বিশ্ববিখ্যাত দার্জিলিং চা শিল্প বাঁচাতে দার্জিলিং এর ছোট ছোট চা চাষীদের নিয়ে মকাইবাড়ি চায়ের উদ্যোগে গঠিত হলো আত্মপ্রকাশ মকাইবাড়ি কালেক্টিভের

৩৬৫ দিন। বাঁচাতে হবে বিশ্ব বিখ্যাত দার্জিলিং চা। ‌ এই তাগিদ থেকে এবারে দার্জিলিংয়ের বিভিন্ন পাহাড়ের কোলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছোট ছোট চা চাষীদের নিয়ে মকাইবাড়ি চায়ের উদ্যোগে তৈরি হল মকাইবাড়ি কালেক্টিভ। যার মূল উদ্যোক্তা মকাইবাড়ি টি এস্টেট তথা লক্ষ্মী টি-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর বিশিষ্ট শিল্পপতি রুদ্র চট্টোপাধ্যায়। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে যেভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন সংস্থার তৈরি সস্তার চা বাজার ছেয়ে ফেলছে, সেই সময় দার্জিলিংয়ের পাহাড়ের কোলে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মানের চা উৎপাদন করা সত্ত্বেও বাজার পাচ্ছেন না ছোট ছোট চা চাষীরা। এই সমস্ত ছোট ছোট চা চাষীদের পাশে দাঁড়াতেই তাই এই অভিনব সমবায় ভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ করলেন রুদ্র।
ইংল্যান্ডের রাজ পরিবারের সদস্যরা নাকি বাকিংহাম প্যালেসে ব্রেকফাস্টের টেবিলে মকাইবাড়ির চা ছাড়া সকাল শুরু করার কথা ভাবতেই পারেন না। হাত দীর্ঘদিন ধরেই সেই চা ভারতবর্ষ থেকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের পাশাপাশি নিয়মিত পৌঁছে যাচ্ছে ইংল্যান্ডে লক্ষ্মী টি-এর হাত ধরে। কিন্তু মকাইবাড়ি টি এস্টেটের চা ছাড়া মকাইবাড়ি এলাকায় যে সমস্ত ছোট ছোট চাষিরা নিজেদের বাড়ির সংলগ্ন জমিতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে চা উৎপাদন করেন, তাঁরা একদিকে যেমন বিক্রির বাজারে জায়গা পাচ্ছেন না, ঠিক তেমনভাবেই আর্থিক সমস্যায় ভুগছেন দীর্ঘদিন ধরে। কিছুদিন আগে এই ছোট ছোট চা চাষিরা তৈরি করেছিলেন স্মল টি গ্রোয়ারস এসোসিয়েশন। যেখানে কো-অপারেটিভ এর মাধ্যমে সংগঠন তৈরি করে একসঙ্গে বাজার ধরার চেষ্টা করেছেন তাঁরা। কিন্তু তারপরেও আন্তর্জাতিক চায়ের বাজারে নিজেদের ব্র্যান্ডের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করা এবং সঠিক মার্কেটিং-এর অভাবে ধুঁকছিলেন প্রায় আড়াই হাজার ছোট ছোট চা চাষী। এদের পাশে দাঁড়ানোর জন্যই ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে শ্রেষ্ঠ চায়ের ব্র্যান্ড হিসেবে শিরোপা পাওয়া মকাইবাড়ি ব্রান্ডের সঙ্গে তাঁদের জুড়ে নিয়ে রুদ্র চট্টোপাধ্যায় শুরু করলেন মকাইবাড়ি কালেক্টিভ। মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের ফ্রান্সে আঙুর চাষীদের দুরবস্থা কাটানোর জন্য যে ঐতিহাসিক শ্যাম্পেন কো-অপারেটিভ গড়ে উঠেছিল, সেই ধাঁচেই এবারে দার্জিলিং এর দুর্লভ সুস্বাদু চা বাঁচানোর উদ্যোগ নিলেন রুদ্র।
অবশ্য শুধুমাত্র লাভ-ক্ষতির হিসেবে না দেখে পাহাড়ের চাষীদের জন্য এগিয়ে আসার ইতিহাস রয়েছে রুদ্র চট্টোপাধ্যায়ের পরিবারেই। ব্রিটিশ আমলে যখন যখন দার্জিলিং, অসম এবং ত্রিপুরায় সমস্ত চা বাগান ছিল ব্রিটিশ সাহেবদের দখলে, সেই সময় চা চাষীদের ব্রিটিশ দাসত্ব থেকে মুক্ত করার জন্য রুদ্র চট্টোপাধ্যায়ের ঠাকুরদা পিসি চট্টোপাধ্যায় প্রথম তৈরি করেন লক্ষ্মী টি কোম্পানি। বাকিটা ইতিহাস। সংস্থার দায়িত্ব নিয়ে রুদ্র চট্টোপাধ্যায় কিনে নেন মকাইবাড়ি টি এস্টেট। বর্তমানে কোটা ভারতবর্ষ থেকে যে দার্জিলিং চা উৎপন্ন হয় সেই দার্জিলিং চায়ের বাজারের ২৫ শতাংশের বেশি দখলে রয়েছে মকাইবাড়ি চায়ের।
কলকাতায় আজ তাজ বেঙ্গল হোটেলের মধ্যেই মকাইবাড়ি টি এস্টেট-এর ফ্ল্যাগশিপ মকাইবাড়ি বাংলোতে আজ দার্জিলিং এর স্মল টি গ্রোয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন এর সদস্যদের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে মকাইবাড়ি কালেক্টিভ ব্র্যান্ডের ঘোষণা করলেন রুদ্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি জানান আসন্ন দিওয়ালির পরেই বাজারে নতুন প্যাকেজিংয়ে আসতে চলেছে মকাইবাড়ি কালেক্টিভ চা। তবে ভারত বর্ষ সহ বিশ্বের মানুষ যেন কোনভাবেই প্রকৃত মকাইবাড়ি চায়ের স্বাদ থেকে বঞ্চিত না হন বা প্রতারিত না হন তার জন্য ছোট ছোট চা বাগান থেকে সংগ্রহ করা চায়ের নমুনা পরীক্ষা করার দায়িত্বে থাকছে বিশ্ব বিখ্যাত টি টেস্টিং সংস্থা জে থমাস। টি বোর্ডের পক্ষ থেকেও এই চায়ের স্বীকৃতি পাওয়া যাবে বলে আশ্বাস দেয় টি বোর্ড। নতুন এই উদ্যোগের ফলে ছোট ছোট চা চাষিরা বছরে আরো অন্তত ২০ শতাংশ বেশি চা উৎপাদন ও বিক্রি করতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করেন রুদ্র।

Scroll to Top