি তোলপাড় হচ্ছে তার প্রেক্ষিতে সেলিমের বক্তব্য, যখন ইন্ডিয়া জোট তৈরি হয়েছিল, তখন তো বিভিন্ন রাজ্যে ইন্ডিয়া জোটের দলগুলির মধ্যে নির্বাচনে লড়াই হয়েছিল। রাজনীতি মানেই নির্বাচন সর্বস্ব নয়। আমরা বলছি মানুষের লড়াইয়ের কথা। সেখানে সবাইকে সামিল করতে হয়। আপনারাই বলেন আমরা ভোট ছাড়া কিছু করি না। আবার যখন করি তখন বলেন সেখানে ভোটের গন্ধ। ইন্ডিয়া ব্লক মাঝেমধ্যে জেগে ওঠে আবার মাঝেমধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে। আমরা বলেছিলাম এটাকে সক্রিয় করতে হবে। এসআইআর, জ্ঞানেশ কুমার ইস্যু, নতুন ভোটারদের নাম না তোলার মতো বিষয়গুলি নিয়ে ইন্ডিয়া ব্লকের একটা বক্তব্য তো থাকতে হবে। বামপন্থী দলগুলি আগেই বৈঠক করে বলেছে এ বিষয়ে ইন্ডিয়া ব্লকের অবস্থান নিতে হবে।
যদিও সিপিএম এবং মমতার তৃণমূলের মধ্যে জোট বা সমঝোতা তৈরীর যে প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে তা দলের রাজ্য কমিটির সদস্যদের কাছে আরো বিস্তারিতভাবে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক দেবী ব্যাখ্যা করবেন বলে জানিয়েছেন বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু। বিমান বসু জানান, এম এ বেবি সবাইকে চিঠি লিখেছেন। ইন্ডিয়া ব্লকের সবাইকে চিঠি লেখা হয়েছে। যেহেতু মমতা ইন্ডিয়া ব্লকের অংশ, তাই তাঁকেও চিঠি দিতে হয়েছে। তারপর, তিনি চিঠির উত্তর দিয়েছেন এবং জানিয়েছেন আমি আপনাদের সঙ্গে আছি। দলের ভেতরে পুরো বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে। বেবি আলোচনা করবে। তারপর সামগ্রিকভাবে কথা বলবে।

Scroll to Top