৩৬৫ দিন। রানী দত্ত শর্মা।
লালমোহন গাঙ্গুলি তার রহস্য উপন্যাসের নাম দিয়েছিলেন বোর্নিওর বিভীষিকা। জনপ্রিয় সেই ফিকশন বাঙালির স্মৃতিতে আছে। তবে সেই বিভীষিকা ওরাং ওটাং কি না কিংবা ওরাং ওটাং এর টাগরায় হীরে আটকানো ছিল কি না, তা পরিষ্কার করে বলেননি স্রষ্টা। তবে আশ্চর্য এবং বিরল প্রাণীটি আসলে বোর্নিওর মূল আকর্ষণ। চারিদিকে তাকালে উচু উঁচু গাছ স্যাঁত মাটি, বৃষ্টির ফোঁটা মাটিতে পৌঁছাতে সময় লাগে এক মিনিটেরও বেশি। কথা বলছি এশিয়ার অ্যামাজন তথা মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়াজুড়ে বর্ষা অরণ্য, রেইন ফরেস্ট বোর্নিও দ্বীপকে নিয়ে। যেখানে ১৫ হাজারেরও বেশি নানান প্রজাতি বসবাস করে। তার মধ্যে একদিকে যেমন রয়েছে আশ্চর্য লম্বা নাক যুক্ত প্রোবোসিস বানর, এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে ছোট্ট হাতি, পিগমি হাতি, সান বিয়ার এবং আশ্চর্য ও অবাক করা বিরল পাখিদের দুনিয়া এবং যে প্রাণীটার কথা না বললেই নয়, সেই ওরাং ওটাং এই অরণ্যের বিরলতম অলঙ্কার। অনেকেই জানে না, এই রেইন ফরেস্ট-সহ দ্বীপের বয়স অ্যামাজনের থেকেও বেশি। আনুমানিক ১৪০ মিলিয়ন বছর আগে ভয়ঙ্কর দ্বিতীয় প্রলয়ের পরে দ্বীপটি তৈরি হয়েছিল। আয়তনে জার্মানের প্রায় দ্বিগুণ। বড় এই বর্ষা অরণ্যের উত্তরে আছে দক্ষিণ চিন সাগর, পশ্চিমে মালাক্কা ও জাভা সাগর।
বোর্নিওর ভৌগোলিক গুরুত্ব
বোর্নিও দ্বীপ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে বিস্তৃত। এর উত্তরে যেমন আছে চিন সাগর, তেমন পূর্বদিকে আছে মাকাসার প্রণালী। দ্বীপটি বিষুবরেখার কাছে অবস্থান করার কারণে সারা বছর এখানে বর্ষাকাল বিরাজ করে। এই আর্o আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে তৈরি হয়েছে এক আশ্চর্য জীববৈচিত্র্য বা বায়ো ডাইভারসিটি। এক আশ্চর্য জগৎ। এবার আসা যাক রাজনৈতিক মানচিত্রে, দীপ্তির দক্ষিণ ও মধ্যভাগের বিশাল অংশ ইন্দোনেশিয়ার অন্তর্ভুক্ত। অপরদিকে, দ্বীপের উত্তর উপকূলে বিরাজ করছে সমৃদ্ধ দেশ ব্রুনেই। এই কারণে বোর্নিও একদিকে যায় ইন্দোনেশিয়া অপরদিকে মালয়েশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত । বোর্নিওর আসল পরিচয় বসবাসকারী জীববৈচিত্র্যকে নিয়ে। সে বিখ্যাত প্রাণীদের একটি হল বর্নিওয়ান ওরাংওটাং। এই ওরাং ওটাং শব্দের আক্ষরিক বাংলা অর্থ হল বনমানুষ। যা ডিএনএ-র ৯৭ শতাংশ মানুষের ডিএনএ-র সাথে মেলে। বর্তমান সময়ে এই ওরাং ওটাংয়ের চাহিদা চোরা বাজারে অনেকটাই বেশি। সম্প্রতি ভারতের ওড়িশা বালেশ্বর-এ একটি জঙ্গলে পাঁচটি ওরাং ওটাং শাবকের দেখা মেলে। দাঁড়াও ইন্দোনেশিয়ার এই অঞ্চল থেকে চোরা পথে ভারতে আনা হয়েছে বলে ধারণা করছেন তদন্তকারীরা। কেবলমাত্র ওরাং ওটাং নয়, এই অঞ্চলে দেখা যায় প্রবোসিস অর্থাৎ লম্বা নাক যুক্ত বানর থেকে শুরু করে পিগমি হাতি, মেঘলা চিতাবাঘ, সান বিয়ার, নানা ধরনের গিবন। উদ্ভিদের মধ্যে এই অঞ্চলে পাওয়া যায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুল রাফলেশিয়া আর্নোল্ডি, যার একটি ফুলের ওজন প্রায় ১১ থেকে ১২ কেজি হয়। এই ফুল থেকে পচা মৃতদেহের মতো গন্ধ বেরোয়, এই কারণে একে কর্পস ফ্লাওয়ারও বলা হয়। এই ফুলের এই বিশেষ গন্ধের কারণে তারা মশা-মাছি থেকে নানান কী পতঙ্গকে আকৃষ্ট করে নানান এনজাইমের মাধ্যমে পাচিত করে এবং পুষ্টি গ্রহণ করে। শুধুমাত্র এই ফুল নয়, কলস পত্র থেকে শুরু করে কীটপতঙ্গ ভক্ষণকারী নানান উদ্ভিদের দেখা মেলে এই বর্ষা অরণ্যে। শেষ প্লিস্টোসিন যুগে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর থেকে,বোর্নিও-র প্রাণীকুল মূল ভূখণ্ড এবং নিকটবর্তী দ্বীপপুঞ্জ থেকে পৃথকভাবে বিবর্তিত হয়েছে, যা বোর্নিও-র বিভিন্ন প্রজাতি ও উপ-প্রজাতির একটি স্বতন্ত্র সমাবেশ তৈরি করেছে। এদের মধ্যে রয়েছে বড় স্তন্যপায়ী প্রাণী, যেমন সুন্দা ক্লাউডেড লেপার্ড (যা বোর্নিও-র বৃহত্তম মাংসাশী প্রাণীও বটে), বোর্নিও ওরাংওটাং, সুমাত্রান গণ্ডার এবং পিগমি হাতি; এশীয় হাতির একটি উপ-প্রজাতি যা মূল ভূখণ্ডের হাতির চেয়ে আকারে অনেক ছোট।





